ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ **জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার** এবার ইতিহাস তৈরি করতে চলেছে। ৭২ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথমবার দিল্লির বাইরে বসতে চলেছে এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর গুজরাটের একতা নগরে অনুষ্ঠিত হবে ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে।
এতদিন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের অনুষ্ঠান মূলত নয়াদিল্লিকেন্দ্রিক ছিল। বিশেষ করে দিল্লির বিজ্ঞান ভবন এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। সেই ঐতিহ্য ভেঙে এবার দেশের পশ্চিম প্রান্তের গুজরাটকে বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে এবারের অনুষ্ঠান শুধু পুরস্কার বিতরণী নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে উঠতে চলেছে।
## কোথায় হবে অনুষ্ঠান?
গুজরাটের **একতা নগর**, যা আগে কেভাডিয়া নামে পরিচিত ছিল, এবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে। এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পর্যটনস্থল **স্ট্যাচু অফ ইউনিটি**-র জন্য বিখ্যাত। সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের বিশাল মূর্তিকে ঘিরে একতা নগরকে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর উপস্থিতিতে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। ফলে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে গুজরাটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রও এবার যুক্ত হতে চলেছে।
## ৭২ বছরে প্রথমবার বদলাচ্ছে ঠিকানা
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রথম দেওয়া হয় ১৯৫৪ সালে। দেশের বিভিন্ন ভাষা ও অঞ্চলের চলচ্চিত্র, অভিনেতা, পরিচালক এবং কলাকুশলীদের সৃজনশীল কাজকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এই পুরস্কারের সূচনা হয়েছিল। সাত দশকের বেশি সময় ধরে এটি ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বীকৃতিগুলির অন্যতম হয়ে রয়েছে।
এত বছর ধরে দিল্লিকে কেন্দ্র করেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়ে এসেছে। ফলে গুজরাটে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে জাতীয় স্তরের এই ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেশের অন্য রাজ্যেও আয়োজন করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
## এবারের পুরস্কারে কারা নজরে?
৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের বিজয়ীদের তালিকা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে বিভিন্ন বিভাগে সেরা কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
**‘Article 370’** সেরা ফিচার ফিল্মের পুরস্কার পেয়েছে। এই ছবির জন্য **ইয়ামি গৌতম** সেরা অভিনেত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে **মামুট্টি** এবং **কার্তিক আরিয়ান** ‘Bramayugam’ এবং ‘Chandu Champion’-এর অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছেন।
অর্থাৎ, এবারের পুরস্কার বিতরণীতে বলিউডের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র জগতের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরাও উপস্থিত থাকবেন।
## গুজরাটের সঙ্গে সিনেমার বিশেষ যোগ
গুজরাটের সঙ্গে ভারতীয় সিনেমার সম্পর্কও যথেষ্ট পুরনো। আঞ্চলিক চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে হিন্দি সিনেমা—বিভিন্ন সময়ে গুজরাটের সংস্কৃতি, লোকশিল্প, স্থাপত্য ও ঐতিহ্য চলচ্চিত্রে জায়গা করে নিয়েছে।
গুজরাটি সিনেমাও জাতীয় স্তরে একাধিকবার সাফল্য পেয়েছে। গুজরাটি ছবি **‘Hellaro’** ৬৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা ফিচার ফিল্মের সম্মান পেয়েছিল এবং এই পুরস্কার পাওয়া প্রথম গুজরাটি ছবি হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছিল।
তাই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মূল অনুষ্ঠান এবার গুজরাটে হওয়াকে রাজ্যের চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
## দিল্লির বাইরে যাওয়ার তাৎপর্য কী?
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের অনুষ্ঠান এতদিন রাজধানীকেন্দ্রিক থাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই জাতীয় অনুষ্ঠানের সরাসরি যোগ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এবার গুজরাটে অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে সেই কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
দেশের চলচ্চিত্র শিল্প শুধু মুম্বই বা দিল্লিকেন্দ্রিক নয়। বাংলা, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড়, অসমিয়া, মারাঠি, গুজরাটি-সহ বহু ভাষার চলচ্চিত্র ভারতীয় সিনেমাকে সমৃদ্ধ করে। জাতীয় পুরস্কারের অনুষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হলে সেই বহুত্ব আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
## স্ট্যাচু অফ ইউনিটির আবহে চলচ্চিত্রের মহোৎসব
এবারের অনুষ্ঠানের আরও একটি বিশেষ দিক হল ভেন্যু। একতা নগর শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বা পর্যটন কেন্দ্র নয়, সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের স্ট্যাচু অফ ইউনিটিকে কেন্দ্র করে এটি জাতীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। ২০১৮ সালে উদ্বোধন হওয়া এই মূর্তিটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মূর্তি হিসেবে পরিচিত।
সেই আবহেই দেশের সেরা চলচ্চিত্রকর্মীদের সম্মান জানানো হবে। ফলে এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানকে ঘিরে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি পর্যটন ও সাংস্কৃতিক প্রচারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
## রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সম্মান
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের অন্যতম আকর্ষণ হল রাষ্ট্রপতির হাতে পুরস্কার গ্রহণ। এবারও সেই ঐতিহ্য বজায় থাকছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু গুজরাট সফরের সময় ২২ সেপ্টেম্বর একতা নগরে বিজয়ীদের হাতে সম্মান তুলে দেবেন।
এর ফলে ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার শুধু বিজয়ীদের জন্য নয়, আয়োজক রাজ্য গুজরাটের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
## নতুন যুগের সূচনা?
দিল্লির বাইরে প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আয়োজনকে অনেকেই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন। যদিও ভবিষ্যতে অনুষ্ঠানটি প্রতি বছর অন্য রাজ্যে হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও স্থায়ী সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
তবে এবারের সিদ্ধান্ত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ভারতীয় চলচ্চিত্রের জাতীয় উদ্যাপন শুধু রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্রের সঙ্গেও যুক্ত করা সম্ভব।
৭২ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে ২২ সেপ্টেম্বর একতা নগরে যখন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করা হবে, তখন একদিকে সম্মানিত হবে ভারতীয় সিনেমার সেরা প্রতিভারা, অন্যদিকে নতুন জায়গায় লেখা হবে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের ইতিহাস।


