পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নতুন গতি তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন উপলক্ষে কলকাতায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতির খতিয়ান তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, গত কয়েক মাসে রাজ্যে একাধিক নতুন কারখানা তৈরি, পুরনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ, জমি হস্তান্তর এবং বড় বিনিয়োগ প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে নতুন শিল্পগন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বিশ্বকর্মা পুজোর আবহে শিল্প ও কর্মসংস্থানকে সামনে রেখে রাজ্য সরকারের একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান শুভেন্দু। তাঁর দাবি, গত চার মাসে রাজ্যে নতুন শিল্পপ্রকল্পের পাশাপাশি বেশ কিছু বন্ধ বা ধুঁকতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুটমিল খোলা, নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ, কারখানার সম্প্রসারণ এবং শিল্পতালুকে জমি দেওয়ার মতো বিষয়গুলিকে তিনি রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতির পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, অল্প সময়ের মধ্যে রাজ্যে একাধিক জুটমিল খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী নতুন ইউনিট তৈরি বা পুরনো কারখানার সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছে। আমুল এবং শ্যাম স্টিলের মতো সংস্থার শিল্পপ্রকল্পের সম্প্রসারণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে রাজ্য সরকার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, জমি এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
শিল্পায়নের পাশাপাশি চা শিল্পের উন্নয়ন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনায় পশ্চিমবঙ্গ অনুমোদন পেয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় দার্জিলিং থেকে তরাই-ডুয়ার্স চা বলয়ে উন্নয়নমূলক কাজের সুযোগ তৈরি হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ৩৩০ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, এই অর্থ চা শ্রমিক এবং চা-নির্ভর অঞ্চলের উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে রাজ্য সরকার।
প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক যোজনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের কথাও উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় বাজেটে বাংলা ও অসমের জন্য এই প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, আগের রাজ্য সরকার প্রকল্পের টাকা গ্রহণ করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে নতুন করে প্রস্তাব পাঠানোর পর পশ্চিমবঙ্গ ৩৩০ কোটি টাকার অনুমোদন পেয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এই বিষয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য আলাদা হতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে সেই রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসাবেই দেখা হচ্ছে।
শিল্পক্ষেত্রে জমি হস্তান্তরের বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি জানান, ২৩ সেপ্টেম্বর বজবজ শিল্পতালুক-সহ মোট ৩২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাতে জমি তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শিল্পের জন্য জমি পাওয়া গেলে কারখানা নির্মাণ, উৎপাদন শুরু এবং কর্মসংস্থান তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত এগোতে পারে। তাই জমি হস্তান্তরের এই কর্মসূচিকে রাজ্যের শিল্পনীতির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছে সরকার।
এছাড়াও পুজোর আগেই হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসের একটি নতুন ইউনিট উদ্বোধনের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয়েছে এই নতুন ইউনিট। মহাষষ্ঠীর আগেই সেটির উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। হলদিয়া দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। পেট্রোকেমিক্যালস, তেল, রাসায়নিক এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের সঙ্গে এই অঞ্চলের অর্থনীতি জড়িয়ে রয়েছে। নতুন ইউনিট চালু হলে শিল্পোৎপাদন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে।
রাজ্যের শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানোর কথাও বলেন। তাঁর বক্তব্য, শিল্পপতিদের রাজ্যে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে দ্রুত অনুমোদন, জমির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। নতুন শিল্পপ্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, বাস্তবে কারখানা তৈরি হচ্ছে কি না এবং কর্মসংস্থান হচ্ছে কি না—সেই বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিল্পমহলের একাংশ।
শিল্পায়নের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামোর উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন শিল্পতালুক, রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল এবং পরিবহণের সুযোগ না থাকলে বড় শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন। ফলে জমি দেওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলগুলিতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও রাজ্য সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব হয়ে উঠছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি এই বৃহত্তর পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বর্ধমান, হলদিয়া, বজবজ এবং উত্তরবঙ্গের চা বলয়—রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পসম্ভাবনাকে একসঙ্গে তুলে ধরেছেন শুভেন্দু। দক্ষিণবঙ্গের শিল্পাঞ্চলে নতুন কারখানা ও সম্প্রসারণের উদ্যোগের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে চা শিল্পের উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে দাবি সরকারের।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ২২ সেপ্টেম্বর তিনি উত্তরবঙ্গ সফরে যাবেন। সেই সফরে চা শিল্প, শ্রমিক কল্যাণ এবং উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। বহু পরিবার সরাসরি চা বাগানের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি পরিবহণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটন এবং স্থানীয় বাজারও চা শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাই চা শ্রমিক যোজনার অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং তার সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছবে, সেদিকেও নজর থাকবে।
তবে শিল্পপ্রকল্প ঘোষণা এবং বাস্তবে তা চালু হওয়ার মধ্যে বেশ কিছু ধাপ থাকে। জমি হস্তান্তর, পরিবেশগত অনুমোদন, পরিকাঠামো তৈরি, অর্থসংস্থান, নির্মাণকাজ এবং উৎপাদন শুরু—সবকিছু সম্পূর্ণ হলেই কোনও শিল্পপ্রকল্পের সুফল পাওয়া সম্ভব। ফলে রাজ্য সরকারের ঘোষণাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর রাজ্যের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের দাবি, একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের পরিবেশ বদলানোর চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, এই প্রকল্পগুলি কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ মানুষের কতটা উপকার হয়, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে। আপাতত বিশ্বকর্মা পুজোর আবহে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।


