ইস্টবেঙ্গলকে ঘিরে ফের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। প্রাক্তন কোচ অস্কার ব্রুজোঁ এবং তাঁর দুই সহকারী কোচ বকেয়া পারিশ্রমিকের অভিযোগে FIFA-র দ্বারস্থ হয়েছেন বলে খবর। ক্লাবে দায়িত্ব পালন করার পর তাঁদের প্রাপ্য অর্থ এখনও মেটানো হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ামক সংস্থার কাছে নালিশ জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এবার আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়েও চাপ বাড়তে পারে লাল-হলুদ শিবিরে।
অস্কার ব্রুজোঁর সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের সম্পর্ক অবশ্য নতুন করে আলোচনায় এল এই প্রথম নয়। তাঁর কোচিংয়েই ক্লাব ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছিল। কিন্তু দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকেই তাঁকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে অস্কারের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গল ম্যানেজমেন্টের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তার মধ্যেই FIFA-তে বকেয়া পারিশ্রমিক সংক্রান্ত অভিযোগের খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
### অস্কার ও দুই সহকারীর অভিযোগ কী?
প্রাথমিকভাবে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে অস্কার ব্রুজোঁ এবং তাঁর দুই সহকারী কোচ ইস্টবেঙ্গলে কাজ করার সময়কার বকেয়া অর্থের দাবিতে FIFA-র কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, চুক্তি অনুযায়ী যে পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা ছিল, তার একটি অংশ এখনও মেটানো হয়নি।
ফুটবলে কোনও ক্লাব ও কোচ বা খেলোয়াড়ের মধ্যে চুক্তিগত আর্থিক বিরোধ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ FIFA-র নির্দিষ্ট আইনি ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে পারে। এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত, বকেয়া অর্থের হিসাব, পেমেন্টের নথি এবং দুই পক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখা হয়।
তবে এই মুহূর্তে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট আর্থিক অঙ্ক কত, কোন সময়ের পারিশ্রমিক বাকি রয়েছে এবং দুই সহকারী কোচের নাম কী—সেই সমস্ত তথ্য সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। তাই বকেয়া অর্থের পরিমাণ নিয়ে নিশ্চিত দাবি করা ঠিক হবে না।
### FIFA-তে অভিযোগ মানেই কি শাস্তি?
কোনও ক্লাবের বিরুদ্ধে FIFA-তে অভিযোগ দায়ের হলেই সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি ঘোষণা হয় না। প্রথমে অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা, চুক্তির বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হয়। এরপর ক্লাবকে নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
যদি তদন্তে দেখা যায় যে ক্লাব চুক্তি অনুযায়ী পারিশ্রমিক পরিশোধ করেনি, তাহলে বকেয়া অর্থ মেটানোর নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি ও অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী জরিমানা, নিষেধাজ্ঞা বা দলবদল সংক্রান্ত বিধিনিষেধের মতো পদক্ষেপের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে অস্কার ও তাঁর দুই সহকারীর অভিযোগের ক্ষেত্রে FIFA এখনও কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
অর্থাৎ অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলেই ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে কোনও চূড়ান্ত শাস্তি হয়ে গিয়েছে—এমনটা বলা যাবে না। বিষয়টি এখন অভিযোগ, নথি যাচাই এবং সম্ভাব্য শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
### অস্কারের ইস্টবেঙ্গল অধ্যায়
অস্কার ব্রুজোঁ ইস্টবেঙ্গলের কোচ থাকাকালীন দলকে ঐতিহাসিক সাফল্য এনে দিয়েছিলেন। তাঁর কোচিংয়ে লাল-হলুদ দল প্রথমবারের মতো ISL চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পায়। সেই সাফল্যের পরই স্প্যানিশ কোচ দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং তাঁর জায়গায় দায়িত্ব নেন আন্তোনিও লোপেজ হাবাস।
অস্কারের সময়ের সাফল্য ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে এখনও বিশেষ স্মরণীয়। কিন্তু কোচের বিদায়ের পর চুক্তি, দল পরিচালনা এবং ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি ফ্যান পেজের পোস্টকে কেন্দ্র করে অস্কার প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানান। তিনি ইস্টবেঙ্গল ম্যানেজমেন্টের উদ্দেশ্য, দ্বিচারিতা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আবহে বকেয়া পারিশ্রমিকের অভিযোগ সামনে আসায় পুরনো সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
### ক্লাবের অবস্থান কী?
অস্কারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের সময় ইস্টবেঙ্গল ক্লাব একটি বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল। ক্লাবের বক্তব্য ছিল, কিছু ব্যক্তি বা সোশ্যাল মিডিয়া পেজ ইস্টবেঙ্গলের নাম ব্যবহার করে অস্কারকে নিয়ে বিভ্রান্তি এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করছে। সেই ধরনের পোস্টের সঙ্গে ক্লাবের কোনও সম্পর্ক নেই বলেও জানানো হয়। একইসঙ্গে অস্কারের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁর প্রতি সম্মান বজায় রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
তবে FIFA-তে বকেয়া অর্থের অভিযোগ নিয়ে ইস্টবেঙ্গল কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া এখনও স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। ক্লাব যদি জানায় যে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, কোনও চুক্তিগত বিরোধ রয়েছে অথবা অভিযোগের তথ্য সঠিক নয়, তাহলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
### ক্লাবের উপর আর্থিক চাপ বাড়বে?
ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে বকেয়া পারিশ্রমিক সংক্রান্ত অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে প্রাক্তন ফুটবলার বা কোচের পাওনা অর্থকে কেন্দ্র করে ক্লাবকে FIFA বা ফুটবল প্রশাসনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বকেয়া মেটানো না হলে দলবদল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য প্রশাসনিক সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে প্রতিটি অভিযোগের আইনি পরিস্থিতি আলাদা। কোনও ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়, আবার কোনও ক্ষেত্রে FIFA বা সংশ্লিষ্ট ফুটবল সংস্থার নির্দেশ মেনে অর্থ মেটাতে হয়। তাই অস্কার ও তাঁর দুই সহকারীর অভিযোগের পর ইস্টবেঙ্গলের উপর কী ধরনের চাপ তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে অভিযোগের নথি, বকেয়া অর্থের পরিমাণ এবং FIFA-র পরবর্তী পদক্ষেপের উপর।
### মাঠের বাইরের বিতর্কে সমর্থকদের উদ্বেগ
ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে ক্লাবের মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। কোচ, ফুটবলার বা সাপোর্ট স্টাফদের বকেয়া পারিশ্রমিক নিয়ে অভিযোগ তৈরি হলে তার প্রভাব ক্লাবের ভাবমূর্তির উপর পড়তে পারে।
বিশেষ করে অস্কার ব্রুজোঁর মতো সফল প্রাক্তন কোচের নাম এই অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। সমর্থকদের একাংশ চাইবেন, ক্লাব দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুক এবং FIFA-র পর্যায়ে বিষয়টি দীর্ঘায়িত না হোক।
অন্যদিকে ক্লাব কর্তৃপক্ষের সামনে চ্যালেঞ্জ হল, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় নথি পেশ করা এবং কোনও বকেয়া থাকলে তা দ্রুত মেটানোর ব্যবস্থা করা।
### পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
FIFA অভিযোগটি গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছ থেকে চুক্তি, পেমেন্টের প্রমাণ এবং অন্যান্য নথি চাইতে পারে। ইস্টবেঙ্গলকে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এরপর দুই পক্ষের বক্তব্য এবং নথি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যদি বকেয়া অর্থের দাবি সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে ক্লাবকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। সেই নির্দেশ পালন না করলে আরও কঠোর পদক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আবার যদি ক্লাবের বক্তব্য বা পাল্টা নথি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে অভিযোগের নিষ্পত্তি অন্যভাবেও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, অস্কার ব্রুজোঁ এবং তাঁর দুই সহকারীর FIFA-তে অভিযোগ ইস্টবেঙ্গলের জন্য নতুন প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে প্রাক্তন কোচের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে বকেয়া পারিশ্রমিকের অভিযোগ—দুই বিষয়ই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে FIFA-র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ক্লাবকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। এখন নজর থাকবে ইস্টবেঙ্গল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ামক সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।


