ব্যাংকের টাকা উদ্ধার হয়ে গেলেই বিজয় মাল্যাকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের মামলা শেষ হয়ে যাবে না। এমনই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে Enforcement Directorate বা ED। ব্রিটেনে থাকা পলাতক ব্যবসায়ী বিজয় মাল্যাকে ঘিরে চলা মামলায় ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেই অর্থ উদ্ধারের সঙ্গে ফৌজদারি মামলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই বলেই তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য। ফলে মাল্যার বিরুদ্ধে চলা অর্থপাচার সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া আপাতত বহাল থাকছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে মাল্যাও এই অর্থ উদ্ধারের প্রসঙ্গ তুলে ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, ব্যাংকগুলির পাওনা টাকার তুলনায় ইতিমধ্যেই অনেক বেশি অর্থ উদ্ধার হয়েছে। তাহলে তাঁকে এখনও কেন ‘পলাতক’ বা আর্থিক অপরাধে অভিযুক্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তবে ED-র অবস্থান হল, সম্পত্তি বা অর্থ উদ্ধার হওয়া এক বিষয় এবং অপরাধের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া অন্য বিষয়।
### কত টাকা উদ্ধার হয়েছে?
বিজয় মাল্যার সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক ঋণখেলাপি ও অর্থপাচার মামলায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু রিপোর্টে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ ₹১৪,১৩১.৬০ কোটি বলে দাবি করা হয়েছে। মাল্যাও নিজের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে এই অঙ্কের উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যাংকের মূল দাবির তুলনায় এত টাকা উদ্ধার হওয়ার পরেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা কেন চলবে।
তবে উদ্ধার হওয়া অর্থের অঙ্ক এবং মামলার মোট আর্থিক দায়—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা যায় না। বিভিন্ন সময়ে সুদ, জরিমানা, সম্পত্তির মূল্য, ব্যাংকের দাবি এবং আদালতের নির্ধারিত দায়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক উদ্ধার হয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ আইনত মুছে যায় না।
### মাল্যার যুক্তি কী?
সামাজিক মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিজয় মাল্যা দাবি করেছেন, তিনি ১৯৯২ সাল থেকেই ব্রিটেনে বসবাস করছেন। তাঁর বক্তব্য, ব্রিটেনের আইনি জটিলতা এবং পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে তিনি ভারতে ফিরতে পারছেন না। তাঁকে ‘ফেরার’ বা ‘পলাতক’ বলে চিহ্নিত করার বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন তিনি।
মাল্যার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলির পাওনা অর্থের তুলনায় অনেক বেশি টাকা উদ্ধার হয়েছে। সেই কারণে তাঁর বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এমনকি সম্প্রতি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তিনি মন্তব্য করেছেন, হয়তো ‘তেলাপোকা’ হয়ে থাকা তাঁর জন্য ভালো হবে। তাঁর এই পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
তবে মাল্যার বক্তব্য তাঁর নিজস্ব দাবি। এই দাবির মাধ্যমে আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার অবস্থান বদলে গিয়েছে—এমন কোনও তথ্য নেই।
### ED কেন মামলা চালিয়ে যেতে চাইছে?
ED-র মূল বক্তব্য হল, অর্থপাচার একটি পৃথক ফৌজদারি অপরাধ। Prevention of Money Laundering Act বা PMLA-এর অধীনে কোনও আর্থিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা অর্থ উদ্ধার করা গেলেও অপরাধের তদন্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না।
তদন্তকারী সংস্থার যুক্তি, সম্পত্তি উদ্ধার করা হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা ফেরানোর লক্ষ্যে। কিন্তু সেই সঙ্গে অর্থ কোথা থেকে এসেছিল, কীভাবে সরানো হয়েছিল, কারা সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল এবং অপরাধের মাধ্যমে সম্পদ তৈরি হয়েছিল কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তরও খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
অর্থাৎ অর্থ উদ্ধারকে ED মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে, মামলার সমাপ্তি হিসেবে নয়। উদ্ধার হওয়া অর্থের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ বা ব্যাংকের পাওনা মেটানো সম্ভব হতে পারে, কিন্তু অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচারপ্রক্রিয়া আলাদা পথে চলতে পারে।
### ব্যাংকের টাকা ফেরত মানেই মামলা শেষ নয়
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ঋণ পরিশোধ, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ফৌজদারি দায়—এই তিনটি বিষয় আলাদা। কোনও অভিযুক্তের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার হলেও তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, ষড়যন্ত্র বা অর্থপাচারের অভিযোগের বিচার চলতে পারে।
মাল্যার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য বলে তদন্তকারী সংস্থার অবস্থান। ব্যাংকের পাওনা উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা মামলার আর্থিক দিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু অর্থপাচারের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থাকে প্রমাণ করতে হবে, সংশ্লিষ্ট অর্থ বেআইনি উপায়ে অর্জিত বা স্থানান্তরিত হয়েছিল কি না।
সেই কারণে ED-র বক্তব্য, টাকা ফেরত পাওয়া গেলেই মাল্যার বিরুদ্ধে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করার প্রশ্ন ওঠে না।
### কিংফিশার এয়ারলাইন্সের ঋণকাণ্ড
বিজয় মাল্যার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগের সূত্রপাত তাঁর সংস্থা Kingfisher Airlines-এর ঋণকাণ্ডকে ঘিরে। বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল ঋণ পরবর্তীতে অনাদায়ী হয়ে পড়ে। এরপর ব্যাংকগুলির অভিযোগ, ঋণের টাকা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে অন্যত্র সরানো হয়েছিল।
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই মাল্যার বিরুদ্ধে প্রতারণা, ঋণখেলাপি এবং অর্থপাচারের মামলা শুরু হয়। ED এই মামলায় সম্পত্তি সংযুক্ত করা, বিদেশে থাকা সম্পদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চালিয়েছে।
মাল্যা অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে নিশানা করা হচ্ছে। তবে তাঁর এই দাবি আদালতে চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়েছে—এমন কোনও সিদ্ধান্তের কথা সামনে আসেনি।
### ব্রিটেন থেকে প্রত্যর্পণ নিয়েও জটিলতা
বিজয় মাল্যাকে ভারতে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করানোর চেষ্টা বহুদিন ধরেই চলছে। ব্রিটেনে তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও হয়েছে। কিন্তু নানা আইনি জটিলতা এবং গোপন আইনি বিষয়ের কারণে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে।
ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির বক্তব্য, আর্থিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে এনে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করানো জরুরি। অন্যদিকে মাল্যার দাবি, ব্রিটেনের আইন এবং আদালতের বিধিনিষেধের কারণেই তিনি ভারতে ফিরতে পারছেন না।
এই পরিস্থিতিতে অর্থ উদ্ধার হলেও মাল্যাকে ভারতে ফিরিয়ে আনা এবং তাঁর বিরুদ্ধে চলা মামলার নিষ্পত্তি—দুই বিষয়ই আলাদা আইনি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
### ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
ED-র অবস্থান অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া অর্থের হিসাব, সম্পত্তির মালিকানা, ঋণ সংক্রান্ত নথি এবং অর্থের গতিপথ নিয়ে তদন্ত চলবে। আদালতে প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মাল্যার বিরুদ্ধে মামলা শেষ করতে হলে শুধু ব্যাংকের টাকা উদ্ধার করলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দেশ, তদন্তের ফলাফল এবং অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি প্রয়োজন হবে। একইসঙ্গে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে, বিজয় মাল্যার দাবি—ব্যাংকের পাওনা টাকার তুলনায় বেশি অর্থ উদ্ধার হয়েছে, তাই মামলা শেষ হওয়া উচিত। কিন্তু ED-র বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তদন্তকারী সংস্থার মতে, **অর্থ উদ্ধার হওয়া আর অর্থপাচারের মামলা শেষ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়**। ফলে বিপুল টাকা ফেরত এলেও মাল্যার বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া আপাতত থামছে না। মামলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্ত, তদন্তের প্রমাণ এবং প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের উপর।


