কলকাতা ফুটবল লিগের ডার্বিতে বড় চমক দেখাল ইস্টবেঙ্গলের তরুণ দল। একদিকে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট নামিয়েছিল একাধিক অভিজ্ঞ ও প্রথম দলের ফুটবলারকে, অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গল মূলত রিজার্ভ দলের তরুণদের নিয়েই মাঠে নামে। তবু শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ম্যাচ ড্র করে লাল-হলুদ শিবির। এমন পারফরম্যান্সে স্বাভাবিকভাবেই সন্তুষ্ট ইস্টবেঙ্গলের কোচ আর্চিশ্মান বিশ্বাস।
বারাসত স্টেডিয়ামে সোমবারের এই ম্যাচে প্রথমার্ধে মোহনবাগান তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল। ৩৮ মিনিটে মনবীর সিং গোল করে সবুজ-মেরুনকে এগিয়ে দেন। কিন্তু বিরতির পর সম্পূর্ণ অন্য ছবি দেখা যায়। আত্মবিশ্বাস নিয়ে আক্রমণে ওঠে ইস্টবেঙ্গলের তরুণরা। শেষ পর্যন্ত ৬৪ মিনিটে পরিবর্ত হিসেবে নামা মহম্মদ বিলালের হেড থেকে সমতা ফেরায় লাল-হলুদ।
### অভিজ্ঞতার ব্যবধান পেরিয়ে সমতা
এই ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দুই দলের দলগঠনে বিরাট পার্থক্য। মোহনবাগানের একাদশে ছিলেন মনবীর সিং, সাহাল আবদুল সামাদ, শুভাশিস বসু, মেহতাব সিং এবং রাহুল ভেকের মতো অভিজ্ঞ ফুটবলার। বিপরীতে ইস্টবেঙ্গল ভরসা রেখেছিল অপেক্ষাকৃত কম বয়সি ফুটবলারদের উপর। ফলে ম্যাচ শুরুর আগে অভিজ্ঞতার বিচারে মোহনবাগানকে এগিয়ে রাখা স্বাভাবিকই ছিল।
কিন্তু মাঠে সেই ব্যবধান খুব একটা দেখা গেল না। প্রথমার্ধে গোল হজম করলেও দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের খেলা বদলে দেয় ইস্টবেঙ্গল। মাঝমাঠে চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি আক্রমণের গতিও বাড়ায় তারা। তারই ফল আসে বিলালের গোলে। এরপর দুই দলই জয়সূচক গোলের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আর কোনও গোল হয়নি।
### ‘তরুণরাই ডার্বি খেলুক’, সিদ্ধান্তে আস্থা কোচের
ম্যাচের পর ইস্টবেঙ্গল কোচ আর্চিশ্মান বিশ্বাস নিজের ফুটবলারদের প্রশংসায় ভরিয়ে দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—এই তরুণদের উপর তাঁর শুরু থেকেই বিশ্বাস ছিল। বড় নামের ফুটবলারদের এনে ডার্বি খেলানোর বদলে তিনি তরুণদেরই সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন।
কোচের মতে, ডার্বির মতো বড় ম্যাচে সুযোগ পেলে এই ফুটবলাররা নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। বিরতির সময়ও তাঁর দলের ফুটবলাররা ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধে কয়েকটি কৌশলগত পরিবর্তনও কাজে আসে বলে জানান তিনি।
### বিরতিতে বদলে গেল ম্যাচের ছবি
প্রথম ৪৫ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। মনবীরের গোলে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যেতে হয় তাদের। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের গতি। তরুণ ফুটবলারদের মধ্যে আক্রমণাত্মক মানসিকতা দেখা যায় এবং মোহনবাগানের রক্ষণকে ক্রমশ চাপে ফেলে তারা।
৬৪ মিনিটে কর্নার থেকে মহম্মদ বিলালের হেডে গোল আসে। গোল পাওয়ার পর ইস্টবেঙ্গলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ে। ম্যাচের শেষ দিকে দুই দলই জয়ের জন্য চেষ্টা করে। তবে শেষ পর্যন্ত গোলের সংখ্যা আর বাড়েনি।
### গ্রুপের শীর্ষে ইস্টবেঙ্গল
এই ড্রয়ের ফলে কলকাতা ফুটবল লিগের গ্রুপ পর্বে ইস্টবেঙ্গল শীর্ষস্থান ধরে রাখে। ১১ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে তারা গ্রুপ-১-এর প্রথম স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে মোহনবাগানও সুপার সিক্সে জায়গা নিশ্চিত করেছে এবং ২৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
ফলে ডার্বিতে জয় না এলেও ইস্টবেঙ্গলের কাছে এই ফল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সিনিয়র দলের অনুপস্থিতিতে তরুণ ও রিজার্ভ ফুটবলাররা যে বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে পারে, সেটাই প্রমাণিত হয়েছে।
### তরুণদের জন্য বড় আত্মবিশ্বাস
ইস্টবেঙ্গলের এই পারফরম্যান্স শুধু একটি পয়েন্ট পাওয়ার গল্প নয়। বরং ভবিষ্যতের ফুটবলারদের জন্য এটি বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ। তার উপর প্রতিপক্ষ যখন একাধিক অভিজ্ঞ ফুটবলারকে নিয়ে মাঠে নামে, তখন সেই দলের বিরুদ্ধে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফিরে আসা তরুণদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে।
কোচ আর্চিশ্মান বিশ্বাসের সন্তুষ্টিও সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে তরুণদের উপর আস্থা রেখেছেন, ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে সেই আস্থারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। সামনে সুপার সিক্স পর্বে এই ফুটবলারদের আরও বড় দায়িত্ব দেওয়া হলে তাঁদের বিকাশের পথও খুলে যেতে পারে।
### ডার্বির ফলের থেকেও বড় বার্তা
কলকাতা ডার্বিতে ১-১ ফলাফল হয়তো দুই দলের কোনও পক্ষকেই পুরোপুরি সন্তুষ্ট করেনি। তবে ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রে ম্যাচটির গুরুত্ব আলাদা। কয়েক সপ্তাহ আগেই ডুরান্ড কাপের ফাইনালে মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ট্রফি জিতেছিল লাল-হলুদ। এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে, তরুণ দল নিয়েও সবুজ-মেরুনের শক্তিশালী একাদশকে আটকে দেওয়া নিঃসন্দেহে ইস্টবেঙ্গলের জন্য ইতিবাচক বার্তা।
ডুরান্ড কাপের সেই বড় জয়ের পর এই ড্র-ও ইস্টবেঙ্গলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়াবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, রিজার্ভ দলের ফুটবলাররা যে ভবিষ্যতে মূল দলের জন্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারেন, বারাসতের ডার্বিতে তারই ইঙ্গিত মিলল।


