তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে সংঘাত এবার পৌঁছে গেল নির্বাচন কমিশনের দরজায়। দলের জোড়াফুল প্রতীকের মালিকানা কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে টানাপোড়েন তুঙ্গে। শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, দিল্লিতে দুই শিবিরের সঙ্গে পৃথকভাবে শুনানি করল নির্বাচন কমিশন। প্রতীক, দলের নাম এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের দাবিদাওয়া খতিয়ে দেখছে কমিশন। এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে তৃণমূলের প্রতীক-জট কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
### জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে দুই শিবিরের দাবি
তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত থেকে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির নিজেদের দলীয় পরিচয় ও প্রতীকের দাবিতে অনড়। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীও তৃণমূলের নাম ও প্রতীকের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করেছে।
দুই পক্ষই নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের বক্তব্য এবং নথি জমা দিয়েছে। কমিশনের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, কোন গোষ্ঠী দলের সাংগঠনিক ও আইনসঙ্গত নিয়ন্ত্রণের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রতীকের মালিকানা নয়, আগামী নির্বাচনে দলের রাজনৈতিক পরিচয়ের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
### দিল্লিতে কমিশনের শুনানি
শনিবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দুই শিবিরের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। প্রথমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা কমিশনের সামনে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুনানি হয়।
মমতা শিবিরের প্রতিনিধি দলে ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক নেতা ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরও নিজেদের দাবির সমর্থনে নথিপত্র পেশ করেছে। কমিশন দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথি খতিয়ে দেখছে।
এই শুনানির মাধ্যমে তৃণমূলের দলীয় নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা বিরোধের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। তবে শুনানি শেষ হলেও কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও জানা যায়নি।
### অতিরিক্ত নথি চাইল কমিশন
শুনানির পর ঋতব্রত শিবিরের কাছে অতিরিক্ত নথি চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবির সমর্থনে আরও তথ্য ও প্রমাণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে খবর।
কমিশনের এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট, প্রতীক সংক্রান্ত বিরোধে কোনও পক্ষের দাবিই সরাসরি মেনে নেওয়া হয়নি। সাংগঠনিক সমর্থন, দলের প্রতিনিধিত্ব এবং অন্যান্য নথি যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে কমিশন। ঋতব্রত শিবিরের তরফে জানানো হয়েছে, কমিশনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিও জমা দেওয়া হয়েছে।
তবে অতিরিক্ত নথি চাওয়ার অর্থ এই নয় যে কোনও একটি শিবিরকে প্রতীক দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। কমিশনের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত বিষয়টি অনিশ্চিতই রয়েছে।
### দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে মূল বিরোধ
এই সংঘাত শুধুমাত্র জোড়াফুল প্রতীককে ঘিরে নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় নাম এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। দলের ফান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঋতব্রত শিবিরের অভিযোগ, তৃণমূলের মতো একটি রাজনৈতিক দল এক ব্যক্তির ইচ্ছায় পরিচালিত হতে পারে না। দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব থাকা উচিত বলে দাবি করেছে তারা। অন্যদিকে মমতা শিবির নিজেদের দলীয় পরিচয় এবং নেতৃত্বের বৈধতার উপর আস্থা রেখেছে।
এই বিরোধের ফলে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দলের নাম ও প্রতীক যদি কোনও একটি শিবিরের হাতে যায়, তাহলে অন্য পক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় কী হবে, তা নিয়েও জল্পনা রয়েছে।
### নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে বাড়ছে গুরুত্ব
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে প্রতীক নিয়ে এই বিরোধের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। নির্বাচনে প্রতীক একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই কোন শিবির তৃণমূলের জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে, তা ভোটের প্রস্তুতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
বিশেষ করে নন্দীগ্রামকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আগে থেকেই রয়েছে। এই কেন্দ্রে প্রার্থী বাছাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভাব্য লড়াই এবং দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রতীক-জটের দ্রুত সমাধান হলে নির্বাচনী প্রস্তুতি স্পষ্ট হতে পারে।
তবে কমিশন কবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে, তা এখনও নির্দিষ্ট নয়। উপনির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়সীমার আগে এই বিরোধের নিষ্পত্তি হবে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ রয়েছে।
### ঋতব্রত শিবিরের অবস্থান
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী নিজেদের দাবির পক্ষে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক যুক্তি তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য, দলের নাম ও প্রতীকের অধিকার নির্ধারণে শুধুমাত্র একজন নেতার সিদ্ধান্ত নয়, বৃহত্তর সাংগঠনিক সমর্থন এবং নিয়মকানুনের গুরুত্ব থাকা উচিত।
এই শিবিরের তরফে কমিশনের কাছে নথি জমা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত নথি চাওয়ার পরও তারা নিজেদের দাবি থেকে সরে আসেনি। বরং কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দলের ঐতিহ্যবাহী পরিচয় ও প্রতীক রক্ষার বিষয়ে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
### মমতা লড়লে সমর্থনের বার্তা ঋতব্রত শিবিরের
প্রতীক নিয়ে বিরোধ থাকলেও নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনকে ঘিরে ঋতব্রত শিবিরের অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে নন্দীগ্রাম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তাঁকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একদিকে দলের নাম ও প্রতীক নিয়ে কমিশনে লড়াই চলছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচনী লড়াইয়ে মমতাকে সমর্থনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতীক-বিরোধ এবং নির্বাচনী সমীকরণের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
তবে এই সমর্থনের ঘোষণা দলীয় প্রতীক সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান করেছে, এমন নয়। কমিশনের সিদ্ধান্তের উপরই এখনও নির্ভর করছে জোড়াফুল প্রতীকের ভবিষ্যৎ।
### কী হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপ?
নির্বাচন কমিশন দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথি খতিয়ে দেখার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। অতিরিক্ত নথি জমা দেওয়ার পর শুনানি আরও এগোতে পারে। দলের নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়ই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
কমিশনের সিদ্ধান্তের আগে কোনও পক্ষকেই চূড়ান্ত বিজয়ী বলা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক মহলের নজর এখন কমিশনের পরবর্তী নির্দেশ এবং দুই শিবিরের প্রতিক্রিয়ার দিকে।
### শেষ কথা
তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে বিরোধ এখন বাংলার রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী নিজেদের দাবি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হয়েছে। শুনানি হয়েছে, অতিরিক্ত নথিও চাওয়া হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে প্রতীক-জট মিটবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা অব্যাহত। কমিশনের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে তৃণমূলের দলীয় নাম ও ঐতিহ্যবাহী জোড়াফুল প্রতীকের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোয়।


