কলকাতা হাই কোর্টে চাকরি দেওয়ার নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, হাই কোর্টের বিচারপতিদের নাম এবং পদ ব্যবহার করে চাকরিপ্রার্থীদের বিশ্বাস অর্জন করা হয়। এরপর তাঁদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তৈরি করা হয় একটি ভুয়ো নিয়োগ প্যানেল। শুধু তাই নয়, সেই ডিজিটাল নথিতে তিন বিচারপতির জাল সই ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। টাকা দেওয়ার পর চাকরি তো মেলেইনি, উলটে অর্থ ফেরতের জন্য দেওয়া চেকও বাউন্স করেছে। শেষ পর্যন্ত প্রতারিত ব্যক্তি দক্ষিণ কলকাতার বাঁশদ্রোণী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বাঁশদ্রোণীর নিরঞ্জনপল্লি এলাকার বাসিন্দা এক ব্যক্তির অভিযোগ থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত। তাঁর দাবি, এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়, যিনি নিজেকে কলকাতা হাই কোর্টের কর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। কথাবার্তার সময় ওই ব্যক্তি দাবি করেন, হাই কোর্টে স্টেনোগ্রাফার বা স্টেনো পদে নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তাঁর সঙ্গে একাধিক বিচারপতির পরিচয় রয়েছে এবং সেই যোগাযোগ কাজে লাগিয়েই চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন বলেও তিনি অভিযোগকারীকে আশ্বাস দেন।
চাকরির আশ্বাস পেয়ে ওই ব্যক্তি তাঁর পরিবারের দুই সদস্যের জন্য নিয়োগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে চাকরি দেওয়ার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়েছিল। পরে দরদাম করে সেই অঙ্ক চার লক্ষ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। চাকরিপ্রার্থীদের পক্ষ থেকে এত টাকা দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে কথাবার্তার পর ধাপে ধাপে টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অভিযোগকারীর দাবি, তিনি মোট ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দেন। এর মধ্যে অনলাইন লেনদেনের পাশাপাশি নগদ টাকাও দেওয়া হয়েছিল।
এরপর প্রতারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে আসে একটি ডিজিটাল নথি। অভিযোগকারীকে একটি তালিকা পাঠানো হয়, যেখানে হাই কোর্টের চাকরির জন্য নির্বাচিত প্রার্থীদের নাম রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। সেই তালিকায় ৫১ এবং ৫২ নম্বর স্থানে অভিযোগকারীর দুই আত্মীয়ের নাম দেখতে পান তিনি। ফলে চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, ওই নিয়োগ তালিকাটিই আসলে ভুয়ো বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ডিজিটাল প্যানেলে কলকাতা হাই কোর্টের তিন বিচারপতির সই ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ, শুধু একটি সাধারণ ভুয়ো তালিকা তৈরি করেই থেমে থাকেনি প্রতারণার চক্র। আদালতের বিচারপতিদের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে নথিটিকে আসল বলে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এই বিষয়টিই তদন্তকারীদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিচারপতিদের নাম ও সই কীভাবে ব্যবহার করা হল এবং নথিটি কোথা থেকে তৈরি করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে গিয়ে অভিযোগকারীর সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে গিয়ে নিয়োগের বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, আরও বেশ কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী উপস্থিত রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গেও চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সেখানেই অভিযোগকারীর কাছে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে শুরু করে।
উপস্থিত কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী নাকি তাঁকে জানান, টাকা নেওয়ার পরে তাঁদেরও একই ধরনের তালিকা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই তালিকাগুলি প্রকৃত নিয়োগ প্যানেল নয়। অর্থাৎ, একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকেই চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই তথ্য সামনে আসার পরই অভিযোগকারী বুঝতে পারেন যে তিনি সম্ভবত একটি বড় প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এড়িয়ে যেতে শুরু করেন বলে অভিযোগ।
টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য অভিযোগকারী অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁকে একটি পোস্ট-ডেটেড ব্যাঙ্ক চেক দেন বলে অভিযোগ। সেই চেকের মাধ্যমে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে চেকটি ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার পর সেটিও বাউন্স করে। ফলে চাকরি না পাওয়ার পাশাপাশি টাকা ফেরত পাওয়ার আশাও কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপরই আর কোনও উপায় না দেখে বাঁশদ্রোণী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ওই ব্যক্তি।
অভিযোগকারীর দাবি, এই গোটা ঘটনায় শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি যুক্ত নন। তাঁর আশঙ্কা, এর পিছনে আরও বড় একটি চক্র কাজ করতে পারে। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে হাই কোর্টের কর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে বিচারপতিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। আদালতের ভিতরে নিয়ে গিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের ঘোরানো, ভুয়ো নিয়োগ তালিকা তৈরি এবং বিচারপতিদের জাল সই ব্যবহার—এই সমস্ত বিষয়কে একসঙ্গে দেখলে একাধিক ব্যক্তির যোগ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার তদন্তে এখন পুলিশের সামনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। প্রথমত, অভিযুক্ত ব্যক্তি আদৌ কলকাতা হাই কোর্টের কোনও কর্মী কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, যে ডিজিটাল নিয়োগ তালিকা চাকরিপ্রার্থীদের দেওয়া হয়েছিল, সেটি কোথা থেকে তৈরি হয়েছিল তা খতিয়ে দেখা হবে। তৃতীয়ত, তালিকায় ব্যবহৃত তিন বিচারপতির সই কীভাবে সংগ্রহ বা জাল করা হল, সেই বিষয়টিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি টাকা লেনদেনের নথি, অনলাইন পেমেন্টের তথ্য এবং বাউন্স হওয়া চেকের বিষয়টিও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখতে পারেন।
এই ধরনের প্রতারণার ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। সরকারি বা আদালতের চাকরির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করে প্রতারণা করার ঘটনা আগেও সামনে এসেছে। তবে এই ঘটনায় বিচারপতিদের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করার অভিযোগ বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। কারণ, এতে শুধু চাকরিপ্রার্থীদের প্রতারণা করা হয়নি, বিচারব্যবস্থার নাম ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ।
কলকাতা হাই কোর্ট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। আদালতের বিচারপতির নাম ব্যবহার করে কোনও ভুয়ো নথি তৈরি করা হলে তা সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির পাশাপাশি আদালতের নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে। তাই এই ঘটনায় শুধু টাকা উদ্ধারের বিষয় নয়, বিচারপতিদের জাল সই ব্যবহার করে তৈরি করা নথির উৎস এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন পুলিশের তদন্তেই স্পষ্ট হবে, অভিযোগের পিছনে আসলে কতজন জড়িত এবং কতজন চাকরিপ্রার্থী এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে এই চক্রের আরও কোনও সদস্য রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।
চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কোনও সরকারি বা আদালতের চাকরির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, বিচারপতি বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম করে টাকা চাওয়া হলে তা যাচাই না করে অর্থ দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিজ্ঞপ্তি, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তথ্য যাচাই করা উচিত। ব্যক্তিগত পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রতারণার অন্যতম সাধারণ কৌশল হতে পারে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা হাই কোর্টে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নেওয়া এবং তিন বিচারপতির জাল সই-সহ ভুয়ো প্যানেল তৈরির অভিযোগে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও চাকরি না পাওয়া, অর্থ ফেরতের চেক বাউন্স এবং শেষে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া—পুরো ঘটনাই এখন তদন্তের আওতায়। অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, এর পিছনে একটি বড় চক্র থাকতে পারে। তদন্ত এগোলেই সেই দাবির সত্যতা এবং এই প্রতারণার প্রকৃত পরিধি স্পষ্ট হবে।


