মালদার ভুতনিতে ভয়াবহ বন্যার মধ্যে ত্রাণের জন্য বানভাসি মানুষের হাহাকার আরও একবার প্রকাশ্যে এল। জলমগ্ন এলাকা থেকে ডিঙি নৌকায় করে ত্রাণ নিতে এসে একটি ত্রাণবাহী নৌকার কাছে কার্যত হুড়োহুড়ি শুরু করে দেন বহু মানুষ। কেউ নৌকা থেকে নেমে জলে ঝাঁপ দিয়ে ত্রাণের নৌকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলেও জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনপ্রতিনিধিদের মাইক হাতে বানভাসিদের শান্ত থাকার আবেদন করতে হয়।
বুধবার মালদার মানিকচক ব্লকের ভুতনি থানার অন্তর্গত উত্তর চণ্ডীপুরের বিনতলা ঘাটে এই ঘটনা ঘটে। মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্সের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ত্রাণ বিলির খবর আশপাশের প্লাবিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই বহু মানুষ ডিঙি নৌকায় করে বিনতলা ঘাটে পৌঁছন। খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়ার আশায় সকাল থেকেই অনেকে অপেক্ষা করছিলেন।
ভুতনি বর্তমানে বিস্তীর্ণ অংশে জলমগ্ন। বহু গ্রাম ও বসতি জলের তলায় চলে যাওয়ায় সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। কোথাও বাড়ির ছাদে, কোথাও স্কুলের ছাদে আবার কোথাও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন বানভাসি মানুষ। অনেক পরিবারের ঘরে রান্না করার মতো পরিস্থিতি নেই। পানীয় জল, শুকনো খাবার, পোশাক এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এই পরিস্থিতিতে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি নৌকা বিনতলা ঘাটে পৌঁছতেই মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়। কিন্তু ত্রাণ নিতে আসা মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, অনেকে ত্রাণের প্যাকেট পাওয়ার জন্য একসঙ্গে নৌকার দিকে এগিয়ে যান। কেউ কেউ নৌকা থেকে জলে নেমে ত্রাণবাহী নৌকার কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানিকচকের বিজেপি বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডল মাইক হাতে বানভাসিদের শান্ত থাকার আবেদন করেন। তিনি সবাইকে ধাক্কাধাক্কি না করে সারিবদ্ধভাবে ত্রাণ নেওয়ার অনুরোধ জানান। ত্রাণ বিলির সময় ভিড়ের মধ্যে কেউ জলে পড়ে গেলে বিপদ আরও বাড়তে পারত। সেই কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া মানুষের উদ্বেগ এবং অসহায়ত্বের ছবিও এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বন্যাকবলিত হিরানন্দপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তাঁরা গত দু’দিন ধরে বাড়ির ছাদে পলিথিন টাঙিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। জল বাড়তে থাকায় ঘরে খাবার মজুত রাখা সম্ভব হয়নি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সামান্য মুড়ি ও গুড় খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। একটি ত্রাণের প্যাকেট পেলেও তা দিয়ে পরিবারের সকলের কতদিন চলবে, তা নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা রয়েছে।
কালুটোনটোলা এলাকার বাসিন্দাদেরও একই ধরনের অভিযোগ। বহু পরিবার স্থানীয় একটি স্কুলের ছাদে আশ্রয় নিয়েছে। ত্রাণ নিতে তাঁদের অন্যের ডিঙি নৌকার উপর নির্ভর করে বিনতলা ঘাটে আসতে হচ্ছে। ফলে যাঁদের নিজেদের নৌকা নেই, তাঁদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। জলের মধ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ত্রাণ নিতে আসার কারণে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের সমস্যাও বাড়ছে।
ত্রাণ বিলির আয়োজক মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এদিন বিপুল পরিমাণ শুকনো খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়। ত্রাণের মধ্যে ছিল চিড়ে, গুড়, চাল, ডাল, আলু, চানাচুর, বিস্কুট, সর্ষের তেল, গামছা, মশারি এবং পরনের পোশাক। সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় ৪০ কুইন্টাল চিড়ে, ৬০ বস্তা চাল, ৬০ বস্তা আলু, ৪০০টি গামছা এবং ২০০টি মশারি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বন্যার্তদের প্রয়োজনের তুলনায় এই সামগ্রী যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ভুতনির ত্রাণ পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বন্যাকবলিত এলাকায় গিয়ে বানভাসি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ পৌঁছনোর দাবি করা হলেও বাস্তবে বহু এলাকায় পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি ত্রাণ বণ্টন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
অন্যদিকে, মানিকচকের বিজেপি বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডলের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও ত্রাণ বিলি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, বন্যাকবলিত মানুষজন বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় নির্দিষ্ট ঘাটে ত্রাণ বিলির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই কারণে অনেক মানুষ নৌকায় করে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন।
ভুতনির বন্যা পরিস্থিতিতে উদ্ধার এবং ত্রাণের জন্য নৌকাই এখন প্রধান ভরসা। জলমগ্ন গ্রামগুলিতে স্থলপথে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় মানুষজন নৌকার মাধ্যমে খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মীরাও নৌকায় করে জলবন্দি মানুষের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং ওষুধ পৌঁছে দিয়েছেন।
তবে ত্রাণ বিলির ক্ষেত্রে শুধু সামগ্রী পৌঁছে দিলেই হবে না, তা সঠিকভাবে বণ্টন করাও জরুরি। ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রত্যন্ত প্লাবিত এলাকাগুলিতে ছোট ছোট ত্রাণকেন্দ্র তৈরি, পরিবারভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত এবং নৌকায় করে বাড়ি বাড়ি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী মহিলা এবং অসুস্থ মানুষদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা দরকার।
বন্যার কারণে ভুতনির বহু মানুষের ঘরবাড়ি, খাবার মজুত এবং জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জল কমলেও তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগবে। এখন জরুরি প্রয়োজন শুকনো খাবার, পানীয় জল, ওষুধ, পোশাক, মশারি এবং নিরাপদ আশ্রয়। পাশাপাশি জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়া রুখতে স্বাস্থ্য পরিষেবা জোরদার করা দরকার।
বিনতলা ঘাটে ত্রাণের নৌকায় ওঠার জন্য বানভাসিদের হুড়োহুড়ির ঘটনা তাই শুধু একটি দিনের বিশৃঙ্খলার ছবি নয়। এর মাধ্যমে বন্যাকবলিত মানুষের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটও সামনে এসেছে। প্রশাসন এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিটি পরিবারের কাছে পর্যাপ্ত সাহায্য পৌঁছচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারি করা প্রয়োজন। ভুতনির বানভাসিদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত, সুশৃঙ্খল এবং সমন্বিত ত্রাণবণ্টনই এখন সবচেয়ে জরুরি।


