বেঙ্গালুরুতে ঋণের টাকা এবং সুদ পরিশোধ করতে না পারাকে কেন্দ্র করে এক তরুণীকে অপহরণ, আটকে রাখা এবং শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগ, পাওনা টাকা আদায়ের নামে ওই মহিলাকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয়, তাঁর ভিডিও করা হয় এবং সেই ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়। ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে দু’জন মহিলা রয়েছেন। পুলিশ ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে।
ঘটনাটি বেঙ্গালুরুর চন্দ্র লেআউট থানা এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযোগকারী মহিলার বয়স প্রায় ৩০ বছর। তাঁর দাবি, প্রায় দু’বছর আগে তিনি দুই মহিলার কাছ থেকে মোট ১.৫ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিলেন। একটি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ টাকা এবং অন্যটি ৫০ হাজার টাকা। আর্থিক সমস্যার কারণে সময়মতো সুদ ও কিস্তি দিতে না পারার পর থেকেই তাঁর উপর চাপ বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ।
### দুই জায়গা থেকে ধার, বেড়ে যায় সুদের চাপ
পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, রেশমা নামে এক মহিলার কাছ থেকে ওই তরুণী প্রায় দু’বছর আগে ১ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিলেন। ওই টাকার উপর মাসিক সুদ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে প্রায় ছ’মাস ধরে তিনি কোনও সুদ দিতে পারেননি বলে অভিযোগ।
এর পাশাপাশি রেশমার পরিচিত নাজরথের কাছ থেকেও তিনি ৫০ হাজার টাকা ধার করেছিলেন। সেই ঋণের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই কিস্তিও দিতে পারেননি তিনি। আর্থিক পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাওয়ায় একসময় রেশমার ফোন নম্বর ব্লক করে অন্যত্র চলে যান ওই মহিলা।
এরপরই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। নাজরথ ওই মহিলাকে ফোন করে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন। সেই প্রস্তাবে বিশ্বাস করে তিনি নাজরথের বাড়িতে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায় বলে তাঁর অভিযোগ।
### কাজের টোপ দিয়ে ডেকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই মহিলা তাঁর ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নাজরথের বাড়িতে পৌঁছন। সেখানে রেশমা এবং তাঁর স্বামী সুহেলও উপস্থিত ছিলেন। এরপর তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। এমনকী ছুরি দেখিয়ে ভয় দেখানো এবং তাঁর মোবাইল ফোন নষ্ট করার অভিযোগও উঠেছে।
এরপর তাঁকে জোর করে একটি অটোরিকশায় তুলে বেঙ্গালুরুর উপকণ্ঠে কুম্বালগোডুর কাছে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ। সেখানে তাঁকে আটকে রাখা হয়। তাঁর কাছ থেকে মোট ১১ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। ওই টাকার মধ্যে মূল ঋণের পাশাপাশি সুদের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হল, ওই বাড়িতে মহিলাকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় এবং তাঁর ভিডিও রেকর্ড করা হয়। পরে সেই ভিডিও প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। উদ্দেশ্য ছিল, টাকা না দিলে ভিডিওটি প্রকাশ করে তাঁকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা। পুলিশ এই অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।
### ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল
অভিযোগকারিণীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে একা নয়, তাঁর নাবালক ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে শিশুটিকে তাঁর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ওই মহিলাকে আরও কিছু সময় আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এমনকি তাঁকে যৌনপেশায় নামানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, পুরো ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
### আইনজীবীর কাছে নিয়ে গিয়ে নথিতে সই করানোর অভিযোগ
ঘটনার আরও একটি চাঞ্চল্যকর দিক সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট ওই মহিলাকে বেঙ্গালুরুর সিটি মার্কেট এলাকার কাছে এক আইনজীবীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে কিছু নথিতে সই করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
এর মধ্যে ঠিক কী ধরনের নথি ছিল এবং কেন তাঁকে সই করানো হয়েছিল, তা এখনও তদন্তাধীন। পুলিশ এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে এত বড় অপরাধের ঘটনায় পরিণত হল, সেটিও তদন্তকারীদের অন্যতম প্রশ্ন।
### মায়ের অভিযোগেই উদ্ধার
এদিকে মেয়ের কোনও খোঁজ না পেয়ে তাঁর মা পুলিশের দ্বারস্থ হন। তিনি চন্দ্র লেআউট থানায় নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
তদন্তের মাধ্যমে পুলিশ শেষপর্যন্ত মহিলার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারে এবং তাঁকে উদ্ধার করে। উদ্ধার করার পর তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়। এরপরই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
বর্তমানে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ধৃতদের মধ্যে নাজরথ, রেশমা, সুহেল এবং সইফের নাম রয়েছে। যদিও ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ের কয়েকটি প্রতিবেদনে তিনজনের গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছিল এবং চতুর্থ অভিযুক্তের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্য ছিল। পরবর্তী আপডেটে চারজনের গ্রেপ্তারের তথ্য সামনে এসেছে।
### আরও কেউ জড়িত কি না, খতিয়ে দেখছে পুলিশ
এই ঘটনায় শুধু ঋণ আদায়ের পদ্ধতিই নয়, ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুদের চাপ এবং টাকা আদায়ের নামে অপরাধমূলক আচরণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ঋণ নেওয়া এবং টাকা ফেরত দিতে না পারা কোনওভাবেই কাউকে অপহরণ, আটকে রাখা, মারধর বা ব্যক্তিগত ভিডিও রেকর্ড করে ভয় দেখানোর অধিকার দেয় না।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত কি না, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগের প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। মহিলার বয়ান, সংশ্লিষ্ট স্থান এবং ডিজিটাল প্রমাণও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখা যাবে না। পুলিশ বর্তমানে গোটা ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন করে দেখছে—ঋণ নেওয়া থেকে শুরু করে কথিত অপহরণ, আটকে রাখা, নির্যাতন এবং ভিডিও করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে কী যোগসূত্র রয়েছে।
বেঙ্গালুরুর এই ঘটনা ফের দেখিয়ে দিল, ব্যক্তিগত ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ কখনও কখনও কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। টাকা-পয়সার বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়, বরং আইনি পথেই সমাধান করা প্রয়োজন। এই ঘটনায় তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে, অভিযোগগুলির কোন কোন অংশের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং ঘটনায় প্রত্যেক অভিযুক্তের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল।


