রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ফের প্রকাশ্যে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সরব হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে কিউবাকে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে দাবি করেন, দ্বীপদেশটির বর্তমান সরকার অভূতপূর্ব চাপের মধ্যে রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের পতন হবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের সময় রাষ্ট্রসংঘের সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় কিউবার প্রতিনিধিদল। ফলে ওয়াশিংটন ও হাভানার দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ফের আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
রাষ্ট্রসংঘে নিজের ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসন কিউবার পরিস্থিতিতে ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আনার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, কিউবার কমিউনিস্ট সরকার বর্তমানে এমন চাপের মুখে রয়েছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এরপরই কিউবাকে ‘absolutely failed state’ বা ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিউবার পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও খারাপ হচ্ছে এবং একসময় দেশটির বর্তমান ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। পাশাপাশি তিনি বলেন, আমেরিকায় কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হবে না, বরং কিউবায় স্বাধীনতা আসবে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের এই অংশ প্রকাশ্যে আসার পরই কিউবার প্রতিনিধিদল সাধারণ পরিষদের হল ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ঘটনাটি রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশনে দৃশ্যতই একটি কূটনৈতিক প্রতিবাদের ছবি তৈরি করে। কিউবার পক্ষ থেকে ট্রাম্পের মন্তব্যকে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা হয়েছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলও পরে ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করেন এবং জানান, হাভানা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবস্থানেই থাকবে।
কিউবার বিদেশমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজও ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাব দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন সরকার কিউবাকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মেনে নিতে চাইছে না। রদ্রিগেজ দাবি করেন, দীর্ঘদিনের মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সাম্প্রতিক শক্তি-সংক্রান্ত চাপ কিউবার মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। কিউবার সরকারের বক্তব্যে এই মার্কিন নীতিকে অর্থনৈতিক চাপ এবং ‘collective punishment’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান থেকে আলাদা এবং কিউবার পক্ষের বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আমেরিকা ও কিউবার মধ্যে বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাতপূর্ণ। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিরোধ ক্রমশ তীব্র হয়। পরবর্তী সময়ে আমেরিকা কিউবার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৯ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কে রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সেই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রসংঘে দেওয়া ভাষণেও ট্রাম্প সেই নীতির কথা স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্যে কিউবার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত ছিল। একইসঙ্গে তিনি জানান, মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে রয়েছেন এবং হাভানার সঙ্গে আলোচনা চলছে। অর্থাৎ একদিকে ওয়াশিংটন চাপ বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের কথাও জানানো হচ্ছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে শুধু কিউবার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই নয়, আমেরিকার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা উঠে আসে। তিনি বলেন, আমেরিকার উপকূলের এত কাছাকাছি কোনও বিদেশি শক্তির জন্য ‘নিরাপদ আশ্রয়’ তৈরি হতে দেওয়া হবে না। কিউবার ভৌগোলিক অবস্থানও এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিউবা আমেরিকার ফ্লোরিডা উপকূল থেকে আনুমানিক ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে ওয়াশিংটনের কাছে কিউবার রাজনৈতিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে এসেছে।
কিউবার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ পরিষেবা এবং পুরনো পরিকাঠামো সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের সংকট কিউবার অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন কিউবার বর্তমান সরকারের নীতিকে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে। ফলে দ্বীপদেশটির অর্থনৈতিক সমস্যার কারণ এবং তার জন্য দায়ী নীতিগুলি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
এর আগে জুন মাসেও ট্রাম্প কিউবাকে ‘failed nation’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, কিউবা নিয়ে আমেরিকার কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের রাষ্ট্রসংঘের ভাষণে সেই অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন তিনি। একইসঙ্গে কিউবায় ‘স্বাধীনতা’ আসবে বলে মন্তব্য করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশার কথাও জানান। তবে কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-কানেল ও বিদেশমন্ত্রী রদ্রিগেজের বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, হাভানা নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে সরে আসতে রাজি নয়।
রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে কিউবার প্রতিনিধিদলের ওয়াক আউট তাই দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থার একটি প্রকাশ্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে ওয়াশিংটন রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য চাপ বাড়ানোর কথা বলছে, অন্যদিকে হাভানা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা জানাচ্ছে। এর মধ্যে মার্কো রুবিওর মাধ্যমে আলোচনার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে আমেরিকা-কিউবা সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক যোগাযোগ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং কিউবার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রসংঘে ট্রাম্পের কিউবা-সংক্রান্ত মন্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক ভাষণের অংশ হয়ে থাকেনি; তার পরেই কিউবার প্রতিনিধিদলের সভাকক্ষ ত্যাগ ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে কয়েক দশকের পুরনো বিরোধের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনকে ফের সামনে নিয়ে এসেছে। তবে ভবিষ্যতে এই চাপ কূটনৈতিক আলোচনার দিকে যায়, নাকি সম্পর্ক আরও কঠিন হয়, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আপাতত রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে দুই দেশের অবস্থান যে পরস্পর থেকে যথেষ্ট দূরে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সেটিই প্রকাশ্যে এসেছে।


