উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এবার যোগ হতে চলেছে এক নতুন অধ্যায়। প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আয়োজন করা হচ্ছে দুর্গাপুজোর। এতদিন এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজো এবং বিশ্বকর্মা পুজোর মতো আয়োজন থাকলেও দুর্গাপুজো হয়নি। ২০২৬ সাল থেকেই সেই ছবিতে বদল আসতে চলেছে। সনাতনী রীতি ও উপাচার মেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেল ময়দানে দেবী দুর্গার আরাধনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে জোরকদমে।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে ইতিমধ্যেই উৎসাহ তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং কর্মীদের মধ্যে। পুজোর আয়োজনকে শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে না দেখে ক্যাম্পাসের সার্বিক সাংস্কৃতিক পরিবেশের অংশ হিসেবেও তুলে ধরার প্রস্তুতি চলছে। প্রথমবারের এই পুজোকে ঘিরে তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
### প্রথমবার ক্যাম্পাসে দেবী দুর্গার আরাধনা
রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় উত্তর দিনাজপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এবার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই মৃন্ময়ী দেবী দুর্গার প্রতিমা এনে পুজোর আয়োজন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেল ময়দানেই হবে মূল পুজো। সনাতনী রীতি মেনে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক প্রশান্ত মহলা দেবীর বোধনের সময় চণ্ডীপাঠে অংশ নেবেন। অর্থাৎ পুজোর সূচনা থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যবাহী রীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজো করার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। পুজোর চার দিন ঘিরে ক্যাম্পাসে উৎসবের আবহ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
### অষ্টমীতে কুমারী পুজোর পরিকল্পনা
শুধু প্রতিমা পুজোতেই থেমে থাকছে না রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দুর্গোৎসব। পৌরাণিক রীতি মেনে অষ্টমীর সকালে কুমারী পুজোর আয়োজন করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর এই অনুষ্ঠান পুজোর অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
অষ্টমীর দিন দুপুরে পড়ুয়াদের জন্য প্রসাদের বিশেষ ব্যবস্থাও থাকছে। প্রসাদী খিচুড়ির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সবজি পরিবেশনের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে পুজোর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য সামাজিক ও মিলনমুখী আয়োজনও থাকছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্গাপুজোর আয়োজন পড়ুয়াদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রথমবারের এই আয়োজনকে ঘিরে বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের একসঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
### বাজেট দেড় লক্ষ টাকা, থাকবে স্পনসরদের সাহায্য
প্রথমবার পুজো হলেও বাজেট খুব বড় রাখা হয়নি। প্রাথমিকভাবে সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজো সম্পন্ন করার জন্য প্রায় দেড় লক্ষ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে সরাসরি এই বিপুল অর্থ ব্যয় করার বদলে বিভিন্ন সরবরাহকারী সংস্থার আর্থিক সহযোগিতা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা বছর বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ করে এমন সংস্থাগুলির কাছ থেকেই মূলত স্পনসরশিপ বা আর্থিক সহযোগিতা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট কমিটিও গঠন করা হয়েছে। পুজোর যাবতীয় আয়োজন সেই কমিটির তত্ত্বাবধানেই এগোচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পিজি কাউন্সিলের সচিব দিগন্ত বিশ্বাসকে পুজো কমিটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে পুজোর প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
### উপাচার্যের বক্তব্যে স্পষ্ট আর্থিক অবস্থান
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অর্ণব সেন জানিয়েছেন, উৎসব উদযাপন কমিটির তহবিলের মাধ্যমে এবার ক্যাম্পাসে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বড় আকারে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। সেই তুলনায় রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বছরের পুজো তুলনামূলক কম বাজেটে আয়োজন করা হচ্ছে।
স্পনসরদের আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমেই প্রথমবারের পুজোর খরচ সামলানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক তহবিল থেকে সরাসরি পুজোর ব্যয়ভার বহন করা হবে না বলেও উপাচার্য স্পষ্ট করেছেন।
এর ফলে প্রথমবারের পুজো হলেও আয়োজনে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে পুজোর পরিধি বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত এবং পুজোকে ঘিরে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণের উপর।
### উত্তরবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পুজোর ঐতিহ্য
উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে দুর্গাপুজোর সঙ্গে দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেখানে প্রায় পাঁচ দশক ধরে বড় আকারে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার প্রথমবার দেবী দুর্গার আগমন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানকার অন্যান্য পুজো ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। সেই ধারাতেই এবার দুর্গাপুজো যুক্ত হচ্ছে। ফলে আগামী দিনে এই পুজোও বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্যালেন্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে প্রথমবারের দুর্গাপুজো নিয়ে যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তা থেকেই বোঝা যাচ্ছে অনুষ্ঠানটি ঘিরে প্রত্যাশা যথেষ্ট। দেবীর বোধন থেকে শুরু করে অষ্টমীর কুমারী পুজো এবং প্রসাদ বিতরণ—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসে কয়েকদিন ধরে উৎসবের আবহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের দুর্গাপুজো রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিছক আর পাঁচটা পুজোর মতো নয়। এটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে প্রথম দুর্গোৎসব। সীমিত বাজেট, স্পনসরদের সহযোগিতা এবং সনাতনী রীতি মেনে আয়োজন—এই তিনের সমন্বয়ে এবার উত্তরবঙ্গের এই বিশ্ববিদ্যালয়েও শোনা যাবে পুজোর ঢাকের আওয়াজ। দেবী উমার আগমনকে কেন্দ্র করে নতুন ক্যাম্পাসে যে উৎসবের সূচনা হচ্ছে, আগামী বছরগুলিতে সেটিই হয়তো রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যে পরিণত হবে।


