পুজোর পরেই ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা আইএফএ-র নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগেই সভাপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার আইএফএ অনুমোদিত সমস্ত সংস্থার সদস্যদের উদ্দেশে লেখা পদত্যাগপত্র সংগঠনের সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন তিনি। নতুন স্পোর্টস কোড অনুযায়ী, সত্তরোর্ধ্ব কোনও ব্যক্তি অধীনস্থ ক্রীড়া সংস্থার প্রশাসনিক পদে থাকতে পারবেন না। সেই বয়সজনিত নিয়মের কারণেই নির্বাচনের আগে দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলার ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্তে আইএফএ-র অন্দরে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে তাঁর পদত্যাগপত্রে কোনও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বরং বয়সসংক্রান্ত নিয়ম মেনে সময় থাকতেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টিই স্পষ্ট করেছেন তিনি। আইএফএ-র সভাপতি হিসাবে নিজের দায়িত্ব পালনের সুযোগকে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলেও উল্লেখ করেছেন অজিত।
ষাটের দশকে কালীঘাট মিলন সংঘের সাধারণ সদস্য হিসাবে ময়দানে প্রবেশ করেছিলেন তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বাংলার ফুটবল প্রশাসনে তাঁর পথচলা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন স্তরে কাজ করার পর আইএফএ-র সভাপতির দায়িত্ব পান অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। সভাপতির পদে থাকাকালীন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আন্তরিকতা, নিষ্ঠা এবং দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
পদত্যাগপত্রে অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও প্রশাসনিক পদে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই সরে দাঁড়ানোকে তিনি সমীচীন মনে করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন স্পোর্টস কোডের নিয়মকে সম্মান জানিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী প্রজন্মের প্রশাসকেরা বাংলার ফুটবলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন—এমন আশাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
তবে প্রশ্ন উঠছে, বয়সসংক্রান্ত নিয়মের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও এত দিন পরে কেন পদত্যাগ করলেন আইএফএ সভাপতি? এই প্রসঙ্গে অজিত জানিয়েছেন, কলকাতা ফুটবল লিগের চলতি মরশুমের কথা মাথায় রেখেই তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমানে কলকাতা লিগের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব চলছে। শনিবার লিগের শেষ দিনের খেলা হওয়ার কথা। প্রতিযোগিতা যাতে কোনওরকম প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে শেষ করা যায়, সেই কারণেই তিনি লিগ চলাকালীন পদত্যাগ করতে চাননি বলে জানিয়েছেন।
বাংলার ফুটবল ক্যালেন্ডারে কলকাতা লিগের গুরুত্ব যথেষ্ট। একাধিক ক্লাব, ফুটবলার, কোচ এবং সংগঠক এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে লিগের মাঝপথে প্রশাসনিক পরিবর্তন হলে তা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারত। সেই জায়গা থেকেই লিগ শেষ হওয়ার মুখে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও তাঁর পদত্যাগের পর আইএফএ-র প্রশাসনিক দায়িত্ব কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে পরবর্তী ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সভাপতির পদ ছাড়লেও ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। পদত্যাগপত্রের শেষ অংশে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আগের মতোই অটুট থাকবে। আইএফএ তাঁর কাছে পরিবারের মতো। তাই প্রশাসনিক পদে না থাকলেও আইএফএ-র শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে তিনি পাশে থাকবেন। বাংলার ফুটবলের উন্নতি এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর আগ্রহ বজায় থাকবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগের ফলে আসন্ন আইএফএ নির্বাচনের আগে সংগঠনের প্রশাসনিক সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন সভাপতি কে হবেন, নির্বাচনের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে এবং বর্তমান কমিটির ভূমিকা কী থাকবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর আগামী দিনে মিলবে। তবে আপাতত বয়সসংক্রান্ত স্পোর্টস কোডের নিয়ম মেনেই দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অজিত।
বাংলার ফুটবল প্রশাসনে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর তাঁর এই বিদায় তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ময়দানের সঙ্গে কয়েক দশকের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পদে থাকা বা না থাকার বাইরে ফুটবলের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা থাকবে। আগামী প্রজন্মের প্রশাসকদের হাতে বাংলার ফুটবল আরও শক্তিশালী হবে—এই প্রত্যাশা নিয়েই আইএফএ সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি।


