রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং ডিজেল উৎপাদন পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছে আবেদন জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার আয়ারল্যান্ড সফরের সময় ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোয় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে এবং বাড়ছে জ্বালানির দাম।
ট্রাম্পের বক্তব্য, ইউক্রেন চাইলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অন্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে। কিন্তু ডিজেল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আঘাত করা উচিত নয়। তাঁর দাবি, এই ধরনের হামলা শুধু রাশিয়ার উপর প্রভাব ফেলছে না, বরং গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের উপরও চাপ বাড়াচ্ছে।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। বিভিন্ন দেশেই ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
## ট্রাম্পের বক্তব্যে বিশ্বজ্বালানি বাজারের প্রসঙ্গ
আয়ারল্যান্ডে একটি গল্ফ প্রতিযোগিতা চলাকালীন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইউক্রেনের সামরিক কৌশল নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জেলেনস্কিকে রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে হামলা বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এই হামলার ফলে ডিজেলের ঘাটতি আরও বাড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিকে লক্ষ্য করে ইউক্রেন যে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তার ফলে রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায়। বিশেষ করে ডিজেল পরিবহণ, কৃষি, শিল্প এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর দাম বাড়লে একাধিক ক্ষেত্রে খরচ বেড়ে যায়।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয়ও রয়েছে। আমেরিকায় ডিজেলের দাম সম্প্রতি প্রতি গ্যালন ছয় ডলারের উপরে উঠে গিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করা মার্কিন প্রশাসনের কাছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## রাশিয়ার তেল শিল্পকে লক্ষ্য করছে ইউক্রেন
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই জ্বালানি পরিকাঠামো দুই পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। রাশিয়া যেমন ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে বলে কিয়েভের অভিযোগ, তেমনই ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি ডিপো এবং সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।
ইউক্রেনের যুক্তি, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস শিল্প থেকে পাওয়া অর্থ যুদ্ধ চালানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোয় আঘাত করলে মস্কোর যুদ্ধক্ষমতা ও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করা সম্ভব। এই কারণেই গত কয়েক মাসে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন।
সাম্প্রতিক হামলাগুলির মধ্যে তাতারস্তান অঞ্চলের নিজনেকামস্ক শহরের একটি তেল শোধনাগারও রয়েছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষ অভিযান চালিয়ে ওই পরিকাঠামোয় হামলা করা হয়েছিল। স্থানীয় রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত এবং আহত হয়েছেন। তবে এই সমস্ত দাবি ও পালটা দাবির স্বাধীন যাচাই সবসময় সম্ভব হয়নি।
## ডিজেল সরবরাহে চাপ, রাশিয়ার রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা
রাশিয়ার জ্বালানি শিল্পে হামলার পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারেও ডিজেল সরবরাহ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি উৎপাদন ও পরিশোধন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাশিয়াকে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বজায় রাখতে একাধিক পদক্ষেপ করতে হয়েছে।
জুলাই মাসে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলে জানা গিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়া থেকে আসা ডিজেলের সরবরাহ কমে যায়। বিশ্ববাজারে রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ হওয়ায় এই রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রভাব অন্যান্য দেশেও পড়েছে।
তবে শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত নয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, তেল পরিবহণে বাধা, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা সমস্যা এবং বিভিন্ন তেল স্থাপনায় হামলাও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহকে প্রভাবিত করছে। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির জন্য একমাত্র ইউক্রেনের হামলাকেই দায়ী করা যায় কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
## ইউক্রেনের অবস্থান কী?
ইউক্রেন এখনও রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলাকে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। কিয়েভের বক্তব্য, রাশিয়া নিয়মিত ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে আঘাত করা ইউক্রেনের কাছে প্রয়োজনীয়।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার তেল শিল্প থেকে পাওয়া রাজস্ব যুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য করে। তাই তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা চালিয়ে রাশিয়ার সামরিক ক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিয়েভের মতে, রাশিয়ার সামরিক পরিকাঠামো এবং জ্বালানি শিল্পের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, ট্রাম্পের অনুরোধ মেনে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করবে কি না, তা সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কারণ, একদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের চাপ, অন্যদিকে নিজেদের নিরাপত্তা ও যুদ্ধকৌশল—দুই বিষয়কেই বিবেচনা করতে হবে জেলেনস্কি প্রশাসনকে।
## যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে নতুন চাপ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আমেরিকার পক্ষ থেকে একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন বিশেষ দূতদের মস্কো ও কিয়েভ সফর, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা—সব মিলিয়ে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার আবেদনকে শুধু অর্থনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখছেন না অনেকে। এর মধ্যে যুদ্ধের তীব্রতা কমানোর কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন যদি একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় হামলা কমায়, তাহলে আলোচনার পরিবেশ কিছুটা তৈরি হতে পারে।
তবে বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে হামলা বন্ধ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই নিজেদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। ফলে একতরফাভাবে কোনও পক্ষ হামলা বন্ধ করলে কৌশলগতভাবে তারা পিছিয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
## আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়িচালক বা পরিবহণ সংস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কৃষি, নির্মাণ, পণ্যবাহী ট্রাক, জাহাজ চলাচল এবং শিল্প উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়। সেই কারণে ডিজেলের সরবরাহে সামান্য ঘাটতিও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে জ্বালানি বাজারে একাধিক সংঘাতের প্রভাব একসঙ্গে পড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, তেল পরিবহণের নিরাপত্তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, উৎপাদন পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর।
ট্রাম্পের আবেদন তাই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা কমাবে কি না, রাশিয়া পালটা হামলা বন্ধ করবে কি না এবং শান্তি আলোচনায় কোনও অগ্রগতি হবে কি না—এখন সেদিকেই নজর বিশ্বের।


