মেয়ে নিখোঁজ। তাকে খুঁজে পেতে একজন মা কতদূর যেতে পারেন? সেই প্রশ্নকেই কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তাপসী পান্নু অভিনীত নতুন হিন্দি ছবি **‘গান্ধারী’**। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া এই অ্যাকশন থ্রিলারে তাপসীর সঙ্গে রয়েছেন ঈশ্বক সিং, ছায়া কদম, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, মিতা বশিষ্ঠ-সহ একাধিক অভিনেতা। ছবিটি লিখেছেন কানিকা ধিলোঁ এবং পরিচালনা করেছেন দেবাশিস মাখিজা।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বাণী। মেয়েকে হারানোর পর তার পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে বদলে যায়। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা থেকেই শুরু হয় তার লড়াই। সেই লড়াই ধীরে ধীরে তাকে এমন এক অন্ধকার জগতের সামনে দাঁড় করায়, যেখানে অপহরণ, শিশু পাচার এবং অপরাধের জাল একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
## গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি মাতৃত্বের আবেগ
‘গান্ধারী’র মূল বিষয় নিঃসন্দেহে তার আবেগ। সন্তানের জন্য মায়ের লড়াই সিনেমায় নতুন নয়, কিন্তু তাপসী পান্নুর বাণী চরিত্রটি সেই পরিচিত ধারণাকে অ্যাকশন-থ্রিলারের কাঠামোয় নিয়ে যেতে চেয়েছে।
বাণীর যন্ত্রণা, রাগ এবং মেয়েকে উদ্ধার করার অদম্য ইচ্ছা—এই তিনটি স্তরেই তাপসীর অভিনয় সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। বেশ কয়েকজন সমালোচকও জানিয়েছেন, দুর্বল চিত্রনাট্যের মধ্যেও তাপসীর পারফরম্যান্স ছবিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। NDTV-র পর্যালোচনায় তাঁর অ্যাকশন-অভিনয়কে ছবির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখা হয়েছে |
তাপসীর জন্য এই চরিত্র আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বহু বছর পর তিনি আবার অ্যাকশন ঘরানায় ফিরেছেন। অভিনেত্রী নিজেও মহিলা-কেন্দ্রিক অ্যাকশন ছবির ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রির আলাদা প্রত্যাশা ও কঠোর সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলেছেন।
## শিশু পাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শিশু পাচারের মতো ভয়াবহ সামাজিক সমস্যাকে গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বাণী এমন একটি অপরাধচক্রের সন্ধান পায়, যার পরিধি তার ধারণার থেকেও অনেক বড়।
এই জায়গায় ‘গান্ধারী’ শুধুমাত্র প্রতিশোধের সিনেমা হয়ে থাকতে চায় না। অপরাধের পিছনে থাকা সামাজিক বাস্তবতা, ছোট শহরের পরিবেশ, স্থানীয় বিশ্বাস এবং মানুষের ভয়—সবকিছুকে গল্পের সঙ্গে মেশানোর চেষ্টা করা হয়েছে। Indian Express-এর বাংলা পর্যালোচনাতেও ছবির এই সামাজিক বিষয় এবং রহস্যের আবহের কথা উঠে এসেছে।
## কিন্তু চিত্রনাট্যেই বড় সমস্যা
ছবিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই। একটি শক্তিশালী বিষয় এবং দক্ষ অভিনেত্রী থাকা সত্ত্বেও চিত্রনাট্য সবসময় সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি।
একাধিক সমালোচকের মতে, গল্প এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত টুইস্ট এবং নাটকীয়তার ব্যবহার বেড়ে যায়। কিছু ঘটনা বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গা থেকে সরে যায় এবং দর্শকের কাছে রহস্য তৈরি করার বদলে বিভ্রান্তি তৈরি করে। Times of India ছবিটিকে ২.৫/৫ দিয়ে জানিয়েছে, একের পর এক কৌশল ও টুইস্ট শেষ পর্যন্ত উত্তেজনার ধার কমিয়ে দেয়।
Rediff-এর পর্যালোচনাতেও ছবির যুক্তির ঘাটতি এবং অতিরিক্তভাবে তৈরি করা থ্রিলের সমালোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, ‘গান্ধারী’ যে প্রশ্নগুলো তুলতে চায়, সেগুলির অনেকটাই চিত্রনাট্যের দুর্বলতায় চাপা পড়ে যায়।
## স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতি কতটা নজর কাড়ল?
বাংলার দর্শকদের কাছে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ। তাপসীর পাশাপাশি তাঁর উপস্থিতি ছবিতে আলাদা মাত্রা যোগ করার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। তবে সমালোচকদের একাংশের মতে, মূল চরিত্র বাণীকে কেন্দ্র করে গল্প এতটাই এগিয়েছে যে পার্শ্বচরিত্রগুলির বিকাশ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
ফলে স্বস্তিকা-সহ বেশ কিছু দক্ষ অভিনেতার চরিত্র আরও গভীরভাবে দেখানো হলে ছবির আবেগ ও নাটকীয়তা দুটোই বাড়তে পারত।
## পরিচালনা ও পরিবেশ
দেবাশিস মাখিজার পরিচালনায় ‘গান্ধারী’ একটি অন্ধকার, অস্বস্তিকর আবহ তৈরি করার চেষ্টা করে। কাল্পনিক শহর জয়পুরার পরিবেশ, অপরাধের ছায়া এবং লোকবিশ্বাসের উপাদান মিলিয়ে ছবির একটি আলাদা ভিজ্যুয়াল জগত তৈরি করা হয়েছে।
তবে এই আবহ সবসময় গল্পকে সাহায্য করেনি। Cinema Express-এর পর্যালোচনায়ও বলা হয়েছে, ছবিতে কয়েকটি ভালো টুইস্ট থাকলেও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত plot-driven হয়ে পড়ে সিনেমাটি।
## তাহলে কি ‘গান্ধারী’ দেখা উচিত?
যদি তাপসী পান্নুর ভক্ত হন অথবা মহিলা-কেন্দ্রিক অ্যাকশন থ্রিলার দেখতে পছন্দ করেন, তাহলে ‘গান্ধারী’ একবার দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে তাপসীর শারীরিক প্রস্তুতি, রাগ এবং মাতৃত্বের আবেগ ছবির উল্লেখযোগ্য দিক।
তবে নিখুঁত থ্রিলার বা অত্যন্ত টানটান চিত্রনাট্যের প্রত্যাশা নিয়ে বসলে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ছবির মূল বিষয়টি যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও তার উপস্থাপনায় বেশ কিছু জায়গায় অসামঞ্জস্য রয়েছে। Indian Express-এর পর্যালোচনাও ছবিটিকে সম্ভাবনাময় বিষয় থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাবের জায়গায় দুর্বল বলে মনে করেছে।
## শেষ কথা
**‘গান্ধারী’ মূলত একজন মায়ের অসীম লড়াইয়ের গল্প।** তাপসী পান্নু সেই চরিত্রে যথেষ্ট শক্তি ও আবেগ ঢেলেছেন। কিন্তু একটি দুর্দান্ত কেন্দ্রীয় অভিনয় সবসময় দুর্বল চিত্রনাট্যের ঘাটতি পূরণ করতে পারে না।
শিশু পাচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মায়ের প্রতিশোধ এবং অ্যাকশনের সম্ভাবনা—সবই ছিল ছবিতে। কিন্তু অতিরিক্ত টুইস্ট, কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনা এবং পার্শ্বচরিত্রের অপর্যাপ্ত বিকাশের কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগেনি। ফলে **‘গান্ধারী’ দেখার মতো একটি থ্রিলার হলেও নিখুঁত থ্রিলার হয়ে উঠতে পারেনি।**


