ইরানকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের আবহে এবার নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এমন একটি বিকৃত মানচিত্র পোস্ট করেছেন তিনি, যেখানে ইরানের ভৌগোলিক আকৃতিকে তাঁর নিজের মুখের প্রোফাইলের মতো করে দেখানো হয়েছে। পোস্টটি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। অনেকের মতে, এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রচার নয়, বরং ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের প্রতীকী বার্তাও হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তাঁর বক্তব্যের সুর আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে। তেল, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং খার্গ দ্বীপকে ঘিরেও তিনি একাধিক বার্তা দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ইরানের মানচিত্রকে নিজের মুখের আকারে দেখানোর ছবি সামনে এল।
### মানচিত্রে কী বার্তা দিতে চাইলেন ট্রাম্প?
ট্রাম্পের পোস্ট করা ছবিতে ইরানের ভূখণ্ডের আউটলাইন এমনভাবে বদলে দেওয়া হয়েছে, যাতে সেটি দূর থেকে তাঁর মুখের পার্শ্বচিত্রের মতো দেখায়। এই ধরনের ছবি সরাসরি কোনও সরকারি সামরিক নথি নয়। তবে ইরান-আমেরিকা সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে পোস্টটির রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে গত কয়েক দিনে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা ফের বেড়েছে। ইরানের তেলবাহী তিনটি ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলার পর তেহরানও ওয়াশিংটনকে আরও কঠোর পালটা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের নতুন পোস্টকে অনেকেই সেই সংঘাতের প্রেক্ষাপটেই দেখছেন।
### খার্গ দ্বীপ নিয়েও ট্রাম্পের বার্তা
ইরানের তেল অর্থনীতির ক্ষেত্রে খার্গ দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি ইরানের অন্যতম প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা ও পালটা হুমকির আবহে খার্গকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলির মধ্যে খার্গ দ্বীপকে কেন্দ্র করে **“Bye Bye Kharg”** ধরনের বার্তাও সামনে এসেছে। ফলে ইরানের মানচিত্রে নিজের মুখের ছবি এবং খার্গ নিয়ে পোস্ট—দুটি বিষয়কে একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তবে এগুলিকে ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপের নিশ্চিত ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো কোনও সরকারি তথ্য সামনে আসেনি।
### তেল ট্যাঙ্কারে হামলার পর আরও উত্তপ্ত পরিস্থিতি
এর আগে মার্কিন বাহিনী ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালায়। মার্কিন পক্ষের দাবি, ওই জাহাজগুলি ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC এবং তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলির অর্থ জোগানের সঙ্গে যুক্ত একটি গোপন নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, ইরানের তরফে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরই ট্যাঙ্কারগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়।
অন্যদিকে, ইরান মার্কিন পদক্ষেপকে বেআইনি ও আগ্রাসী বলে নিন্দা করেছে। তেহরানের তরফে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে ইরানের স্বার্থ বা নিরাপত্তার উপর হামলা হলে আরও দ্রুত এবং আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। ফলে দু’দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
### ট্রাম্প বলছেন, সংঘাত ‘ছোট ব্যাপার’
ইরান সংঘাত নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে **“small potatoes”** বা তুলনামূলকভাবে ছোট বিষয় বলে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই সামরিক সংঘাত বড় কিছু নয়।
তবে একই সময়ে মার্কিন সামরিক অভিযানে ১৮ জন মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে AP জানিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের এই মন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সংঘাতটিকে ‘যুদ্ধ’ না বলে সামরিক সংঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
### ইরানের মানচিত্র বদলে যাবে? বাড়ছে জল্পনা
এর আগেও ইরান নিয়ে মানচিত্র ব্যবহার করে বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। মে মাসে তিনি ইরানের মানচিত্রের উপর মার্কিন পতাকার ছবি দিয়ে **“United States of the Middle East?”** প্রশ্নটি তুলেছিলেন। সেই সময়ও পোস্টটি নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক আলোচনা হয়েছিল।
এবার নিজের মুখের আকৃতিতে ইরানের মানচিত্র প্রকাশ করায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ইরানের ভবিষ্যৎ ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে কি কোনও বার্তা দিতে চাইছেন ট্রাম্প? তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও সরকারি ঘোষণা নেই যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সীমানা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। তাই এই ধরনের ব্যাখ্যাকে আপাতত রাজনৈতিক জল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
### হরমুজ প্রণালী নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান ও আমেরিকার সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
সোমবারই ইরান জানিয়েছে, উপসাগরে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত এলাকা তৈরি এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি করিডর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, এই বিষয়ে ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও ভাবা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র শত্রুতামূলক পদক্ষেপ বন্ধ করলে হরমুজ খোলা রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
### একের পর এক পোস্টে ট্রাম্প, নজরে গোটা বিশ্ব
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া কার্যকলাপ শুধু একটি মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সময় তিনি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নিউ মেক্সিকোর নাম বদলে **“New America”** করার মতো বিতর্কিত মানচিত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বার্তাও পোস্ট করেছেন। ফলে রবিবারের এই ধারাবাহিক পোস্ট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিশেষ নজর কেড়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের মানচিত্রে নিজের মুখ বসিয়ে ট্রাম্প ঠিক কী বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা নিয়ে জল্পনা চলছেই। তবে নিশ্চিত বিষয় হল—তেল, হরমুজ প্রণালী, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং সামরিক সংঘাতকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক ফের অত্যন্ত স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের প্রতিটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টই আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করছে।


