রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণসভাকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরে যাচ্ছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর। চলতি বছরের রাষ্ট্রসংঘের সাধারণসভার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণসভার উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে ভারতের হয়ে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে বিদেশমন্ত্রীর। বিদেশমন্ত্রকের তরফে রবিবার এই সফর এবং কর্মসূচি সম্পর্কে জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণসভার অধিবেশন শুরু হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর। তবে সাধারণ বিতর্ক বা General Debate-এর উচ্চপর্যায়ের পর্ব শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর এবং চলবে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই পর্বে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে নিজেদের দেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন। ভারতের হয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বক্তব্য রাখবেন জয়শংকর।
বিদেশমন্ত্রকের বিবৃতি অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর ৮১তম সাধারণসভার উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন জয়শংকর। শুধু সাধারণসভায় ভাষণ দেওয়াই নয়, নিউ ইয়র্ক সফরের সময় একাধিক দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক বৈঠকেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ফলে এই সফর ভারতের জন্য শুধু রাষ্ট্রসংঘের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
রাষ্ট্রসংঘের এবারের সাধারণসভার মূল লক্ষ্য হিসেবে বৈশ্বিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা Sustainable Development Goals-কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং শান্তি, মর্যাদা ও সমতার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এই বিষয়গুলি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘ জানিয়েছে, এবারের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের মূল ভাবনা হল—**“Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all.”** অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আস্থা পুনর্গঠন এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতি সামলানোর পাশাপাশি এমন একটি রাষ্ট্রসংঘ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা সব দেশের মানুষের জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এই ভাবনাকে সামনে রেখেই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরবেন।
৮১তম সাধারণসভার সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সাধারণ বিতর্কের সময় রাষ্ট্রসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দেশগুলি নিজেদের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে অবস্থান জানাবে। ফলে কয়েকদিন ধরে নিউ ইয়র্কের রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তর আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
এই সময় ভারতের পক্ষ থেকেও একাধিক আন্তর্জাতিক বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। তবে বিদেশমন্ত্রকের ঘোষণায় জয়শংকরের নির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলির সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তাই কোন কোন দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হবে এবং কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হবে, তা নিয়ে এখনই নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। আপাতত নিশ্চিতভাবে জানা গিয়েছে, তিনি সাধারণসভার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন।
রাষ্ট্রসংঘের সাধারণসভা প্রতিবছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের এক মঞ্চে নিয়ে আসে। সাধারণ বিতর্কে দেওয়া বক্তৃতার মাধ্যমে দেশগুলি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, জলবায়ু, উন্নয়ন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। এবারের অধিবেশনও এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা এবারের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জয়শংকরের এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, রাষ্ট্রসংঘের সাধারণসভায় ভারতের বক্তব্য তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলিতে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হতে পারে। একইসঙ্গে বহুপাক্ষিক বৈঠকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলি নিয়েও মতবিনিময় হতে পারে। বিদেশমন্ত্রকের বিবৃতিতে এই সফরের সময়ে এমন একাধিক বৈঠকে তাঁর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে |
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরিবর্তে গত বছরও রাষ্ট্রসংঘের সাধারণসভায় ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জয়শংকর। চলতি বছরও বিদেশমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি নজর কেড়েছে। তবে এবারের সফর নিয়ে বিদেশমন্ত্রকের সরকারি ঘোষণার মূল বিষয় হল ৮১তম সাধারণসভার উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে ভারতের প্রতিনিধিত্ব এবং ২৬ সেপ্টেম্বর জয়শংকরের নির্ধারিত ভাষণ।
রাষ্ট্রসংঘের এই অধিবেশনে টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শান্তি, সমতা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মতো বিষয় গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি বিশ্বের চলমান বিভিন্ন সংকট নিয়েও সদস্য দেশগুলির প্রতিনিধিরা নিজেদের অবস্থান জানাবেন। ভারতের বক্তব্যেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সহযোগিতা এবং দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে ২৬ সেপ্টেম্বর জয়শংকরের ভাষণের আগে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ বিষয়বস্তু সম্পর্কে সরকারি ভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সব মিলিয়ে, ৮১তম রাষ্ট্রসংঘের সাধারণসভায় ভারতের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব এবারও বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরের হাতে। ২৬ সেপ্টেম্বর সাধারণসভার উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে তাঁর ভাষণের দিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের। পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক সফরে একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে তাঁর অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণসভাকে ঘিরে ভারতের কূটনৈতিক কর্মসূচিতে এই সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হতে চলেছে।


