নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে বাংলার রাজনীতিতে ফের জটিলতা তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর, নন্দীগ্রাম আসনে কংগ্রেসকে প্রার্থী না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বিষয়ে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপালের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে কংগ্রেসের তরফে এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের এই প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়ার কোনও স্পষ্ট বার্তা মেলেনি।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে। একদিকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীসংঘাত, অন্যদিকে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা—সব মিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির নন্দীগ্রামে নিজেদের প্রার্থী জেতাতে বিরোধী ভোট ভাগ আটকাতে চাইছে। সেই কারণেই কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
## নন্দীগ্রামে কেন এত গুরুত্ব?
পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই আসন থেকেই বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী। পরবর্তী সময়ে নন্দীগ্রাম রাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরও নন্দীগ্রামের গুরুত্ব কমেনি। শুভেন্দু অধিকারী একাধিক আসন থেকে জয়ী হওয়ার পর নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম-সহ রাজ্যের দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হওয়ার কথা। ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর।
এই উপনির্বাচন তৃণমূলের কাছে যেমন মর্যাদার লড়াই, তেমনই বিজেপি, কংগ্রেস এবং বামেদের কাছেও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার সুযোগ। ফলে প্রত্যেকটি দলের প্রার্থী নির্বাচন এবং জোট-সমীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## কংগ্রেসকে কেন আসন ছাড়ার অনুরোধ?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নন্দীগ্রামে একাধিক বিরোধী প্রার্থী থাকলে ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তৃণমূলের প্রধান লক্ষ্য হল, বিরোধী ভোটের বিভাজন রোধ করে নিজেদের প্রার্থীকে জয়ী করা। সেই কারণেই কংগ্রেসকে নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী না দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে খবর।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কে সি ভেনুগোপালের কথোপকথনে নন্দীগ্রাম আসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে কংগ্রেসকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানানো হলেও কংগ্রেস এখনও সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে এই বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে কংগ্রেসের কাছে বিষয়টি সহজ নয়। একদিকে বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে নিজেদের রাজনৈতিক জায়গা ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে নির্বাচনী লড়াইয়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখার প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে দলটিকে। ফলে নন্দীগ্রামে প্রার্থী দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।
## তৃণমূলের অন্দরে গোষ্ঠীসংঘাত
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। দলের নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে বিরোধ চলছে।
মমতা-সমর্থিত গোষ্ঠী নন্দীগ্রাম থেকে সঞ্চিতা প্রধান দে-কে প্রার্থী করেছে বলে খবর। অন্যদিকে, বিদ্রোহী গোষ্ঠী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি তিনি প্রার্থী হলে বিদ্রোহী শিবির লড়াই থেকে সরে দাঁড়াতে পারে বলেও বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্যকে কেউ রাজনৈতিক কৌশল, আবার কেউ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বার্তা হিসেবে দেখছেন।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবি, তারা বিজেপির ‘বি-টিম’ নয়। বরং বিরোধী ভোট ভাগ না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এমন অবস্থান নেওয়া হয়েছে। যদিও তৃণমূলের মূল শিবির এই দাবিকে কীভাবে দেখছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত।
## নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ
তৃণমূলের নাম ও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে দুই গোষ্ঠীর বিরোধের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনেছে। কমিশনের তরফে অতিরিক্ত নথি জমা দিতে বলা হয়েছে বলে খবর। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় ঘনিয়ে আসায় প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যদি কমিশনের সিদ্ধান্ত মনঃপূত না হয়, তাহলে বিদ্রোহী গোষ্ঠী নির্দল প্রার্থী দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। এর ফলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব পড়তে পারে। দলীয় প্রতীক নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
## কংগ্রেসের অবস্থান নিয়ে জল্পনা
নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী দেবে কি না, তা এখন অন্যতম বড় প্রশ্ন। কংগ্রেস যদি প্রার্থী দেয়, তাহলে তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হবে। আবার কংগ্রেস প্রার্থী না দিলে তৃণমূলের সঙ্গে কোনও ধরনের নির্বাচনী সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিক জোট বা আসন সমঝোতার ঘোষণা হয়নি।
কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্ব অতীতে তৃণমূলের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা জানিয়েছে। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধের পরেও দলটি নন্দীগ্রামে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার বিরোধী ভোট ভাগের বিষয়টি বিবেচনা করে শেষ মুহূর্তে কৌশল বদলানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
## শেষ মুহূর্তে বদলাতে পারে সমীকরণ
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে একাধিক রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রার্থী, বিজেপির প্রস্তুতি এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়ে এই কেন্দ্রের লড়াই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভেনুগোপালকে ফোন করে নন্দীগ্রাম আসন ছাড়ার অনুরোধ সেই জটিলতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা স্পষ্ট হলেই নন্দীগ্রামের নির্বাচনী ছবি আরও পরিষ্কার হবে। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট, দুর্গাপুজোর আগে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।


