রাজস্থানের পুরসভা নির্বাচনের ফলাফলে একদিকে যেমন শাসকদল বিজেপি নিজেদের শক্তি ধরে রেখেছে, তেমনই অন্যদিকে কংগ্রেসের জন্য উঠে এসেছে একাধিক সতর্কবার্তা। সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছে বামপন্থী দল সিপিএম। রাজ্যের কয়েকটি এলাকায় সিপিএমের ফলাফল রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। পাশাপাশি আম আদমি পার্টি এবং নির্দল প্রার্থীরাও বেশ কিছু জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছেন। ফলে রাজস্থানের পুরভোটে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ একেবারে একপাক্ষিক হয়নি।
## ৩০৯টি পুরসভায় ভোট, নজরে বিজেপি-কংগ্রেস
রাজস্থানের ৩০৯টি শহরাঞ্চলীয় স্থানীয় সংস্থায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল ১০টি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন, ৫১টি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল এবং ২৪৮টি পুরসভা। মোট ১০ হাজারেরও বেশি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচনের জন্য ভোটগ্রহণ করা হয়। প্রায় ১ কোটি ৪৪ লক্ষ ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। দুই দফায়, ৯ এবং ১১ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের পর ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে গণনা শুরু হয়।
প্রাথমিক ফলাফল থেকেই বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছবি স্পষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত একাধিক পুরসভায় বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কংগ্রেসও কিছু জায়গায় জয় পেয়েছে, তবে রাজ্যের সর্বত্র বিজেপির বিরুদ্ধে সমানভাবে লড়াই গড়ে তুলতে পারেনি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ৩০৯টি শহরাঞ্চলীয় সংস্থার মধ্যে বিজেপি প্রায় ১৪৮টি সংস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে প্রায় ১০৪টি সংস্থায়। আরও কয়েকটি জায়গায় দুই দল সমান সংখ্যক আসন পেয়েছে। ফলে বহু পুরসভায় বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে নির্দল কাউন্সিলরদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। <9
## জয় এলেও সব জায়গায় স্বস্তি নেই বিজেপির
রাজস্থানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মার নেতৃত্বে এই পুরভোটকে সরকারের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছিল। সামগ্রিক ফলাফলে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দলকে ধাক্কা খেতে হয়েছে।
আজমের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বিজেপির আসনসংখ্যা কংগ্রেসের তুলনায় কম হয়েছে। ৮০ সদস্যের এই পুরসভায় কংগ্রেস ৩৭টি আসন পেয়েছে, বিজেপি পেয়েছে ৩২টি। তবে কোনও দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ১১ জন নির্দল কাউন্সিলর বোর্ড গঠনে ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠেছেন।
আজমের ছাড়াও কেকরি ও কিশনগড়ের মতো জায়গাতেও ঝুলন্ত ফলাফল দেখা গিয়েছে। অন্যদিকে পুষ্কর, সাওয়ার এবং পিসাঙ্গানে বিজেপি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভিলওয়াড়ায় বিজেপি ৭০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৫টিতে জয় পেয়ে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সেখানে কংগ্রেস মাত্র ১০টি আসন পেয়ে তৃতীয় স্থানে নেমে গিয়েছে, আর নির্দলরা পেয়েছেন ১৫টি আসন। <Cite refs={\(“turn0news10”,”turn0news15″\)}/>
## কংগ্রেসের জন্য বড় সতর্কবার্তা
পুরভোটের ফলাফল কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রাজ্যের কিছু পুরসভায় কংগ্রেস ভালো ফল করলেও বহু জায়গায় দলীয় প্রার্থীরা বিজেপি, নির্দল এবং ছোট দলগুলির কাছে পিছিয়ে পড়েছেন।
জয়পুরে বিজেপি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ওয়ার্ডে জয় পেয়েছে। আবার কিছু শহরে কংগ্রেস বিজেপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু সার্বিকভাবে কংগ্রেসের ফলাফলকে আশাব্যঞ্জক বলা যাচ্ছে না। বিশেষ করে যে সব এলাকা ঐতিহ্যগতভাবে কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেও দলকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
কংগ্রেসের তরফে ভোটের আগে ও পরে परिसীমা নির্ধারণ, প্রশাসনিক প্রভাব এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে ফলাফলের পর দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং প্রার্থী বাছাই নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ফলাফল কংগ্রেসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বলেই মনে করা হচ্ছে।
## সিপিএমের চমকপ্রদ উত্থান
এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম সিপিএমের সাফল্য। রাজস্থানের মতো রাজ্যে, যেখানে মূল লড়াই সাধারণত বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে সিপিএমের কয়েকটি এলাকায় ভালো ফলাফল রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিশেষ করে নোখা এলাকায় সিপিএম উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন জিতে বোর্ড গঠনের পথে এগিয়েছে বলে খবর। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, নোখা পুরসভায় সিপিএম ২৯টি আসন পেয়েছে। এই ফলাফল বামপন্থী দলটির কাছে নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং স্থানীয় ইস্যুকে সামনে রেখে সিপিএম যে সংগঠন গড়ে তুলেছিল, তারই প্রতিফলন এই ফলাফলে দেখা যাচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
রাজস্থানে সিপিএমের এই সাফল্য জাতীয় রাজনীতিতেও আগ্রহ তৈরি করেছে। কারণ, উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বহু রাজ্যে বাম দলগুলি গত কয়েক বছরে নির্বাচনীভাবে দুর্বল হয়েছে। সেই জায়গায় একটি স্থানীয় নির্বাচনে সিপিএমের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন দলটির সংগঠন এবং জনভিত্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
## আম আদমি পার্টিরও নজরকাড়া ফল
সিপিএমের পাশাপাশি আম আদমি পার্টিও রাজস্থানের পুরভোটে চমক দিয়েছে। বারান পুর পরিষদে প্রথমবারের মতো আম আদমি পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে এগিয়েছে। এর ফলে ওই এলাকায় বোর্ড গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রাজস্থানে বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আম আদমি পার্টির উপস্থিতি এখনও সীমিত। কিন্তু পুরভোটে কয়েকটি জায়গায় ভালো ফলাফল দলটির সংগঠন বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। স্থানীয় পরিষেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রচারকে সামনে রেখে দলটি যে ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে, তার কিছুটা প্রভাব এই ফলাফলে দেখা গিয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
## নির্দলরাই বহু জায়গায় নির্ণায়ক
রাজস্থানের পুরভোটে নির্দল প্রার্থীদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বহু পুরসভায় বিজেপি বা কংগ্রেস কোনও দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে নির্দল কাউন্সিলরদের সমর্থন ছাড়া বোর্ড গঠন কঠিন হতে পারে।
ভরতপুরে নির্দল প্রার্থীদের সাফল্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এটি মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মার রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সেখানে বিজেপি প্রত্যাশিত দাপট দেখাতে পারেনি। জোধপুর, আজমের এবং আরও কয়েকটি শহরেও নির্দলরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে বোর্ড গঠনের আগে দলবদল, সমর্থন আদায় এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে ভোটের ফল প্রকাশ পেলেও বেশ কিছু পুরসভায় শেষ সিদ্ধান্ত এখনও নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতার উপর।
## ২০২৮ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বড় পরীক্ষা
রাজস্থানের পুরভোটকে ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ‘সেমিফাইনাল’ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। যদিও পুরসভা নির্বাচন এবং বিধানসভা নির্বাচনের বিষয় আলাদা, তবু স্থানীয় সংগঠন, ভোটারদের মনোভাব এবং দলীয় কর্মীদের সক্রিয়তা বোঝার ক্ষেত্রে এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
বিজেপি এই ফলাফলকে নিজেদের সংগঠন ও সরকারের প্রতি জনসমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেসকে এখন স্থানীয় স্তরে সংগঠন মজবুত করা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কমানো এবং নির্দিষ্ট জনসমস্যা নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সিপিএম ও আম আদমি পার্টির ফলাফলও দেখিয়ে দিয়েছে যে, বিজেপি-কংগ্রেসের দ্বিমুখী লড়াইয়ের বাইরে ছোট দল এবং নির্দল প্রার্থীদের জন্যও জায়গা রয়েছে। আগামী দিনে এই শক্তিগুলি কীভাবে নিজেদের সংগঠন বিস্তার করে, তার উপর রাজস্থানের রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
সব মিলিয়ে রাজস্থানের পুরভোটে বিজেপি এগিয়ে থাকলেও কংগ্রেসকে সম্পূর্ণভাবে মুছে দিতে পারেনি। বরং নির্দল, আম আদমি পার্টি এবং সিপিএমের ফলাফল বুঝিয়ে দিয়েছে, রাজ্যের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।


