মধ্যপ্রাচ্যে ফের ভয়াবহভাবে বাড়ল আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এবার পালটা জবাব দিল আমেরিকা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়ে সেগুলিকে ধ্বংস বা অচল করে দেওয়া হয়েছে। খার্গ দ্বীপের উপকূল, জাস্কের কাছে এবং ওমান উপসাগরে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ঘটনার জেরে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে খার্গ দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর জলপথ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। ফলে ওই অঞ্চলে সামরিক সংঘাত আরও বাড়লে তার প্রভাব শুধু আমেরিকা বা ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বিশ্ববাজারেও পড়তে পারে।
## কেন ইরানের ট্যাঙ্কারে হামলা আমেরিকার?
মার্কিন সামরিক বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে ইরানের আইআরজিসি দুটি মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। মার্কিন দাবি, একটি বিমানবাহী রণতরী এবং একটি ডেস্ট্রয়ারকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। তবে কোনও মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি এবং যুদ্ধজাহাজগুলি হামলা এড়াতে সক্ষম হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের বক্তব্য।
এর পরেই পালটা সামরিক পদক্ষেপ নেয় আমেরিকা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়। তাদের মধ্যে দু’টি ট্যাঙ্কারকে স্থায়ীভাবে অচল করে দেওয়া হয়েছে এবং তৃতীয় একটি, যেটি খালি ছিল, সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে বলে মার্কিন পক্ষের দাবি।
মার্কিন সামরিক কর্তাদের দাবি, এই জাহাজগুলি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে অর্থ জোগানো একটি গোপন তেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের কাছে এগুলি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক জাহাজ নয়, বরং ইরানের সামরিক ও আর্থিক কাঠামোর অংশ। সেই কারণেই এগুলিকে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে।
## কোথায় আঘাত হানা হয়েছে?
মার্কিন সেনার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি ট্যাঙ্কারে খার্গ দ্বীপের কাছে হামলা চালানো হয়। দ্বিতীয় জাহাজটি জাস্কের কাছে এবং তৃতীয়টি ওমান উপসাগরে আঘাতের মুখে পড়ে। ফলে ইরানের উপকূলবর্তী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলে একই সময়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
খার্গ দ্বীপের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। ইরানের প্রধান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কেন্দ্রগুলির একটি এই দ্বীপ। তাই সেখানে বা তার আশপাশে সামরিক সংঘাত বাড়লে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, ওমান উপসাগর হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এই জলপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে একের পর এক জাহাজ আক্রান্ত হলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, বিমা খরচ এবং জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
## নাবিকদের কী হল?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, হামলা চালানোর আগে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলির নাবিক ও নৌকর্মীদের জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ অভিযান চালানোর আগে জাহাজে থাকা কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে।
তবে এই হামলার ফলে ইরানের সামুদ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থার উপর কী পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে তেল রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করা হলে ইরানের অর্থনীতির উপরও চাপ বাড়তে পারে।
## পালটা হামলার দাবি ইরানের
মার্কিন হামলার পর ইরানও পালটা পদক্ষেপের দাবি করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকার হামলার জবাবে তিনটি তেলবাহী জাহাজ এবং তিনটি মার্কিন জাহাজকে লক্ষ্য করা হয়েছে। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিতকরণ তখনও সম্ভব হয়নি।
ইরান মার্কিন হামলাকে ‘অবৈধ’ এবং ‘আগ্রাসী’ বলে তীব্র নিন্দা করেছে। তেহরানের অভিযোগ, এই ধরনের অভিযান আসলে ইরানের উপর সামুদ্রিক অবরোধ এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ।
ইরানের সামরিক পক্ষ আরও সতর্ক করেছে, আমেরিকা যদি ইরানের জাহাজ চলাচলে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখে, তাহলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হামলা হতে পারে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
## তেলবাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এই সংঘাত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একইসঙ্গে জাহাজের বিমা খরচ এবং পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ইতিমধ্যেই সংঘাতের খবরের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ওঠানামা দেখা গিয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে, তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলা শুধু দুই দেশের সামরিক সংঘাতের নতুন অধ্যায় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রশ্নও। ইরান ও আমেরিকার পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ আগামী দিনে কোথায় গিয়ে থামে, এখন সেদিকেই নজর গোটা বিশ্বের।


