মালদহের ভূতনি দ্বীপে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গঙ্গা ও ফুলহর নদীর জল বাড়তে থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন। বহু গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও বাড়ির একতলা জলের তলায়, কোথাও আবার গোটা বাড়ি ঘিরে রয়েছে স্রোত। প্রাণ বাঁচাতে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন। নিরাপদ জায়গার অভাবে অনেক পরিবার দিনের পর দিন ছাদেই কাটাচ্ছেন।
ভূতনি মূলত মালদহের মানিকচক ব্লকের অন্তর্গত একটি নদীবেষ্টিত এলাকা। গঙ্গা ও ফুলহর নদীর জলস্তর বাড়লে এই দ্বীপাঞ্চলে দ্রুত বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। চলতি বন্যায় সেই চেনা দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্রাণ ও চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছনোর সমস্যা দেখা দিয়েছে। বহু মানুষ খাবার, পানীয় জল, ওষুধ এবং শুকনো আশ্রয়ের অভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
## ছাদেই আশ্রয় বানভাসি পরিবারের
বন্যার জল বাড়তে থাকায় বহু পরিবার ঘর ছেড়ে উঁচু জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অনেক এলাকায় নৌকা ছাড়া যাতায়াতের উপায় নেই। ফলে সবাই নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছতে পারেননি। বাড়ির ছাদ, উঁচু বারান্দা কিংবা বাঁধের উপরেই আশ্রয় নিতে হয়েছে তাঁদের।
একাধিক এলাকায় দেখা গিয়েছে, বাড়ির চারদিকে জল থইথই করছে। নিচের ঘরে থাকা আসবাব, চাল-ডাল, পোশাক এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী জলের তলায় চলে গিয়েছে। কোনওরকমে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে পরিবারের সদস্যরা ছাদে উঠে পড়েছেন। ছোট শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ মানুষদের নিয়ে এই অবস্থায় থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, ছাদে আশ্রয় নিলেও সেখানে পর্যাপ্ত খাবার বা পানীয় জল নেই। রান্না করার সুযোগও নেই। অনেক পরিবার শুকনো খাবার কিংবা ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছেন। জলবন্দি এলাকায় শৌচাগার ব্যবহারের সমস্যাও তৈরি হয়েছে। দূষিত জল ব্যবহারের কারণে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ছে।
## গঙ্গার জল বিপদসীমার উপরে
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, মানিকচক ঘাটে গঙ্গার জলস্তর বিপদসীমার উপরে উঠে গিয়েছিল। জলস্তর আরও বাড়তে থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর পাশাপাশি ফুলহর নদীর জলও বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। ফলে ভূতনির পাশাপাশি মালদহের আরও কয়েকটি ব্লকে বন্যার প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগেও ভূতনি এলাকায় গঙ্গার ভাঙন ও বন্যা বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। নদীভাঙনে বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। চলতি পরিস্থিতিতে বন্যার জলের সঙ্গে ভাঙনের আতঙ্কও যুক্ত হয়েছে। নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের অনেকেই বাড়িঘর, চাষের জমি এবং গবাদি পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
## চাষের জমি জলের তলায়
বন্যায় শুধু বসতবাড়ি নয়, ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে কৃষিক্ষেত্রেও। ধান, পাট এবং অন্যান্য ফসল জলের তলায় চলে গিয়েছে। অনেক কৃষক সদ্য কাটা ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বন্যার জল নেমে গেলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ শেষ হবে না।
গবাদি পশু বাঁচানোও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়ির উঠোন বা গোয়ালঘর ডুবে যাওয়ায় গরু, ছাগল ও অন্যান্য পশুকে উঁচু জায়গায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নৌকা না থাকায় পশু সরানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশুর জন্যও খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
## উদ্ধার ও ত্রাণে নৌকার উপর নির্ভরতা
বন্যাকবলিত এলাকায় প্রশাসনের তরফে নৌকা নামানো হয়েছে। উদ্ধারকাজ এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নৌকাই এখন প্রধান ভরসা। কোথাও কোথাও প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলের কর্মীরা জলবন্দি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে বহু প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ, শুকনো খাবার, পানীয় জল এবং চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বন্যা পরিস্থিতিতে মোবাইল মেডিক্যাল টিম এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নৌকায় করে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। সাপের কামড়, জ্বর, ডায়রিয়া এবং জলবাহিত রোগের আশঙ্কায় স্বাস্থ্য দপ্তরকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণের পরিমাণ কম। অনেক পরিবার এখনও পর্যাপ্ত খাবার ও পানীয় জল পাননি। কোথাও ত্রিপল পৌঁছলেও শুকনো খাবার পৌঁছয়নি। কোথাও আবার মানুষ আশ্রয় পেলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ফলে দ্রুত ত্রাণ বণ্টন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
## দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি
ভূতনির বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষার সময় একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। নদীভাঙন রোধ, বাঁধ মেরামতি এবং জলনিকাশির স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে এই দুর্ভোগ বন্ধ হবে না।
বাসিন্দাদের দাবি, শুধু বন্যার সময় ত্রাণ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দুর্বল বাঁধ চিহ্নিত করে দ্রুত মেরামত করতে হবে। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বন্যার সময় দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নৌকা, চিকিৎসা দল এবং ত্রাণ মজুত রাখা প্রয়োজন।
এই মুহূর্তে ভূতনির বানভাসি মানুষের প্রধান দাবি—নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ এবং দ্রুত উদ্ধার। বন্যার জল যতদিন না নামছে, ততদিন ছাদে, বাঁধে কিংবা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়া মানুষের দুর্ভোগ চলতেই থাকবে। প্রশাসনের দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপই পারে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।


