শুধু মহিলা হওয়ার কারণে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল তাঁকে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে ওই মহিলার পাশে দাঁড়াল সুপ্রিম কোর্ট। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড বা আইওসিএল-কে ১২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশের শীর্ষ আদালত। এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টে রিফিলিং হেল্পার বা ক্যাজুয়াল খালাসি পদে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মহিলা হওয়ার কারণে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনাকেই লিঙ্গবৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে দেখেছে সুপ্রিম কোর্ট।
বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি অরবিন্দ কুমার এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চ আইওসিএলের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, একজন মহিলা শুধুমাত্র মহিলা হওয়ার কারণে কোনও চাকরি থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না। এমন সিদ্ধান্ত মহিলাদের মর্যাদা এবং সমতার অধিকারের পরিপন্থী। এই কারণেই সংশ্লিষ্ট মহিলাকে আর চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার পরিবর্তে এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার সূত্রে জানা গিয়েছে, এলপিজি ফিলিং বা বটলিং প্ল্যান্টে রিফিলিং হেল্পার এবং ক্যাজুয়াল খালাসি পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলেন ওই মহিলা। স্থানীয় একটি কমিটির সুপারিশের তালিকাতেও তাঁর নাম ছিল। তিনি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছিলেন বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, একই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আরও ৪৩ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
অভিযোগ ছিল, ভারী গ্যাস সিলিন্ডার তোলার কাজ মহিলাদের পক্ষে সম্ভব নয়—এই ধারণার ভিত্তিতেই তাঁকে চাকরি দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা বা কাজ করার সক্ষমতা যাচাই না করে শুধুমাত্র তাঁর লিঙ্গকে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই যুক্তিকেই আদালত গ্রহণ করেনি। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, কোনও কাজের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বাস্তব সক্ষমতা এবং যোগ্যতা বিবেচনা করা উচিত। শুধুমাত্র মহিলা হওয়ার কারণে কাউকে অযোগ্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
শুনানির সময় আদালত প্রশ্ন তোলে, মহিলারা কি গ্যাস সিলিন্ডার তুলতে পারেন না? বিচারপতিদের বক্তব্যে উঠে আসে, দেশের বহু মহিলা প্রতিদিন নিজেদের বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করেন এবং নানা ধরনের শারীরিক পরিশ্রমের কাজও করেন। তাই মহিলা মানেই ভারী কাজ করতে পারবেন না—এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। আদালতের মতে, এই ধরনের পূর্বধারণা মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করে এবং লিঙ্গবৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে।
এই মামলায় সংশ্লিষ্ট মহিলা দীর্ঘ সময় ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। নিম্ন আদালত এবং পরবর্তী পর্যায়ের আদালতে তাঁর চাকরির দাবি সফল হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছয়। শুনানির সময় আদালত জানতে পারে, ওই মহিলা ইতিমধ্যেই অবসরের বয়স পার করে ফেলেছেন। ফলে এখন তাঁকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। সেই পরিস্থিতিতে আদালত এককালীন ১২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্যে মহিলাদের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক সমতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান সুযোগের অধিকার দিয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে প্রার্থীকে তাঁর যোগ্যতা এবং কাজের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হবে। লিঙ্গের ভিত্তিতে আগেই কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হলে তা সমতার নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না।
আইওসিএল একটি সরকারি মালিকানাধীন সংস্থা হওয়ায় আদালত এই ঘটনায় আরও গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিচারপতিদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সরকারি সংস্থার কাছ থেকে ন্যায়সঙ্গত এবং বৈষম্যহীন নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রত্যাশিত। সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি লিঙ্গের ভিত্তিতে কাউকে চাকরি থেকে বাদ দেয়, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত অধিকারের লঙ্ঘন নয়, বৃহত্তর সামাজিক বার্তাও বহন করে। কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে আদালত এই মামলায় সংশ্লিষ্ট মহিলাকে সরাসরি চাকরি দেওয়ার নির্দেশ দেয়নি। তার প্রধান কারণ, তিনি ইতিমধ্যেই অবসরের বয়স পেরিয়ে গিয়েছেন। তাই তাঁর দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং চাকরি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে এককালীন ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশের মাধ্যমে আদালত তাঁর প্রতি হওয়া অন্যায়ের স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই রায় কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব কাজকে শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর বলে মনে করা হয়, সেখানে মহিলাদের নিয়োগ নিয়ে এখনও নানা ধরনের সামাজিক ধারণা কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে কাজের প্রকৃতি দেখেই মহিলাদের অযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনও কাজের জন্য প্রার্থীকে বিবেচনা করার সময় তাঁর ব্যক্তিগত সক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতাই মূল বিষয় হওয়া উচিত।
এলপিজি বটলিং প্ল্যান্টে কাজের ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু সেই সক্ষমতা কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গের সঙ্গে একমাত্রিকভাবে যুক্ত নয়। পুরুষ এবং মহিলা উভয়েই প্রশিক্ষণ, দক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারেন। তাই নিয়োগের আগে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই না করে কেবল লিঙ্গের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া বৈষম্যমূলক হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। চাকরির বিজ্ঞপ্তি, যোগ্যতার মাপকাঠি, শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা এবং নিয়োগের সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। কোনও পদে নির্দিষ্ট শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন হলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং সব প্রার্থীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ করতে হবে।
এই মামলার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট মহিলা তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। চাকরি পাওয়ার বয়সসীমা পেরিয়ে গেলেও আদালত তাঁর অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েছে। ক্ষতিপূরণের নির্দেশের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যায় বা বৈষম্যের অভিযোগ থাকলে তা দীর্ঘ সময় পরেও বিচারযোগ্য হতে পারে।
সব মিলিয়ে, শুধুমাত্র মহিলা হওয়ার কারণে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যায় না—সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ কর্মক্ষেত্রে সমতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। আইওসিএল-কে ১২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ শুধু একটি নির্দিষ্ট মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং নিয়োগের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পূর্বধারণার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তাও। যোগ্যতা এবং সক্ষমতার ভিত্তিতেই চাকরির সুযোগ নির্ধারিত হওয়া উচিত—এই নীতিকেই আরও একবার সামনে আনল দেশের শীর্ষ আদালত।


