সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বড়সড় উদ্বেগের খবর সামনে এসেছে। ছুটিতে বাংলাদেশে ফিরে আসা হাজার হাজার প্রবাসী হঠাৎ জানতে পারছেন, তাঁদের UAE-এর ভিসা বাতিল হয়ে গিয়েছে। ফলে তাঁরা আর আগের কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। কারও চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, কারও ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার বহু পরিবার প্রিয়জনের বিদেশে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। ভিসা বাতিলের নির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৪,৮০০ বাংলাদেশি নাগরিক এই সমস্যার মুখে পড়েছেন। যদিও বিভিন্ন সময়ে ভিসা বাতিলের সংখ্যা নিয়ে আলাদা তথ্য সামনে এসেছে। এর আগে বাংলাদেশের এক মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রায় ৬২৬ জনের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে এখনও কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। তবে কয়েক হাজার বাংলাদেশি যে সমস্যায় পড়েছেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জানা গিয়েছে, বহু বাংলাদেশি কর্মসূত্রে UAE-তে থাকেন। তাঁরা নিয়মিত ছুটি কাটাতে দেশে ফেরেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবার আমিরাতে ফিরে যান। কিন্তু এবার অনেকেই দেশে ফেরার পর ই-মেল বা মোবাইল বার্তার মাধ্যমে জানতে পারেন, তাঁদের রেসিডেন্স ভিসা বাতিল করা হয়েছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভিসা বাতিলের কোনও কারণও জানানো হয়নি। ফলে প্রবাসীরা বুঝতে পারছেন না, কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে বা তাঁরা আদৌ আগের চাকরি ও ব্যবসায় ফিরতে পারবেন কি না।
আক্রান্তদের মধ্যে আবুল কালাম আজাদ নামে এক বাংলাদেশির ঘটনাও সামনে এসেছে। তিনি প্রায় ২৭ বছর ধরে UAE-তে বসবাস করছিলেন। গত ৭ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশে ফেরেন। এরপর ২৪ জুলাই একটি ই-মেলের মাধ্যমে জানতে পারেন, তাঁর UAE ভিসা বাতিল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই বার্তায় বাতিলের কোনও কারণ উল্লেখ করা হয়নি। আজাদের দাবি, আমিরাতে তাঁর ব্যবসা রয়েছে এবং তাঁর স্ত্রীও সেখানে থাকেন। ফলে ভিসা বাতিলের কারণে তিনি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আর্থিক—তিন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।
শুধু আজাদ নন, আরও বহু প্রবাসী একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কারও কাছে জুলাই মাসে ই-মেল এসেছে, আবার কেউ মোবাইল ফোনে বার্তার মাধ্যমে ভিসা বাতিলের খবর পেয়েছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁরা মাত্র দুই বা তিন মাস বাংলাদেশে ছিলেন। অথচ UAE-এর সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনও বিদেশি নাগরিক ছয় মাসের বেশি সময় আমিরাতের বাইরে থাকলে তাঁর রেসিডেন্স ভিসা বাতিল হতে পারে। আক্রান্তদের বক্তব্য, তাঁদের ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা পূর্ণ হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রায় ৩৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সরকারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আবেদন জানান। প্রবাসীদের পক্ষ থেকে পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা এবং ভিসা সমস্যার সমাধানের দাবি তোলা হয়। তাঁদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে ছিল ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নিয়মিত আর্থিক সাহায্য এবং প্রয়োজনে অন্য দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
কিছু প্রবাসী পরিবার চালানোর জন্য প্রতি মাসে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশি টাকা সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিদেশে যাওয়ার সময় অনেকেই নিয়োগকারী সংস্থাকে বিপুল অর্থ দিয়েছিলেন। কেউ কেউ ঋণ নিয়ে ভিসা ও চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। এখন UAE-তে ফিরতে না পারলে তাঁদের ঋণের বোঝা, পরিবারের খরচ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রক UAE কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, অনেক ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশির আমিরাতে দোকান, ব্যবসা এবং অন্যান্য সম্পত্তি রয়েছে। কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
তবে UAE কর্তৃপক্ষ এখনও গণহারে ভিসা বাতিলের নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি। ফলে বিভিন্ন মহলে নানা সম্ভাবনার কথা উঠে আসছে। UAE-এর নিয়ম অনুযায়ী, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকা, নথিপত্রের সমস্যা, চাকরি হারানো, ভিসা নবীকরণে জটিলতা অথবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাচাইয়ের কারণে ভিসা বাতিল হতে পারে। তবে বর্তমান ঘটনায় কোন কারণটি প্রধান ভূমিকা নিয়েছে, তা সরকারি ভাবে নিশ্চিত নয়।
বাংলাদেশের এক মন্ত্রীর আগের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিসা বাতিলের ঘটনা শুধুমাত্র বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ঘটেনি। পাকিস্তান, মিশর, ফিলিপিন্স, নেপাল-সহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকরাও একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন বলে জানা যায়। সেই কারণে বিষয়টি কেবল কোনও একটি দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রবাসী সংগঠনগুলির একাংশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে UAE কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিকদের উপর নজরদারি বাড়িয়ে থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বা সংবেদনশীল পোস্ট, অপরাধমূলক কার্যকলাপ এবং সন্দেহজনক যোগাযোগের বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হতে পারে। তবে এই কারণগুলির সঙ্গে বর্তমান ভিসা বাতিলের সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও প্রমাণিত হয়নি।
UAE-তে প্রায় ১২ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস ও কাজ করেন। তাঁরা নির্মাণ, উৎপাদন, পরিবহণ, পরিষেবা, ব্যবসা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্ত। বহু পরিবার তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে UAE-তে কর্মরত বাংলাদেশিরা প্রায় ৩.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এত বড় প্রবাসী সম্প্রদায়ের ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবারগুলির উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের প্রধান দাবি, UAE কর্তৃপক্ষ যেন ভিসা বাতিলের কারণ স্পষ্ট করে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের পুনরায় ভিসা পাওয়ার সুযোগ দেয়। পাশাপাশি, যাঁরা চাকরি বা ব্যবসা হারানোর মুখে রয়েছেন, তাঁদের জন্য বাংলাদেশ সরকার যেন আর্থিক ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করে, সেই আবেদনও জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, UAE-তে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা বাতিলের ঘটনা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। আক্রান্তদের প্রকৃত সংখ্যা, বাতিলের কারণ এবং ভবিষ্যতে তাঁদের পুনরায় আমিরাতে ফেরার সুযোগ—এই তিনটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কতটা সমাধান করতে পারে, সেদিকেই নজর রয়েছে প্রবাসী সমাজের।


