ইউপিআই লেনদেনে অতিরিক্ত ফি চালুর সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে। অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন করে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর চালুর সিদ্ধান্তের পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে কংগ্রেস। বিরোধীদের অভিযোগ, মার্কিন সংস্থাগুলির চাপের কাছে নতিস্বীকার করেই ইউপিআই লেনদেনে ফি বসানোর পথে হাঁটছে মোদি সরকার। সেই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে পালটা জবাব দিল কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক। অর্থমন্ত্রকের দাবি, ইউপিআই ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ভারত স্বাধীনভাবেই নিয়েছে। এর নেপথ্যে কোনও বিদেশি প্রভাব নেই।
### ইউপিআই লেনদেনে অতিরিক্ত ফি ঘিরে বিতর্ক
সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার ইউপিআই লেনদেনে ২০০০ টাকার বেশি পেমেন্টের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ফি সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। বুধবার সেই অতিরিক্ত ফি কাঠামো প্রকাশ্যে আসে। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পরেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় বিতর্ক। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের ফলে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এদিকে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ইউপিআই লেনদেনে ফি চালুর সিদ্ধান্ত কোনও বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়। আগামী দিনে সমস্ত ধরনের অনলাইন পেমেন্টের উপর ফি বসানোর পথ তৈরি করতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই মোদি সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।
তবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক জানিয়েছে, ইউপিআই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার স্বার্থে ভারত নিজস্ব সিদ্ধান্তেই এই পরিবর্তন এনেছে।
### রাহুল গান্ধীর আক্রমণ
ইউপিআই লেনদেনে অতিরিক্ত ফি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে সরব হন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সংস্থাগুলি ভারতের এমডিআরমুক্ত ইউপিআই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে এসেছে। এবার সেই বিদেশি চাপের কাছে প্রধানমন্ত্রী নতিস্বীকার করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় উঠে আসে। প্রথমত, ভারতে এতদিন ধরে চালু থাকা এমডিআরমুক্ত অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, বিদেশি সংস্থাগুলির চাপের অভিযোগ। তাঁর দাবি, মার্কিন সংস্থাগুলির দীর্ঘদিনের আপত্তির পরেই ইউপিআই লেনদেনে ফি বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাহুলের এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, ভারতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিদেশি চাপের কোনও ভূমিকা রয়েছে কি না। সেই অভিযোগের জবাবেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের তরফে বিবৃতি দেওয়া হয়।
### খাড়গের বক্তব্যেও কেন্দ্রকে নিশানা
ইউপিআই লেনদেনে অতিরিক্ত ফি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেও কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত কর বা ফি চাপানো হলে শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই আদায় করা হবে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পণ্য ও পরিষেবার দামের উপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
খাড়গের বক্তব্যে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক চাপের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তাঁর মতে, অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থায় অতিরিক্ত খরচের বোঝা ব্যবসায়ীদের উপর পড়লেও শেষ পর্যন্ত তা ক্রেতাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।
কংগ্রেসের এই বক্তব্যের পরেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইউপিআই ব্যবস্থায় এমডিআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে বিদেশি চাপের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।
### কেন্দ্রের পালটা জবাব
কংগ্রেসের অভিযোগের জবাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কেউ কেউ দাবি করছেন যে ইউপিআই লেনদেনে ফি বসানোর বিষয়টি বাহ্যিক চাপের জের। কিন্তু এই দাবির সত্যতা নেই। ভারত অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার স্বার্থে স্বাধীনভাবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অর্থমন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউপিআই পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। সরকারের দাবি, নতুন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের কাঠামো আরও সুসংহত করা হবে।
কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, এমডিআর কোনও কর বা ফি নয়। এই অর্থ অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত পক্ষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ এমডিআর থেকে প্রাপ্ত অর্থ একটি নির্দিষ্ট পক্ষের কাছে না গিয়ে পেমেন্ট ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশীদারের মধ্যে বণ্টিত হবে বলে অর্থমন্ত্রকের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
### এমডিআর কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এমডিআর বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট হল অনলাইন পেমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যাঙ্ক বা পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারীদের আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা। কোনও ব্যবসায়ী অনলাইনে অর্থ গ্রহণ করলে সেই লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যাঙ্ককে দিতে হয়। সেই অর্থের কাঠামোকেই এমডিআর বলা হয়।
ভারতে ২০২০ সালের পর থেকে ইউপিআই লেনদেনে এমডিআর কার্যকর ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইউপিআই ব্যবহার আরও বাড়তে থাকে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ইউপিআই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
এবার নতুন করে এমডিআর সংক্রান্ত ব্যবস্থা চালুর ফলে ইউপিআই লেনদেনের কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে চলেছে। তবে নতুন ব্যবস্থায় কার উপর কতটা খরচ পড়বে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো নিয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
### ইউপিআই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
কেন্দ্রের দাবি, ইউপিআই পেমেন্ট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতেই এই পদক্ষেপ। অন্যদিকে কংগ্রেসের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত আগামী দিনে অনলাইন পেমেন্টে আরও ফি বসানোর পথ তৈরি করতে পারে। ফলে ইউপিআই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইউপিআই ব্যবস্থার প্রসার ভারতে ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় সংস্থা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। তাই লেনদেনের খরচ, ব্যবসায়ীদের উপর আর্থিক চাপ এবং সাধারণ মানুষের পেমেন্ট অভ্যাসে এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন এমডিআর ব্যবস্থা কোনও কর বা ফি নয়। অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অর্থ বণ্টনের জন্যই এই কাঠামো চালু করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, এর ফলে ইউপিআই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
### রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত
ইউপিআই লেনদেনে অতিরিক্ত ফি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে ঘিরে কেন্দ্র ও বিরোধীদের মধ্যে মতবিরোধ স্পষ্ট হয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্ব বিদেশি চাপের অভিযোগ তুললেও কেন্দ্র তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। একদিকে রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গের বক্তব্যে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের উপর সম্ভাব্য আর্থিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রক জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের নিজস্ব নীতি নির্ধারণের অংশ।
ফলে ইউপিআই লেনদেনে এমডিআর চালুর সিদ্ধান্ত আগামী দিনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে নজর থাকবে। অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্ক এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের উপর এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে, ইউপিআই লেনদেনে অতিরিক্ত ফি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, বিদেশি চাপ নয়, বরং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


