ইয়েমেনের সংঘাতকে ঘিরে ফের বাড়ল আন্তর্জাতিক উত্তেজনা। সৌদি আরবের পাশে দাঁড়িয়ে ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করলে পাকিস্তান ও তুরস্ককে ‘কঠোর’ জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথি গোষ্ঠী। হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য এবং ধামার প্রদেশের গভর্নর মহম্মদ আল-বুখাইতি এক ইরাকি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম *Express Tribune* জানিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান বা তুরস্ক সরাসরি ইয়েমেনের সংঘাতে সামরিকভাবে যুক্ত হলে হুথিরা দুই দেশের বিরুদ্ধেই পাল্টা পদক্ষেপ করবে।
আল-বুখাইতির বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ডের বিভিন্ন শহর, জ্বালানি পরিকাঠামো এবং সমুদ্রপথকে লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার খবর এসেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর হুথিরা দাবি করে, তারা সৌদি রাজধানী রিয়াধের কয়েকটি ‘সংবেদনশীল’ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে রিয়াধ বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও কালো ধোঁয়া দেখা যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, রিয়াধের দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। চলতি বছরের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে একটি ত্রিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির মূল নীতির মধ্যে রয়েছে তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও যৌথ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। চুক্তিতে একটি সদস্য দেশের উপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের উপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রয়েছে।
এই চুক্তির পর সৌদি আরবের উপর হুথিদের ধারাবাহিক হামলা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে চুক্তির অস্তিত্ব থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের উপর প্রতিটি হামলার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাকিস্তান বা তুরস্কের সেনা ইয়েমেনে পাঠানো হবে। পাকিস্তানের সরকারি বক্তব্যে এখনও পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপের কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা করা হয়নি। বরং ইসলামাবাদ সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন জানানোর পাশাপাশি ইয়েমেনে উত্তেজনা কমানো এবং রাজনৈতিক সমাধানের কথাও বলেছে।
পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় হুথি হামলার নিন্দা করে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের সমর্থনের কথা জানানো হয়। ইসলামাবাদ ইয়েমেনের পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমানো, সংলাপ এবং একটি রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষেও অবস্থান জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রকাশ্য সরকারি অবস্থানে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উপর গুরুত্ব রয়েছে।
অন্যদিকে তুরস্কের অবস্থানও পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তুরস্কের বিদেশমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, সৌদি আরব হুথিদের হামলার কারণে সামরিক ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ প্রয়োজনের মুখোমুখি হলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তুরস্ক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত সামরিক প্রয়োজন পূরণের বিষয়ে তিনি সহযোগিতার কথা বলেছেন। তবে তাঁর এই বক্তব্যকে ইয়েমেনে তুর্কি সেনা পাঠানোর সরাসরি ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। একই সঙ্গে তুরস্ক হুথিদের হামলার নিন্দা করে সংঘর্ষ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
এই অবস্থাতেই হুথিদের তরফে পাকিস্তান ও তুরস্ককে প্রকাশ্য সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। আল-বুখাইতি দাবি করেছেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইয়েমেনের মানুষের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হুথিদের সতর্কবার্তা দুই দেশের জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকার যদি সৌদি আরবের হয়ে ইয়েমেনে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে, তখন সেই সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হুথিদের এই বক্তব্যের পিছনে সাম্প্রতিক সৌদি-হুথি সংঘাতের বিস্তারও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই থেকে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা জোরদার করেছে বলে Reuters-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি শহর, জ্বালানি পরিকাঠামো এবং সমুদ্রপথে হামলার ফলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, তেল সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
১৯ সেপ্টেম্বরের রিয়াধ হামলার ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। হুথিরা রিয়াধের বিভিন্ন ‘সংবেদনশীল’ লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করলেও সৌদি পক্ষ জানিয়েছে, অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। একই দিনে ইয়ানবু, তাইফ, বিশ ও ফারাসানসহ আরও কয়েকটি সৌদি এলাকায় হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার কথাও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে।
এর ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তিন সদস্যের এই জোটের প্রধান লক্ষ্য প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। একই সঙ্গে ইসলামাবাদ জানিয়েছে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির। চুক্তির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিয়েও আপাতত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য।
অন্যদিকে হুথিদের হুমকি বাস্তবে কোনও সামরিক পদক্ষেপে পরিণত হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পাকিস্তান এখনও ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘোষণা করেনি। তুরস্কও সৌদি আরবকে প্রযুক্তিগত সামরিক সহায়তার সম্ভাবনার কথা বললেও ইয়েমেনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে আগামী দিনে সৌদি আরবের উপর হুথি হামলার মাত্রা, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োগের ধরন এবং পাকিস্তান-তুরস্কের পরবর্তী পদক্ষেপ—এই তিনটি বিষয় পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের সংঘাত শুধু সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতিও যুক্ত হয়ে পড়ছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হলে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বর্তমানে দুই দেশ কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ নেবে, তা এখনও তাদের সরকারি সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে।


