দুর্গাপুজোর পর পশ্চিমবঙ্গে বেসরকারি বাসের ভাড়া বাড়তে পারে। এমনই ইঙ্গিত দিলেন রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং। সোমবার কলকাতায় বেসরকারি বাস মালিক সংগঠনগুলির সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান, বাসভাড়া বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘদিনের। পুজোর আগে এই বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলেও উৎসবের পর ভাড়া সংশোধন নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
তবে শুধু ভাড়া বাড়ালেই হবে না, যাত্রী পরিষেবার মানও উন্নত করতে হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মন্ত্রী। রাস্তায় আরও ভালোভাবে পরিচালিত বাস, পরিচ্ছন্ন পরিষেবা এবং যাত্রীদের সুবিধার দিকে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসি বাস পরিষেবার ক্ষেত্রেও উন্নতি প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ফলে একদিকে বাস মালিকদের দীর্ঘদিনের ভাড়া বৃদ্ধির দাবি গুরুত্ব পাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন ভাড়ার পরিমাণ নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
## বাস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক পরিবহণমন্ত্রীর
সোমবার কলকাতার ময়দানে পরিবহণ দফতরের অস্থায়ী কার্যালয়ে বেসরকারি বাস মালিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন পরিবহণমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পরিবহণ দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরাও।
আলোচনায় অংশ নেয় জয়েন্ট কাউন্সিল অব বাস সিন্ডিকেট, সিটি সাবার্বান সার্ভিস এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল বাস অ্যান্ড মিনিবাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা। বাস মালিকদের তরফে ভাড়া বৃদ্ধি ছাড়াও একাধিক সমস্যা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছিল বাসের ওপর জরিমানা, রোড ট্যাক্সের বকেয়া, জাতীয় সড়কে টোলের চাপ এবং সরকারি কাজে বাস requisition করা হলে ভাড়ার অসামঞ্জস্য।
মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে বাস মালিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। তবে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।
## আট বছর ধরে বদলায়নি নির্ধারিত ভাড়া
বাস মালিকদের দাবি, রাজ্যে নির্ধারিত বাসভাড়া শেষবার সংশোধন করা হয়েছিল ২০১৮ সালে। এরপর ডিজেলের দাম, যন্ত্রাংশের খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাসভাড়া বাড়েনি।
বাস মালিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, ২০১৮ সালের ভাড়ায় ২০২৬ সালে বাস চালানো আর্থিকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁরা মনে করছেন, বর্তমান ভাড়ায় বাস পরিষেবা চালিয়ে যাওয়া ক্রমশ অসম্ভব হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে ভাড়া না বাড়ালে বহু রুটে পরিষেবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
বর্তমানে সরকারের নির্ধারিত ভাড়ায় প্রথম ধাপের বাসভাড়া ৭ টাকা। তবে বেসরকারি বাসে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অনিয়মের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। ভাড়া কাঠামো স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত করার দাবি তুলেছেন বাস মালিকেরা।
## প্রথম ধাপে ২০ টাকা ভাড়ার দাবি
বাস মালিক সংগঠনের প্রতিনিধি পি এন বোস জানিয়েছেন, প্রথম ধাপের বাসভাড়া ২০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া অপরিবর্তিত থাকায় বাস চালানোর খরচ সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালের ভাড়ায় ২০২৬ সালে পরিষেবা বজায় রাখা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছেন তিনি।
তবে বাস মালিকদের চাওয়া ভাড়া এবং সরকারের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য থাকতে পারে। সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্য, যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচ এবং গণপরিবহণের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কথা বিবেচনা করেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে।
বিশেষ করে কলকাতা ও শহরতলির বহু মানুষ প্রতিদিন কর্মস্থল, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল এবং বাজারে যাতায়াতের জন্য বাসের ওপর নির্ভর করেন। ভাড়া বাড়লে তাঁদের মাসিক যাতায়াত খরচও বাড়বে। ফলে ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের আগে যাত্রীস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠতে পারে।
## ভাড়া বাড়লে পরিষেবাও উন্নত করতে হবে
পরিবহণমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভাড়া বাড়ানো হলে বাস মালিকদের যাত্রী পরিষেবার মান উন্নত করতে হবে। রাস্তায় বাসের সংখ্যা, সময় মেনে চলা, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
অনেক যাত্রীর অভিযোগ, বেসরকারি বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলেও পরিষেবা সবসময় সেই অনুযায়ী পাওয়া যায় না। বাসের আসন, জানলা, আলো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। অনেক রুটে বাস নির্দিষ্ট সময়ে আসে না, আবার কোথাও যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয় না।
এই পরিস্থিতিতে ভাড়া বৃদ্ধির সঙ্গে পরিষেবার মান উন্নত করার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভালোভাবে পরিচালিত বাস রাস্তায় নামাতে হবে। এসি বাস পরিষেবার ক্ষেত্রেও উন্নতি প্রয়োজন। অর্থাৎ ভবিষ্যতে ভাড়া সংশোধনের সঙ্গে পরিষেবার মান যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
## টোল ও জরিমানার চাপ নিয়েও আলোচনা
বাস মালিক সংগঠনগুলি জানিয়েছে, শুধু ভাড়া নয়, জাতীয় সড়কের টোল এবং বিভিন্ন জরিমানাও বাস পরিষেবার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বাসের টোলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়ার দাবি উঠেছে।
বাস মালিকদের একাংশের দাবি, মাসিক টোলের পরিমাণ ১,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হোক। তাঁদের বক্তব্য, নিয়মিত টোল দিতে গিয়ে দূরপাল্লার এবং আন্তঃজেলা বাসগুলির পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এছাড়াও রোড ট্যাক্স বকেয়া থাকলে তার ওপর জরিমানা ও সুদ মকুবের দাবি জানিয়েছেন বাস মালিকেরা। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের বকেয়া ট্যাক্সের কারণে বহু বাস মালিক আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন। এই বিষয়গুলি সমাধান করা গেলে বাস পরিষেবা সচল রাখা সহজ হবে বলে তাঁদের মত।
## সরকারি বাস সংস্থাগুলির লোকসান নিয়েও উদ্বেগ
বৈঠকে রাজ্যের সরকারি পরিবহণ সংস্থাগুলির আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও উঠে আসে। পরিবহণমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারি বাস সংস্থাগুলি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, ভাড়া সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আগেই বিবেচনা করা উচিত ছিল।
সরকারি বাস পরিষেবা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এমন বহু রুট রয়েছে যেখানে বেসরকারি বাসের সংখ্যা কম বা পরিষেবা অনিয়মিত। সরকারি বাস সেই ঘাটতি পূরণ করে। ফলে সরকারি পরিবহণ সংস্থাগুলির আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি।
তবে সরকারি ও বেসরকারি—দুই ধরনের বাসের ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে যাত্রীদের ওপর প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। ভাড়া বৃদ্ধি হলে গণপরিবহণের ব্যবহার কমে ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাইকের ব্যবহার বাড়তে পারে। এর ফলে শহরের যানজট ও দূষণও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
## পুজোর আগে নয়, সিদ্ধান্ত হতে পারে পরে
পরিবহণমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দুর্গাপুজোর আগে বাসভাড়া বাড়ানোর কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। পুজোর মরশুমে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের চাপ অত্যন্ত বেশি থাকে। এই সময়ে ভাড়া বাড়ালে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই উৎসবের পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুজোর পর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে কত টাকা ভাড়া বাড়বে, সব রুটে একই হারে ভাড়া সংশোধন হবে কি না, কিংবা দূরত্ব অনুযায়ী নতুন ভাড়া কাঠামো তৈরি হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ঘোষণা হয়নি।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে বাসভাড়া বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হলেও এখনই নতুন ভাড়া কার্যকর হচ্ছে না। পুজোর পর সরকারি সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন বাস মালিক, কর্মী এবং সাধারণ যাত্রীরা। ভাড়া বাড়লে তার সঙ্গে পরিষেবার উন্নতি কতটা বাস্তবে হয়, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


