বিশ্বের মানচিত্র কীভাবে তৈরি হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত **Mercator Projection**-এর পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত বাস্তব আয়তন তুলে ধরতে সক্ষম **Equal Earth Projection** ব্যবহারের পক্ষে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব পাস হয়েছে। ৪ সেপ্টেম্বরের ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ১৬৪টি দেশ ভোট দেয়, বিপক্ষে ছিল শুধু আমেরিকা। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সীমানা বদলানো নয়। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশের প্রকৃত আয়তনকে তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরা। Equal Earth-এর মতো equal-area projection-এ পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের আপেক্ষিক আয়তনকে বেশি নির্ভুলভাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের মানচিত্রে উপস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে এসেছে।
## কেন Mercator মানচিত্র নিয়ে প্রশ্ন?
পৃথিবী গোলাকার, কিন্তু আমরা সাধারণত তাকে সমতল মানচিত্রে দেখি। ফলে কোনও না কোনও ধরনের বিকৃতি থাকবেই। Mercator Projection মূলত নৌ-পরিচালনা ও দিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও এতে মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলগুলির আয়তন বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়।
এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকা। Mercator মানচিত্রে দুটিকে প্রায় কাছাকাছি আয়তনের বলে মনে হতে পারে। বাস্তবে আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ। ফলে মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত বিশালতা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
Equal Earth Projection-এর লক্ষ্যই হল এই ধরনের আয়তনগত বিভ্রান্তি কমানো। তবে এর অর্থ এই নয় যে Mercator মানচিত্র রাতারাতি নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবটি বাধ্যতামূলক নয় এবং নৌ ও বিমান চলাচলের মতো ক্ষেত্রে Mercator-এর ব্যবহার অব্যাহত থাকতে পারে।
## রাষ্ট্রসংঘের সিদ্ধান্তে ভারতের অবস্থান কী?
নতুন মানচিত্র ব্যবস্থার মূল নীতিকে সমর্থন করেছে ভারত। কিন্তু একইসঙ্গে নয়াদিল্লি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে—এই ভোট কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র বা নির্দিষ্ট projection-কে সমর্থন করার অর্থ নয়। ভারতের ভোট মূলত সমান আয়তনভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারের বৃহত্তর নীতির পক্ষে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক আরও জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডের উপস্থাপনা ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ীই হতে হবে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের ক্ষেত্রে কোনও ভুল বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা ভারত মেনে নেবে না।
অর্থাৎ, মানচিত্রের প্রযুক্তিগত projection বদলানো এবং আন্তর্জাতিক সীমানা দেখানোর প্রশ্ন—দুটি আলাদা বিষয়। রাষ্ট্রসংঘের এই প্রস্তাব ভারতের সীমান্ত বা ভূখণ্ডের অবস্থান পরিবর্তন করছে না।
## ‘অখণ্ড কাশ্মীর’ প্রসঙ্গ কেন উঠছে?
এই জায়গাতেই বিষয়টি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের দিকে যায়। সংশ্লিষ্ট সম্পাদকীয়তে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, যদি ঔপনিবেশিক যুগের মানচিত্রে থাকা আয়তনগত ও দৃষ্টিভঙ্গিগত অসঙ্গতি সংশোধন করা হয়, তাহলে ভারতের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মানচিত্রে কীভাবে প্রতিফলিত করা হবে, সেই প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। সম্পাদকীয়টি বিশেষভাবে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখকে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সম্পাদকীয়র আরও এক ধাপ এগিয়ে বক্তব্য, মহারাজা হরি সিংয়ের ভারতে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী ইতিহাসকে বিবেচনায় নিয়ে ‘অখণ্ড কাশ্মীর’-কেও ভারতের অংশ হিসেবে মানচিত্রে দেখানো উচিত। এটি **সম্পাদকীয়র মতামত**, রাষ্ট্রসংঘের গৃহীত কোনও নতুন সিদ্ধান্ত নয়।
## কাশ্মীরের ইতিহাসে দেশভাগের প্রভাব
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জম্মু ও কাশ্মীরকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। মহারাজা হরি সিংয়ের ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তের পর দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হয় এবং কাশ্মীরের একটি অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চল দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিরোধের জায়গা হয়ে রয়েছে।
ভারতের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ। পাকিস্তান অবশ্য এই দাবিকে স্বীকার করে না। ফলে কোনও আন্তর্জাতিক মানচিত্রে কাশ্মীরকে কীভাবে দেখানো হচ্ছে, তা শুধু ভূগোলের বিষয় নয়—এর সঙ্গে কূটনীতি, ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় অবস্থানও জড়িত।
## মানচিত্র কি ইতিহাস বদলে দিতে পারে?
বাস্তবে কোনও মানচিত্র বদলালেই দেশের সীমানা বা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ বদলে যায় না। রাষ্ট্রসংঘের সাম্প্রতিক প্রস্তাবও রাজনৈতিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য নয়; এর মূল লক্ষ্য পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের প্রকৃত আয়তনকে আরও যথাযথভাবে তুলে ধরা।
তবে মানচিত্রের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। স্কুলের ভূগোল বই, সংবাদমাধ্যম, ডিজিটাল ম্যাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনায় একটি অঞ্চলকে যেভাবে দেখানো হয়, তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভূগোল সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। সেই কারণে মানচিত্রের উপস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক রয়েছে।
## আফ্রিকার পর ভারতের প্রশ্ন
Equal Earth নিয়ে আফ্রিকার দেশগুলির আগ্রহের পিছনে অন্যতম কারণ ছিল মানচিত্রে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে তুলে ধরা। টোগো এই উদ্যোগকে সামনে নিয়ে এসেছে এবং দেশটির পক্ষ থেকে চলতি বছরের মধ্যেই স্কুলের ভূগোলের বইয়ে নতুন projection ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব মানচিত্র যদি নতুন করে আরও বাস্তবসম্মত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রাজনৈতিক সীমানা এবং বিতর্কিত ভূখণ্ডের উপস্থাপনায় কী ধরনের নীতি অনুসরণ করা হবে?
ভারত অবশ্য ইতিমধ্যেই তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। Equal-area projection-এর নীতিকে সমর্থন করলেও কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্রকে অনুমোদন দেয়নি। একইসঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের ক্ষেত্রে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুসরণের দাবি জানিয়েছে।
## বিতর্কের কেন্দ্রেই ‘সত্যের মানচিত্র’
বিশ্ব মানচিত্রের এই পরিবর্তন তাই শুধুমাত্র কার্টোগ্রাফির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং একটি দেশের নিজস্ব ভূখণ্ড সম্পর্কে অবস্থান।
রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবের লক্ষ্য মূলত মানচিত্রে ভূখণ্ডের আয়তনগত বিকৃতি কমানো। আর ভারতের বক্তব্য হল, সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডের উপস্থাপনায় কোনও আপস করা যাবে না।
সংশ্লিষ্ট সম্পাদকীয় আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘অখণ্ড কাশ্মীর’-কে ভারতের অন্তর্ভুক্ত দেখানোর পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু এই দাবি বর্তমানে **সম্পাদকীয় মতামত ও রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ**, কোনও নতুন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা রাষ্ট্রসংঘের সিদ্ধান্ত নয়। বিশ্ব মানচিত্রে পরিবর্তনের বাস্তব প্রয়োগ শুরু হলে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক সীমানা কীভাবে উপস্থাপিত হবে, সেই বিতর্ক তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


