খাবারের গুণমান এবং খাদ্য সুরক্ষা বিধি নিয়ে কলকাতায় প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার হল। কলকাতা পুরসভার তরফে আগে যে ৪০টি রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকানের লাইসেন্স বাতিলের নোটিস দেওয়া হয়েছিল, তার পর আরও **২৫টি রেস্তরাঁর লাইসেন্স বাতিল** করা হয়েছে। ফলে সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত কলকাতায় মোট **৬৫টি রেস্তরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধ** হয়ে গেল। পাশাপাশি কলকাতার বাইরেও একাধিক রেস্তরাঁ ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠানকে নোটিস পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
খাদ্য সুরক্ষা বিধি মেনে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে কি না, রান্নাঘরের পরিবেশ কেমন, খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি ঠিক রয়েছে কি না—এই ধরনের একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখতেই পুরসভা ও রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের যৌথ উদ্যোগে অভিযান চালানো হচ্ছে।
## কেন এত রেস্তরাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা?
খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়ম না মানার অভিযোগই এই অভিযানের মূল কারণ। সাম্প্রতিক পরিদর্শনে বিভিন্ন জায়গায় খাবার সংরক্ষণ, মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থাপনা, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্যপণ্যের লেবেল সংক্রান্ত নিয়ম খতিয়ে দেখা হয়েছে।
এর আগের অভিযানে কলকাতার একাধিক রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানে অনিয়ম ধরা পড়ার কথা জানিয়েছিল প্রশাসন। কোথাও সংরক্ষিত খাবারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ম মানা হয়নি, কোথাও আবার খাবার সঠিকভাবে চিহ্নিত বা লেবেল করা ছিল না বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট রেস্তরাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখা যাবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির বক্তব্য ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ।
## এক ধাক্কায় সংখ্যা বেড়ে ৬৫
প্রথম দফায় প্রায় ৪০টি রেস্তরাঁ, খাবারের দোকান ও মিষ্টির প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই শহরে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। তার মধ্যেই বুধবার রাতে আরও ২৫টি রেস্তরাঁর লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর ফলে মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় **৬৫**। অর্থাৎ শহরের খাদ্য ব্যবসায় প্রশাসনের নজরদারি যে এখন যথেষ্ট কঠোর, তা এই সংখ্যাতেই স্পষ্ট।
এই অভিযানকে শুধু নামী রেস্তরাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপ্রতিষ্ঠানকেই খাদ্য সুরক্ষা বিধি মেনে চলার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
## নামী রেস্তরাঁও তালিকায়
লাইসেন্স বাতিলের তালিকায় কলকাতার বেশ কিছু পরিচিত রেস্তরাঁর নাম রয়েছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে **দাদা বউদির হোটেল, ডেন জং কিচেন এবং পার্ক স্ট্রিটের ডন জিওভানি**-র নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তালিকা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। পুরসভার তরফে কিছু রেস্তরাঁর নাম নিয়ে বক্তব্য সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, তারা কোনও suspension বা licence cancellation notice পায়নি।
অর্থাৎ প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ফলে কোন প্রতিষ্ঠানকে ঠিক কী ধরনের নোটিস দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন।
## নিজাম, বিগ বস নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন
পুরকমিশনার স্মিতা পাণ্ডের বক্তব্যে যে কয়েকটি রেস্তরাঁর নাম উঠে এসেছে, তার মধ্যে **নিজাম এবং বিগ বস**-এর মতো পরিচিত নামও ছিল বলে সংবাদ প্রতিদিন জানিয়েছে। কিন্তু ওই নামগুলির সবকটি পুরসভার প্রকাশিত সরকারি তালিকায় রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক নোটিসের স্বচ্ছতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কোনও রেস্তরাঁর লাইসেন্স বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের কাছেও সেই সিদ্ধান্তের কারণ স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন—এমন দাবি উঠছে।
## Balaram Mullick-এর পক্ষ থেকেও স্পষ্টীকরণ
তালিকা ঘিরে তৈরি বিতর্কে ভবানীপুরের পরিচিত মিষ্টির প্রতিষ্ঠান **বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক**-এর নাম নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সুদীপ মল্লিক জানিয়েছেন, তালিকায় যে মিষ্টির দোকানের উল্লেখ রয়েছে, সেটি তাঁদের প্রতিষ্ঠান নয়। তাঁদের দাবি, তাঁদের কোনও সংস্থার কাছেই এমন নোটিস আসেনি এবং মিষ্টি তৈরিতে তাঁরা আন্তর্জাতিক খাদ্যবিধি মেনে চলেন।
ফলে শুধু তালিকায় কোনও নাম রয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম নিশ্চিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
## Arsalan-এর বক্তব্য কী?
কলকাতার জনপ্রিয় বিরিয়ানি প্রতিষ্ঠান **আরসালান**-এর তরফেও খাদ্যের গুণমান নিয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনও শাখার ক্ষেত্রেই তাঁরা খাদ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত নোটিস পাননি।
আরসালানের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, খাবারের গুণমানে কোনও আপস করা হয় না। বাসি বা পচা মাংস ব্যবহার করা হয় না বলেও সংস্থার তরফে দাবি করা হয়েছে। একইসঙ্গে খাদ্য সুরক্ষা নিয়ে রাজ্য সরকারের চলমান অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ধরনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি রেস্তরাঁগুলিও নিজেদের অবস্থান প্রকাশ্যে জানাতে শুরু করেছে।
## শুধু কলকাতা নয়, জেলাতেও অভিযান
খাদ্য সুরক্ষা অভিযান কলকাতা শহরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। রাজ্যের বিভিন্ন জেলাতেও রেস্তরাঁ, মিষ্টির দোকান এবং অন্যান্য খাদ্যপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন ও নোটিস দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগে রাজ্যজুড়ে খাদ্য সুরক্ষা অভিযান চালানোর সময় বিভিন্ন জায়গায় নিম্নমানের বা অনুপযুক্তভাবে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে দুর্গাপুজোর আগে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন যে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
## পুজোর আগে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই অভিযান?
দুর্গাপুজোর আগে কলকাতায় রেস্তরাঁ এবং খাবারের দোকানে ভিড় অনেকটাই বাড়ে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বাইরে থেকেও বহু মানুষ আসেন। ফলে এই সময় খাবারের গুণমান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
খাদ্যসামগ্রী সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, বাসি খাবার পুনরায় পরিবেশন না করা, রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং নির্দিষ্ট খাদ্য নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা—সব ক্ষেত্রেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
## রেস্তরাঁ মালিকদের জন্য কী বার্তা?
পরপর এতগুলি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ফলে রেস্তরাঁ ব্যবসায়ীদের কাছে প্রশাসনের বার্তা কার্যত স্পষ্ট—**খাদ্য সুরক্ষা বিধি মানা বাধ্যতামূলক**।
তবে ব্যবসায়ীদের একাংশের বক্তব্য, অভিযান হওয়া প্রয়োজন হলেও নোটিস, অভিযোগ এবং লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ হয়। কোনও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তাদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ এবং সরকারি নথির স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন বলেও দাবি উঠছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে খাদ্যের মান নিয়ে কোনও গাফিলতি থাকলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
## সাধারণ মানুষের জন্য কী শিক্ষা?
এই ঘটনার পর সাধারণ মানুষও রেস্তরাঁয় খাবার খাওয়ার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন। খাবারের গন্ধ, স্বাদ বা চেহারায় অস্বাভাবিকতা থাকলে তা না খাওয়াই নিরাপদ। দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা খাবার, অস্বাভাবিক রঙের খাদ্য বা সংরক্ষণ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সতর্ক হওয়া উচিত।
তবে কোনও রেস্তরাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নোটিস থাকা বা না থাকা একমাত্র মানদণ্ড নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পরিষ্কার পরিবেশ এবং নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণই হওয়া উচিত খাদ্য ব্যবসার মূল ভিত্তি।
## নজর থাকবে পরবর্তী পদক্ষেপে
কলকাতায় আরও ২৫টি রেস্তরাঁর লাইসেন্স বাতিলের ফলে মোট সংখ্যা ৬৫-এ পৌঁছেছে। আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তারা নিয়ম মেনে ফের ব্যবসা শুরু করতে পারে কি না এবং আরও কোনও রেস্তরাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না—সেদিকেই এখন নজর।
একইসঙ্গে প্রকাশিত তালিকা নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা প্রশাসনের তরফে পরিষ্কার করা হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কড়া নজরদারির পাশাপাশি তথ্যের স্বচ্ছতাও সমান জরুরি।


