পুরুলিয়ায় কুড়মি সমাজের কর্মসূচিতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলি প্রত্যাহারের ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার পুরুলিয়ার করম পরবের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কুড়মি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত মামলা দায়ের হয়েছিল, সেগুলি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর এই ঘোষণাকে ঘিরে কুড়মি সমাজের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লকের চাকলতোড় গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার করম পরবতিয়া মহাজড়ুয়াহীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দুর্গাপুরে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিকে নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠকের সময়ই তিনি মামলাগুলি প্রত্যাহারের বিষয়ে আধিকারিকদের জানিয়েছিলেন। এদিন প্রকাশ্য সভামঞ্চ থেকে সেই সিদ্ধান্তের কথা আবারও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কুড়মি আন্দোলনের সময় দায়ের হওয়া মামলাগুলি প্রত্যাহার করা হবে।
এই ঘোষণার পিছনে রয়েছে কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট। কুড়মি সম্প্রদায়ের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে তফসিলি উপজাতি বা ST মর্যাদার দাবি জানিয়ে আসছে। পাশাপাশি কুড়মালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এই দাবিগুলিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় একাধিকবার পথ ও রেল অবরোধের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
বিশেষভাবে ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বরের রেল অবরোধকে ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। Sangbad Pratidin-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর রাজ্য পুলিশ এবং রেল সুরক্ষা বাহিনীর তরফে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। মোট ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে—এর মধ্যে পুরুলিয়া জেলা পুলিশের হাতে ২৯ জন এবং RPF-এর হাতে ২২ জন গ্রেপ্তার হন। ওই ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ এবং রেল সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগও সামনে এসেছিল।
অন্যদিকে, ওই রেল অবরোধ নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত ওই ধরনের অবরোধকে অসাংবিধানিক ও বেআইনি বলে মন্তব্য করেছিল বলে Sangbad Pratidin জানিয়েছে। সেই আদালত-পর্বের পরেও অবরোধের চেষ্টা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত পদক্ষেপ করা হয়েছিল। ফলে মামলা প্রত্যাহারের মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা কুড়মি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
শুভেন্দু অধিকারী এদিন শুধু মামলা প্রত্যাহারের কথাই বলেননি, কুড়মি সমাজের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অধিকার নিয়েও একাধিক বার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কুড়মালি এবং রাজবংশী ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও সরকারের অবস্থান রয়েছে। PTI-কে উদ্ধৃত করে Rediff জানিয়েছে, রাজ্য সরকার কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
কুড়মি সমাজের উন্নয়নের জন্য চলতি বাজেটে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ভবিষ্যতে এই বরাদ্দ আরও বাড়ানো হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কুড়মি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডকে ফের সক্রিয় করার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
কুড়মি সমাজের পক্ষ থেকেও মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কুড়মি সমাজের নেতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো দাবি করেন, আন্দোলনের সময় তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও অত্যাচার করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কুড়মি সমাজের দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর এই অভিযোগকে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন আন্দোলনকারীর বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কুড়মি আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণও গত কয়েক বছরে বদলেছে। ২০২৫ সালের আন্দোলনের পর কুড়মি সমাজের একাংশ তৎকালীন শাসকদলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নেয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিষয়টি পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে নতুন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মামলা প্রত্যাহার, কুড়মালি ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং কুড়মি উন্নয়ন বোর্ড পুনরুজ্জীবনের মতো একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে।
ফলে পুরুলিয়ার মাটিতে মুখ্যমন্ত্রীর এদিনের ঘোষণা শুধু কয়েকটি মামলা প্রত্যাহারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কুড়মি সমাজের ভাষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের নতুন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও এতে উঠে এসেছে। এখন দেখার, ঘোষিত মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং কুড়মালি ভাষার অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়গুলি পরবর্তী সময়ে কীভাবে এগোয়।


