রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে একাধিক সরকারি অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছে তাঁকে। পরনে সেনার পোশাক, চোখেমুখে আত্মবিশ্বাস এবং দায়িত্ব পালনের দৃঢ়তা—সেই ছবি ও ভিডিয়ো থেকেই সাধারণ মানুষের নজরে আসেন মেজর ঋষভ সিং সাম্ব্যল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ন্যাশনাল ক্রাশ’। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এবার যে তথ্য সামনে এসেছে, তা অনেকেরই নজর কেড়েছে। কেন এখনও বিয়ে করেননি ঋষভ? রাষ্ট্রপতির প্রাক্তন ADC নিজেই জানিয়েছেন সেই কারণ।
একটি পডকাস্টে নিজের সেনাজীবন, রাষ্ট্রপতির ADC হিসেবে দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ নিয়ে মুখ খুলেছেন মেজর ঋষভ সিং সাম্ব্যল। তাঁর কথায়, রাষ্ট্রপতির ADC পদে কাজ করার সময় স্বাভাবিক ব্যক্তিগত জীবনযাপন করা অত্যন্ত কঠিন। এমনকী, সেই দায়িত্ব পালনকালে বিয়েও করা যায় না বলে জানিয়েছেন তিনি। ফলে দীর্ঘ সময় অবিবাহিত থাকতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেই এখন নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
### রাষ্ট্রপতির ADC পদে থাকলে বিয়ে করা যায় না?
মেজর ঋষভ সাম্ব্যলের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির ADC হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বিয়ের অনুমতি থাকে না। এই দায়িত্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কঠোর নিয়ম, শৃঙ্খলা এবং সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকার প্রয়োজনীয়তা। ফলে সাধারণ মানুষের মতো ব্যক্তিগত জীবন কাটানো সম্ভব হয় না।
ঋষভ জানিয়েছেন, তিনি এখনও অবিবাহিত। রাষ্ট্রপতির ADC পদে থাকাকালীন বিয়ে করতে পারেননি। তাঁর মতে, সেনাজীবনে এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ত্যাগগুলির মধ্যে একটি। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ যেমন সম্মানের, তেমনই সেই দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছু ছেড়ে দিতে হয়।
তবে এই বক্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা উচিত। ADC পদে বিয়ে সংক্রান্ত নিয়মের বিস্তারিত সরকারি বিধি বা সব পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট নীতিমালা এই প্রতিবেদনে আলাদাভাবে যাচাই করা হয়নি।
### সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারেননি
রাষ্ট্রপতির ADC পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির সরকারি কর্মসূচি, সফর, বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং প্রোটোকল সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে ADC-র ভূমিকা থাকে। ফলে কাজের সময়সূচি এবং দায়িত্বের ধরন সাধারণ চাকরির তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হতে পারে।
ঋষভ সাম্ব্যল জানিয়েছেন, এই পদে থাকাকালীন তিনি সাধারণ মানুষের মতো বাইরে বেরোতে পারতেন না। ব্যক্তিগত সময় কাটানো বা নিজের মতো করে জীবনযাপন করার সুযোগও ছিল সীমিত। দায়িত্ব পালনের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হত তাঁকে।
তাঁর কথায়, ADC হিসেবে কাজ করার সময় ব্যক্তিগত জীবনের অনেকটাই পিছনে চলে যায়। পরিবার থেকে দূরে থাকা, নিজের জন্য সময় না পাওয়া এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া—সব মিলিয়ে এই দায়িত্ব ছিল কঠিন। আর সেই কারণেই বিয়ের মতো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও পিছিয়ে যায়।
### একাকিত্বও ছিল জীবনের অংশ
ঋষভ সাম্ব্যল শুধু বিয়ে না করার কথাই বলেননি, ADC হিসেবে কাজ করার সময় একাকিত্বের কথাও তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদে থাকলে সবসময় মানুষের ভিড়ে থাকা সত্ত্বেও নিজের জন্য আলাদা সময় পাওয়া কঠিন।
একজন ADC-কে দায়িত্ব পালনের সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দায়িত্ব পালন—সব ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা ও মনোযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক জীবন এবং নিজের পছন্দের কাজের জন্য সময় বের করা সহজ নয়।
ঋষভের মতে, কখনও কখনও একা থাকার সময়টুকুই নিজের জীবন নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দেয়। নিজের ভালো-মন্দ, ভবিষ্যৎ এবং জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে চিন্তা করার জন্য সেই সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
### ADC হওয়ার পরিকল্পনা ছিল না ঋষভের
মেজর ঋষভ সিং সাম্ব্যল জানিয়েছেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সময় তিনি কখনও ভাবেননি যে রাষ্ট্রপতির ADC হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এমনকী, এই পদ সম্পর্কে তাঁর খুব বেশি ধারণাও ছিল না।
তাঁর কথায়, যখন ADC হওয়ার জন্য তাঁর নাম বিবেচনা করা হয়, তখন তিনি সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ যুদ্ধাভ্যাসে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর কমান্ডিং অফিসার বা CO এই দায়িত্বের বিষয়ে তাঁকে জানান। শুরুতে এই পদে যাওয়ার বিষয়ে তিনি খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না।
তবে পরে ঊর্ধ্বতন কর্তাদের পরামর্শ এবং দায়িত্বটির গুরুত্ব বুঝে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। রাষ্ট্রপতির ADC হিসেবে কাজ করার সুযোগ তাঁর সেনাজীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
### ১২ বছরের সেনাজীবনে নানা দায়িত্ব
রাষ্ট্রপতির প্রাক্তন ADC মেজর ঋষভ সিং সাম্ব্যল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রায় ১২ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সামরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব ছিল। তিনি ৪ প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের সঙ্গেও কাজ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২১ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে জাট রেজিমেন্টের কন্টিনজেন্টের নেতৃত্ব দেন তিনি। সেই কন্টিনজেন্ট সেরা মার্চিং কন্টিনজেন্টের পুরস্কারও পেয়েছিল বলে জানা যায়। ফলে রাষ্ট্রপতির ADC হওয়ার আগেই সেনাজীবনে নিজের দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন ঋষভ।
তবে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ADC হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরই সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতির ছবি ও ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।
### রাষ্ট্রপতি মুর্মুর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক
ঋষভ সাম্ব্যল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মুর্মুর কাছ থেকে তিনি স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছেন। তাঁর কাছে রাষ্ট্রপতি ছিলেন অনেকটা মায়ের মতো।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাজ করার সময় শুধু পেশাগত দায়িত্বই নয়, ব্যক্তিগত অনুভূতিও তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকার সময়ে রাষ্ট্রপতির স্নেহ তাঁকে মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছে।
তবে এই সম্পর্ক সম্পূর্ণ পেশাগত দায়িত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বলেই তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ADC হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
### কেন সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিলেন?
সম্প্রতি মেজর ঋষভ সিং সাম্ব্যল সেনাবাহিনী থেকে আগাম অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর অবসর নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা আলোচনা হয়েছে। অনেকেই মনে করেছিলেন, হয়তো বিয়ে করার জন্যই তিনি সেনাবাহিনী ছেড়েছেন।
তবে ঋষভ নিজেই জানিয়েছেন, তাঁর অবসর নেওয়ার মূল কারণ বিয়ে নয়। পরিবারের দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়েই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনীতে কাজ করার পর পরিবারের পাশে থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেছেন তিনি।
ঋষভের বক্তব্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী তাঁর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পরিবার ও ব্যক্তিগত দায়িত্বের কথাও ভাবতে হয়েছে। তাই অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। অনেক ভেবেচিন্তেই তিনি এই পদক্ষেপ করেছেন।
### সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব নিয়েও মুখ খুলেছেন
রাষ্ট্রপতির প্রাক্তন ADC হওয়ার পর ঋষভ সাম্ব্যলকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা গুজব ছড়ায়। কেউ তাঁকে বিবাহিত বলে দাবি করেন, আবার কেউ তাঁর একাধিক বিয়ে হয়েছে বলেও প্রচার করেন। এমনকী, ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও নানা ভিত্তিহীন মন্তব্য দেখা যায়।
এই ধরনের গুজব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঋষভ। তাঁর বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ভুল তথ্য শুধু তাঁকে নয়, তাঁর পরিবারকেও সমস্যায় ফেলে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের কাছে এই ধরনের খবর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একটি ভুল ছবি বা পোস্ট দেখে তাঁর মায়ের চিন্তিত হয়ে পড়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভিত্তিহীন গুজব ছড়ানো বন্ধ হওয়া উচিত বলেই মনে করেন মেজর ঋষভ।
### তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণা
মেজর ঋষভ সিং সাম্ব্যলের জীবনকাহিনি তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। রাষ্ট্রপতির ADC হিসেবে কাজ করার সুযোগও তাঁর পেশাগত জীবনের বড় সম্মান।
তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দেশের সেবা করতে গেলে অনেক সময় ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও আরামকে পিছনে রাখতে হয়। পরিবার থেকে দূরে থাকা, নিজের জন্য সময় না পাওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ হারানো—সবই দায়িত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে একইসঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে গেলে পরিবার ও ব্যক্তিগত দায়িত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত তারই উদাহরণ।
### শেষ কথা
মেজর ঋষভ সিং সাম্ব্যলের বিয়ে না করার কারণ নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার মূল বক্তব্য হল—রাষ্ট্রপতির ADC হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তিগত জীবনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে যায়। বিয়ে না করার সিদ্ধান্তকে তিনি নিজের সেনাজীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগগুলির একটি হিসেবে দেখেছেন।
রাষ্ট্রপতির প্রাক্তন ADC হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা, সেনাজীবনের সাফল্য এবং পরিবারের জন্য অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁকে আরও একবার আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। তবে ভবিষ্যতে তিনি কবে বিয়ে করবেন বা ব্যক্তিগত জীবনে কী সিদ্ধান্ত নেবেন, তা সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব বিষয়। আপাতত দেশের সেবায় কাটানো তাঁর দীর্ঘ সময় এবং সেই জীবনের ত্যাগই মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় বার্তা হয়ে উঠেছে।


