সংযুক্ত আরব আমিরশাহির শারজায় কর্নাটকের এক প্রবাসী ভারতীয়ের রহস্যজনক খুন ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। উদুপি জেলার কুন্দাপুরের বাসিন্দা অ্যালভিন প্রকাশ কুন্দরকে জুলাই মাসে খুন করা হয়েছিল বলে তাঁর পরিবারের দাবি। প্রায় দু’মাস পর প্রকাশ্যে এসেছে সেই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ তথ্য। একটি গাড়ির ভিতর থেকে উদ্ধার হয়েছে তাঁর দেহাবশেষ। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেহটি নয়টি টুকরো করে দুটি ব্যাগের মধ্যে রাখা হয়েছিল। আরও রহস্য ঘনীভূত হয়েছে মৃতের স্ত্রী টিনা কুন্দর এবং তাঁদের কিশোর পুত্রের কোনও সন্ধান না মেলায়। তবে তাঁদের নিখোঁজ থাকার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয় এবং তদন্ত চলছে।
প্রকাশের পরিবার জানিয়েছে, তিনি প্রায় ১৪ বছর ধরে শারজা বিমানবন্দরে কাজ করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতেই স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রী টিনাও উদুপি জেলার বাসিন্দা এবং শারজায় স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে কাজ করতেন। তাঁদের ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল। গত ডিসেম্বরেও প্রকাশ নিজের শহরে এসেছিলেন বলে পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। এরপর ফের শারজায় ফিরে যান তিনি। সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল বলে পরিবারের দাবি।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২০ জুলাই। প্রকাশের ভাই অনিল প্রকাশ কুন্দর তাঁকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ফোন ধরেননি প্রকাশ। তার পরিবর্তে তাঁর ফোন থেকে একটি মেসেজ আসে—তিনি ভালো আছেন। এই বিষয়টিই প্রথমে পরিবারের সন্দেহ তৈরি করে। কারণ পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকাশ সাধারণত ফোনে কথা বলতেন কিংবা ভয়েস মেসেজ পাঠাতেন। এইভাবে আচমকা একটি সাধারণ টেক্সট মেসেজ পাঠানো তাঁর স্বাভাবিক যোগাযোগের ধরন ছিল না। ফলে অনিলের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়।
এর প্রায় এক সপ্তাহ পরেও যখন প্রকাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, তখন পরিবারের উদ্বেগ আরও বাড়ে। অনিল শারজায় থাকা প্রকাশের এক সহপাঠী মনোহরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁকে প্রকাশের খোঁজ নিতে বলেন। মনোহর প্রকাশ যে ফ্ল্যাটে থাকতেন সেখানে গিয়ে খোঁজ নেন। ওই ফ্ল্যাটটি তাঁকে তাঁর সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সেখানে নিরাপত্তারক্ষীর কাছ থেকে জানানো হয়, প্রকাশ নাকি ভারতে চলে গিয়েছেন। সংস্থার মানবসম্পদ বিভাগ থেকেও প্রথম দিকে পরিবারের কাছে একই ধরনের তথ্য দেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশের ভাই জানিয়েছেন।
কিন্তু পরিবারের দাবি ছিল, প্রকাশ ভারতে ফেরেননি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাঁর পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হয়। সেখান থেকে জানা যায়, তিনি এখনও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতেই রয়েছেন। এরপরই নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে শারজায় প্রকাশের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তের সময় শেষ পর্যন্ত একটি গাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। ওমানের দিকে যাওয়ার একটি রাস্তার পাশে ওই গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। গাড়ির ভিতর থেকেই প্রকাশের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। তাঁর ভাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, দেহটি নয়টি টুকরো করা হয়েছিল এবং দুটি ব্যাগের মধ্যে রাখা হয়েছিল। পরে দেহাবশেষের পরিচয় প্রকাশের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত করা হয়। তাঁর পরিবারের কাছে মৃত্যুর শংসাপত্র পৌঁছেছে বলেও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় রহস্য এখন হত্যার কারণ এবং অভিযুক্তদের পরিচয়। এখনও পর্যন্ত শারজা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে কোনও সন্দেহভাজনের নাম বা হত্যার উদ্দেশ্য জানায়নি। ফলে কী কারণে প্রকাশকে খুন করা হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তকারীরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, কর্মক্ষেত্র, পরিচিতজন এবং সাম্প্রতিক যোগাযোগের বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখছেন কি না, সে বিষয়ে সরকারি বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এর মধ্যেই প্রকাশের স্ত্রী টিনা এবং তাঁদের কিশোর পুত্রের সন্ধান না পাওয়ার বিষয়টি তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তাঁরা জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে শারজা ছেড়ে ভারতে চলে গিয়ে থাকতে পারেন। তবে তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে তাঁদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত থাকার প্রমাণও এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে শুধুমাত্র নিখোঁজ থাকার ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
কিছু প্রতিবেদনে প্রকাশের স্ত্রীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও সেটি এখনও যাচাই না হওয়া দাবি। প্রকাশের পরিবারও জানিয়েছে, দম্পতির মধ্যে কোনও বড় ধরনের বিবাদ বা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা তাঁরা জানতেন না। ফলে এই মুহূর্তে তদন্তের মূল প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে—প্রকাশকে কে বা কারা হত্যা করেছিল, হত্যার উদ্দেশ্য কী ছিল, দেহ গাড়িতে কীভাবে পৌঁছল এবং তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের বর্তমান অবস্থান কোথায়।
ঘটনার বিষয়ে ভারতে প্রকাশের পরিবারও প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছে। তাঁর ভাই অনিল উদুপি জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করে তদন্তে সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। উদুপি পুলিশ জানিয়েছে, শারজায় উদুপি-উৎপত্তির এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় তথ্য ছড়ালেও, তারা শারজা পুলিশ কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে ভারতীয় দূতাবাস বা কনস্যুলেটের কাছ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সরকারি যোগাযোগ পাওয়ার পরই বিষয়টি যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রকাশের পরিবারের আরও একটি দাবি হল, তাঁর দেহ ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। বিদেশে কোনও ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হলে দেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এই ক্ষেত্রেও শারজায় তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর দেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, শারজায় কর্নাটকের প্রবাসী অ্যালভিন প্রকাশ কুন্দরের মৃত্যু এখন একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জুলাইয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর প্রায় দু’মাস ধরে তাঁর কোনও সন্ধান না পাওয়া, ফোন থেকে অস্বাভাবিক মেসেজ, পরে ওমানমুখী রাস্তার পাশে গাড়িতে দেহাবশেষ উদ্ধার এবং স্ত্রী ও সন্তানের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া—প্রতিটি ঘটনাই তদন্তকে জটিল করে তুলেছে। তবে এখনও হত্যার উদ্দেশ্য, অভিযুক্ত এবং নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে সরকারি ভাবে সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়নি। শারজা কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং ভারতীয় প্রশাসনের সঙ্গে পরবর্তী যোগাযোগেই এই রহস্যের আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।


