উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পর্যটনে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মূর্তি নদীর উপর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তৈরি হওয়া নতুন আর্চ ব্রিজ এবার উদ্বোধনের অপেক্ষায়। মঙ্গলবার এই সেতুর উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে। উদ্বোধনের আগেই অবশ্য নতুন সেতুর একাধিক ছবি ও ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সাদা-কালো রঙের ধনুকাকৃতি নকশার এই সেতু ইতিমধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দা থেকে পর্যটনপ্রেমী—সকলের নজর কেড়েছে। প্রশাসনের আশা, সেতুটি চালু হলে শুধু স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের সুবিধাই বাড়বে না, ডুয়ার্সের পর্যটন মানচিত্রেও নতুন গতি আসতে পারে।
দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে এই সেতুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মূর্তি নদীর উপর তৈরি হওয়া নতুন সেতুটি চালু হলে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। বিশেষ করে লাটাগুড়ি, জলপাইগুড়ি, নাগরাকাটা, লুকসান এবং মহাবাড়ি-সহ একাধিক এলাকার মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এতদিন যে পথ ঘুরে যেতে হত, নতুন সেতু চালু হলে সেই যাত্রাপথ অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হবে। এর ফলে সময় যেমন বাঁচবে, তেমনই যানবাহনের খরচও কমতে পারে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, নতুন সেতুর ফলে দুই প্রান্তের মধ্যে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ কমে যাবে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা এই অঞ্চলে কয়েক কিলোমিটার পথ কমে যাওয়াও যাতায়াতের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষার সময় নদী ও রাস্তার পরিস্থিতির কারণে অনেক জায়গায় যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় লাগে। নতুন সেতু চালু হলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মূর্তি নদীর এই নতুন সেতুর গুরুত্ব শুধু স্থানীয় যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডুয়ার্সের পর্যটনের ভবিষ্যৎও। জলঢাকা বিন্দু, রঙ্গু এবং কুমাইয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে পৌঁছনোর পথ আরও সহজ হবে। ফলে যাঁরা উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাঁদের কাছে এই নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা বাড়তি সুবিধা তৈরি করবে। পর্যটন ব্যবসায়ীদের একাংশের আশা, সেতুটি চালু হওয়ার পর এই সমস্ত অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রেও পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে।
উত্তরবঙ্গের পর্যটন মূলত পাহাড়, জঙ্গল, নদী এবং চা-বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ডুয়ার্সের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসেন। কিন্তু অনেক পর্যটনকেন্দ্রে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট উন্নত নয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি হলে একাধিক পর্যটনকেন্দ্রকে একই রুটের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়। মূর্তি নদীর নতুন সেতুটিও সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই আশাবাদী। পর্যটক বাড়লে শুধু হোটেল বা রিসর্টের ব্যবসা নয়, স্থানীয় ছোট দোকান, রেস্তরাঁ, গাড়ি ভাড়া, পর্যটন গাইড এবং অন্যান্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে নতুন সেতুকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতির উপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন সেতুটির স্থাপত্যও ইতিমধ্যে মানুষের নজর কেড়েছে। ধনুকের মতো আকৃতির সেতুটি দেখতে অনেকটাই আকর্ষণীয়। সাদা এবং কালো রঙের ব্যবহার তার নকশাকে আরও আলাদা করে তুলেছে। উদ্বোধনের আগেই সেতুর ছবি এবং ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি পর্যটকদের মধ্যেও নতুন এই স্থাপত্য নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সেতুটিই এলাকার অন্যতম নতুন দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সেতুটির নির্মাণকাজ বেশ কিছুদিন আগেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী বিধিনিষেধের কারণে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি। ফলে সেতুটি তৈরি হয়ে গেলেও এতদিন তা আনুষ্ঠানিকভাবে মানুষের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া যায়নি। মঙ্গলবারের উদ্বোধনের পর সেই অপেক্ষার অবসান হওয়ার কথা।
এদিন উত্তরবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একাধিক কর্মসূচি রয়েছে। মূর্তি নদীর উপর নতুন সেতুর উদ্বোধনের পাশাপাশি কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ারেও তাঁর প্রশাসনিক কর্মসূচি রয়েছে। উত্তরবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতিও জোরদার করা হয়েছে।
কোচবিহারে পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম কর্মসূচি হিসেবে মদনমোহন মন্দিরে পুজো দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর রবীন্দ্র ভবনে প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা। সেখানে জেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক এবং উন্নয়নমূলক বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কোচবিহারের পাশাপাশি বিমানবন্দর উন্নয়ন, রানওয়ে সম্প্রসারণ এবং ধর্মীয় পর্যটনের মতো বিষয়গুলিও প্রশাসনিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
এরপর মুখ্যমন্ত্রীর আলিপুরদুয়ারে যাওয়ার কথা। সেখানে বিশ্ব গন্ডার দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তিনি। সুভাষিণী চা বাগানের মাঠে এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বেআইনি বন্যপ্রাণ পাচারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থানও এই অনুষ্ঠানে সামনে আসতে পারে। চোরাশিকারি ও বন্যপ্রাণ পাচারকারীদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা সামগ্রী ধ্বংস করার কর্মসূচিও রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
উত্তরবঙ্গ সফরের শেষ পর্যায়ে জলপাইগুড়ির দিকে যাওয়ার কথা মুখ্যমন্ত্রীর। সেখান থেকে মূর্তি নদী এলাকায় গিয়ে নতুন সেতুর উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ একদিনের সফরে উত্তরবঙ্গের তিনটি জেলা—কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়ি—ঘিরে একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেবেন তিনি।
মূর্তি নদীর উপর সেতুটি চালু হওয়ার ফলে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও সুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোনও এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে শুধু যাতায়াত নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, বাজার, কর্মসংস্থান এবং পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ কাছাকাছি শহর বা গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা কেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছতে পারেন। ফলে এই সেতু উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো হয়ে উঠতে পারে।
পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও নতুন সেতুর ভূমিকা থাকতে পারে। উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে চা-বাগান, কৃষি এবং পর্যটননির্ভর অর্থনীতি রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করাও সহজ হতে পারে। ফলে সেতুটিকে শুধু একটি যাতায়াতের পরিকাঠামো হিসেবে না দেখে বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনীতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
পর্যটকদের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব যথেষ্ট। ডুয়ার্সে অনেক পর্যটক লাটাগুড়ি, গরুমারা, মূর্তি, চালসা, নাগরাকাটা-সহ বিভিন্ন এলাকায় যান। কিন্তু একটি জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার ক্ষেত্রে রাস্তার দূরত্ব এবং সময় অনেক সময় পর্যটন পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলে। নতুন সেতুর কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট সংক্ষিপ্ত হলে পর্যটকেরা এক সফরেই আরও বেশি জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে জলঢাকা বিন্দু, রঙ্গু এবং কুমাইয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলির জন্য নতুন সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই এলাকাগুলিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও অনেক পর্যটকের কাছে জায়গাগুলি তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত। নতুন সেতু চালু হলে পর্যটন সংস্থাগুলি ভবিষ্যতে এই রুটগুলিকে আরও বেশি করে প্যাকেজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
তবে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ডুয়ার্সের জঙ্গল, নদী, পাহাড় এবং বন্যপ্রাণ উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় সম্পদ। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় অর্থনীতি লাভবান হবে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য, যানবাহনের চাপ এবং পরিবেশের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই নতুন সেতুকে কেন্দ্র করে পর্যটন বাড়লেও তা যাতে পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিতভাবে হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, মূর্তি নদীর উপর নতুন আর্চ ব্রিজকে ঘিরে উত্তরবঙ্গে ইতিমধ্যেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। প্রায় চার বছরের অপেক্ষার পর সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে চলেছে। প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ কমে যাওয়ার ফলে স্থানীয় যোগাযোগ যেমন সহজ হবে, তেমনই লাটাগুড়ি, জলপাইগুড়ি, নাগরাকাটা, লুকসান ও মহাবাড়ির মতো এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে জলঢাকা বিন্দু, রঙ্গু ও কুমাইয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে পর্যটকদের যাতায়াতও সহজ হতে পারে। ফলে নতুন এই সেতু শুধু দুই প্রান্তকে যুক্ত করবে না, উত্তরবঙ্গের পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।


