বিশ্বকর্মাপুজোয় বামেদের অঞ্জলি দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার কলকাতার বালিগঞ্জে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ আয়োজিত গণেশপুজোর সূচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বামপন্থীদের উদ্দেশে বলেন, নবান্নে বিশ্বকর্মাপুজোর দিন তিনি নিজে অঞ্জলি দেবেন। চাইলে বামপন্থীরাও সেখানে এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে পুজোয় অংশ নিতে পারেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক মহল কটাক্ষ এবং পাল্টা চ্যালেঞ্জ—দুইভাবেই দেখছে। সম্প্রতি বাংলায় গণেশপুজো আয়োজন নিয়ে বামেদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিল বলে দাবি করেন শুভেন্দু। সেই প্রসঙ্গ টেনেই তিনি বামেদের উদ্দেশে অঞ্জলির আমন্ত্রণ জানান। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ধর্মীয় উৎসব পালনে কোনও অপ্রয়োজনীয় বাধা বা আঞ্চলিক বিভাজন থাকা উচিত নয়।
বিশ্বকর্মাপুজোকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের ছুটির দিন নিয়েও পরিবর্তন হয়েছে। আগে ১৭ সেপ্টেম্বর ছুটি থাকার কথা থাকলেও পরে জানানো হয়েছে, এ বছর বিশ্বকর্মাপুজোর ছুটি হবে ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার। সেই দিনই নবান্নে পুজোয় অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
## গণেশপুজো নিয়ে বামেদের বক্তব্যের জবাব
বালিগঞ্জের ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, বাংলায় গণেশপুজো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, গণেশপুজো মহারাষ্ট্রের উৎসব, তাই বাংলায় তা পালন করা উচিত নয়। এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে আঞ্চলিক বিভাজনের কোনও প্রাচীর থাকা উচিত নয়।
তাঁর বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন দেবদেবীর পুজো পালিত হয়। সেই পুজো কোনও নির্দিষ্ট রাজ্য বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলায় গণেশপুজো আয়োজনের বিরোধিতা করা হলে তা মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর অপ্রয়োজনীয় বাধা তৈরি করবে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।
শুভেন্দুর দাবি, আগের সরকার গণেশপুজোকে ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মানুষের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের কারণে গণেশপুজো এখন রাস্তায় এবং প্রকাশ্য জায়গায় পালিত হচ্ছে। তাঁর কথায়, মানুষই সেই বাধা ভেঙে দিয়েছে।
## বামেদের উদ্দেশে সরাসরি আমন্ত্রণ
গণেশপুজোর অনুষ্ঠান থেকেই বিশ্বকর্মাপুজোয় বামেদের আমন্ত্রণ জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী শুক্রবার নবান্নে তিনি বিশ্বকর্মাপুজোয় পুষ্পাঞ্জলি দেবেন। বামপন্থীরা চাইলে সেদিন সেখানে এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দিতে পারেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রয়েছে বলে মনে করছে বিরোধী শিবির। কারণ, বামপন্থীরা ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার বিষয়টি সামনে রাখে। সেই অবস্থানকে কটাক্ষ করেই শুভেন্দু তাঁদের পুজোয় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মত।
তবে এই আমন্ত্রণ বাস্তবে কেউ গ্রহণ করবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বামেদের তরফে এই বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও জানা যায়নি। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণ আপাতত রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই রয়ে গিয়েছে।
## নবান্নে বিশ্বকর্মাপুজোর প্রস্তুতি
মহাকরণ থেকে নবান্নে রাজ্য সচিবালয় স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকেই সেখানে প্রতি বছর বিশ্বকর্মাপুজোর আয়োজন করা হয়। পূর্ত দফতরের উদ্যোগে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি দফতর, কারখানা, যন্ত্রপাতি, যানবাহন এবং নির্মাণকাজের সঙ্গে বিশ্বকর্মাপুজোর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।
এ বছরও নবান্নে পুজোর আয়োজন করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজে সেখানে উপস্থিত থেকে অঞ্জলি দেবেন বলে জানিয়েছেন। সেই কারণে সরকারি মহলে পুজোর প্রস্তুতি নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে পুজোর আয়োজন কতটা বড় হবে, কারা উপস্থিত থাকবেন এবং কী ধরনের অনুষ্ঠান হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
বিশ্বকর্মাপুজো সাধারণত কারিগর, শিল্পী, ইঞ্জিনিয়ার, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং প্রযুক্তিনির্ভর পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারখানা, গ্যারাজ, ওয়ার্কশপ, দোকান এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতির পুজো করা হয়। নবান্নেও সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করে পুজো হয়।
## ছুটির দিন নিয়ে পরিবর্তন
বিশ্বকর্মাপুজোর ছুটির দিন পরিবর্তন নিয়েও এদিন আলোচনা হয়েছে। আগের ঘোষণায় ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ছুটি থাকার কথা বলা হয়েছিল। পরে অর্থ দফতরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ বছর পুজোর তিথি ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার হওয়ায় সেই দিনই সরকারি ছুটি থাকবে।
ছুটির দিন পরিবর্তনের ফলে সরকারি দফতর, স্কুল, কলেজ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচিতে কিছুটা বদল আসতে পারে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই ছুটির আওতায় থাকবে, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
বিশ্বকর্মাপুজোকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল এবং কারখানা এলাকাতেও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা, পুজোর মণ্ডপ তৈরি এবং কর্মীদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাংলার বহু এলাকায় এই পুজো সামাজিক উৎসবের রূপও নেয়।
## ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে রাজনীতির যোগ
শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে ধর্মীয় উৎসব এবং রাজনৈতিক বক্তব্য একসঙ্গে উঠে আসছে। গণেশপুজো, বিশ্বকর্মাপুজো এবং দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে তিনি বারবার বাঙালি সংস্কৃতি, সনাতন ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রসঙ্গ সামনে আনছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে ধর্মীয় পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক প্রতীক এখন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বিষয় হয়ে উঠেছে। শাসকদল এবং বিরোধী দল—উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান বোঝাতে বিভিন্ন উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ ব্যবহার করছে।
শুভেন্দুর বক্তব্যেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। তিনি একদিকে গণেশপুজোকে বাংলার সামাজিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার কথা বলছেন, অন্যদিকে বামেদের ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য শুধু বাম দলগুলিকে আক্রমণ করা নয়, বৃহত্তর হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়াও হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
## বামেদের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ার সম্ভাবনা
গণেশপুজো, দুর্গাপুজো এবং ধর্মীয় আচার নিয়ে তৃণমূল, বিজেপি এবং বামেদের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। তবে মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকা কোনও নেতা সরাসরি বামেদের পুজোয় অঞ্জলি দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোয় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।
বামেদের বক্তব্য সাধারণত ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণ, সরকারি সম্পদের ব্যবহার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে থাকে। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী ধর্মীয় উৎসবকে সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরছেন। এই দুই ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের সংঘাত থেকেই বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
আগামী দিনে দুর্গাপুজো এবং অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে এই রাজনৈতিক তরজা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে রাজ্যে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইস্যু রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
## একসঙ্গে থাকার বার্তা
সমালোচনা ও রাজনৈতিক কটাক্ষের পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে ঐক্যের কথাও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে আঞ্চলিক বিভাজন থাকা উচিত নয়। বাংলায় গণেশপুজো বা অন্য কোনও ধর্মীয় উৎসব পালনে বাধা থাকা উচিত নয় বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎসব মানুষের মধ্যে বিভাজন নয়, একতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ, এই ধরনের বক্তব্যের আড়ালে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা রয়েছে। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিশ্বকর্মাপুজোয় বামেদের অঞ্জলি দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা উসকে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। গণেশপুজো নিয়ে বামেদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তিনি নবান্নে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ধর্মীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে বাংলার রাজনীতিতে যে বিতর্ক চলছে, তাঁর বক্তব্যে সেটিই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।


