দিল্লিতে ফের নারী ও নাবালিকার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে গেল। পুলিশের পরিচয় দিয়ে এক নাবালিকা ও তার বন্ধুকে ভয় দেখিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ দিল্লির কালকাজিতে ইসকন মন্দিরের কাছে একটি পার্কে। অভিযোগ, সোমবার সন্ধ্যায় মন্দিরে পুজো দিয়ে বেরিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে ওই পার্কে গিয়েছিল ১৭ বছরের কিশোরী। সেই সময় পুলিশের পরিচয় দিয়ে তিন ব্যক্তি সেখানে হাজির হয়। এরপর ওই নাবালিকার বন্ধুকে আটকে রেখে তাকে যৌন নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ফের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ ওই কিশোরী তার এক বন্ধুর সঙ্গে কালকাজির ইসকন মন্দিরে যায়। পুজো দেওয়ার পর আনুমানিক সাড়ে সাতটা নাগাদ দু’জনে মন্দির সংলগ্ন একটি পার্কে যায়। অভিযোগ, সেখানেই আচমকা তিন ব্যক্তি তাদের পথ আটকায়। নিজেদের পুলিশকর্মী বলে পরিচয় দেয় তারা। পুলিশের পরিচয় শুনে স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেয়ে যান ওই কিশোরী ও তার বন্ধু। সেই সুযোগ নিয়েই অভিযুক্তরা তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেয় বলে অভিযোগ।
এরপর নাবালিকার বন্ধুকে আটকে রেখে তিন ব্যক্তি তার উপর যৌন নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। পরে কোনওভাবে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে ওই কিশোরী রাতে পুলিশকে ফোন করে পুরো বিষয়টি জানায়। অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্ত শুরু করে দিল্লি পুলিশ।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে পুলিশ প্রথমে নির্যাতিতার মেডিক্যাল পরীক্ষা করায়। এরপর তার বয়ান রেকর্ড করা হয় এবং অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়। যেহেতু নির্যাতিতা নাবালিকা, তাই মামলায় **POCSO Act**-এর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা শুরু হয়। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র থেকেও তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তকারীরা।
তদন্ত চলাকালীন মঙ্গলবার সকালে এক অভিযুক্তের সন্ধান পায় পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এরপর পুলিশ ও অভিযুক্তের মধ্যে গুলির লড়াই হয়। শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে পাকড়াও করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তদের বয়স আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তবে তারা কীভাবে পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করেছিল, তাদের কাছে অস্ত্র এল কোথা থেকে এবং ঘটনার আগে থেকেই তারা ওই কিশোরী ও তার বন্ধুকে নজরে রেখেছিল কি না—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা। বিশেষ করে পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগটি তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ সাধারণ মানুষ পুলিশের পোশাক বা পরিচয়কে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন। কোনও ব্যক্তি নিজেকে পুলিশ বলে পরিচয় দিলে সাধারণ মানুষের পক্ষে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর পরিচয় যাচাই করা কঠিন হতে পারে। এই ঘটনাতেও সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অভিযুক্তরা নাবালিকা ও তার বন্ধুকে ভয় দেখিয়েছিল কি না, সেটাই এখন তদন্তকারীদের কাছে বড় প্রশ্ন।
ঘটনার পর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—অভিযুক্তের কাছে বন্দুক এল কীভাবে? পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ থাকায় অস্ত্রটির উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ওই অস্ত্র বৈধ ছিল কি না, কোথা থেকে সেটি সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনও অপরাধচক্রের যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনার সঙ্গে দিল্লিতে সাম্প্রতিক আরেকটি নাবালিকা নির্যাতনের ঘটনারও প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। মাত্র কয়েকদিন আগেই রাজধানীতে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের এক নাবালিকাকে কেন্দ্র করে গুরুতর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এল। পরপর এমন ঘটনায় দিল্লির নারী ও শিশু নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশেষ করে ঘটনাস্থলের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একটি ধর্মীয় স্থান থেকে বেরিয়ে আসার পর মন্দির সংলগ্ন পার্কে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ। সন্ধ্যার সময় সাধারণত ওই ধরনের এলাকায় মানুষের যাতায়াত থাকার কথা। তার পরেও কীভাবে অভিযুক্তরা এতটা সময় ধরে অপরাধ চালাতে পারল, আশপাশে নিরাপত্তারক্ষী বা পুলিশি নজরদারি ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
সিসিটিভি ফুটেজ এই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মন্দিরের আশপাশ, পার্কের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ এবং সংলগ্ন রাস্তাগুলিতে থাকা ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। অভিযুক্তরা কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল, কোন পথে পালানোর চেষ্টা করেছিল এবং তাদের সঙ্গে আরও কেউ ছিল কি না—ফুটেজ থেকে সেই তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
একই সঙ্গে নির্যাতিতার বন্ধুর কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘটনার সময় কী হয়েছিল, অভিযুক্তরা কীভাবে নিজেদের পুলিশ বলে পরিচয় দিয়েছিল এবং তাদের হাতে অস্ত্র ছিল কি না—এই সমস্ত বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পুলিশের ধারণা, অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ একসঙ্গে কাজে লাগানো হবে।
নাবালিকার ক্ষেত্রে POCSO আইনের অধীনে তদন্ত হওয়ায় পুলিশকে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হবে। তদন্তের সময় নির্যাতিতার পরিচয় যাতে প্রকাশ্যে না আসে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু বা নাবালিকার যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে তার গোপনীয়তা রক্ষা করা আইনি ও মানবিক—দুই দিক থেকেই প্রয়োজনীয়।
এই ঘটনার পর রাজধানীতে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে অপরাধীরা যদি পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, তাহলে সেটি আইনশৃঙ্খলার জন্যও গুরুতর বিষয়। পুলিশের পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ না দিয়েই কোনও ব্যক্তিকে ভয় দেখানো বা জোর করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘটনা আটকাতে আরও নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযুক্তদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। তবে বাকি অভিযুক্তদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। ধৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সহযোগীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আগেও কোনও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
পুলিশের গুলির জবাবে অভিযুক্তের পালটা গুলি চালানোর অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। ফলে শুধু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নয়, পুলিশের উপর হামলা এবং অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তের অংশ হয়ে উঠেছে। ধৃত ব্যক্তির কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে কি না এবং সেই অস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে।
রাজধানীতে সাম্প্রতিক একাধিক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার পর এই ঘটনা প্রশাসনের কাছে নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দিল্লির মতো বড় শহরে রাত বা সন্ধ্যার সময় জনবহুল এলাকা এবং পার্কগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া এবং তরুণীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, কালকাজির ইসকন মন্দির সংলগ্ন পার্কে ১৭ বছরের নাবালিকাকে পুলিশ সেজে তিন ব্যক্তির যৌন নির্যাতনের অভিযোগকে ঘিরে তদন্ত জোরদার হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে POCSO আইনে মামলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং মঙ্গলবার সকালে এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের খবর মিলেছে। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় ওই ব্যক্তি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর চেষ্টা করেছিল। এখন তদন্তকারীদের সামনে মূল লক্ষ্য হল বাকি অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা, অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা এবং কীভাবে তারা পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে এই অপরাধ সংঘটিত করল, তার সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটন করা।


