দক্ষিণ ইরানে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবার আছড়ে পড়ল এক বিয়ের আসরে। আনন্দের মুহূর্তে হঠাৎ বিস্ফোরণে তছনছ হয়ে গেল গোটা বাড়ি। ছড়িয়ে পড়ল ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা কাচ, ছিন্নভিন্ন সামগ্রী এবং মানুষের আর্তনাদ। ইরানের হরমোজগান প্রদেশের কুহেস্তাক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন এই বিস্ফোরণের ঘটনায় শিশু-সহ অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে জানা গিয়েছে। আহত হয়েছেন ৬০ জনেরও বেশি।
ঘটনাটি ঘটে ১ সেপ্টেম্বর রাতে। কুহেস্তাক হল হরমুজ প্রণালীর কাছের একটি ছোট উপকূলীয় শহর। স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি পরিবারের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছিলেন। বিয়ের মূল অনুষ্ঠান তখনও শুরু হয়নি। কনে ও বরও ঘটনাস্থলে পৌঁছননি। তার আগেই বিস্ফোরণের অভিঘাতে বদলে যায় গোটা পরিস্থিতি।
### মুহূর্তে আনন্দের অনুষ্ঠান পরিণত ধ্বংসস্তূপে
সংবাদ সংস্থা AP-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই বাড়ি ও সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১৫০ জন মহিলা ও শিশু জড়ো হয়েছিলেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী পুরুষদের অনুষ্ঠান ছিল কাছাকাছি অন্য একটি ভবনে। যে ঘরে বিস্ফোরণ ঘটে, সেখানে পরে অতিথিদের খাবার পরিবেশন করার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই বিস্ফোরণের অভিঘাতে ছাদে বড় গর্ত তৈরি হয়, দেওয়ালে ফাটল ধরে এবং জানলার কাচ ভেঙে যায়। বাড়ির উঠোনে ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা ছাদ ও ধাতব কাঠামোর অংশ।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা আরও ভয়াবহ। বিস্ফোরণের পর চারদিকে ধুলো ও ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এলাকা। বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আহতদের মধ্যে অনেক শিশু ছিল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে থাকা জুতো, বিয়ের সাজসজ্জার সামগ্রী এবং গৃহস্থালির জিনিসপত্র যেন কয়েক মুহূর্ত আগের আনন্দের পরিবেশের করুণ স্মৃতি হয়ে দাঁড়ায়।
### মৃতদের মধ্যে চার বছরের শিশুও
Reuters-এর তদন্তমূলক প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে চারজনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৪৩ বছরের Kolsoom Mollahi Najhandania, ৫০ বছরের Zarkhatoon Taheri এবং চার বছরের Amir Mohammad Karimi। এছাড়া ১৬ বছরের Mohammad Mallahi-ও প্রাণ হারান। পরবর্তী সময়ে আহতদের মধ্যে আরও একজন মহিলা হাসপাতালে মারা যান বলে AP জানিয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচ হয়েছে। আহতের সংখ্যা ৬০-এর বেশি।
এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে একটি বেসামরিক বাড়ি এমন হামলার লক্ষ্য হল? ইরান সরাসরি এই ঘটনার জন্য আমেরিকাকে দায়ী করেছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র এই হামলাকে অত্যন্ত নৃশংস বলে অভিহিত করেছেন এবং ঘটনাটিকে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই বাড়িতে কোনও সামরিক স্থাপনা ছিল না এবং সেখানে সাধারণ মানুষই উপস্থিত ছিলেন।
### আমেরিকার দাবি কী?
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট JD Vance জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। মার্কিন সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, ওই এলাকায় তারা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল এবং ঘটনার বিষয়ে পাওয়া রিপোর্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় দক্ষিণ ইরানে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সম্পদ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছিল। কুহেস্তাকের কাছেও একটি যোগাযোগ টাওয়ার ছিল, যা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়া বাড়ি থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে ছিল।
### সরাসরি মার্কিন অস্ত্রের আঘাত?
ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে Reuters-এর অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে। যাচাই করা ছবি ও ভিডিও পরীক্ষা করে কয়েকজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞের মত, বাড়িটির ছাদে যে ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছে তা কোনও লক্ষ্যবস্তু থেকে ছিটকে আসা বিস্ফোরণের টুকরোর চেয়ে সরাসরি কোনও গোলাবারুদের আঘাতের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন মনে করেছেন, সেটি সম্ভবত মার্কিন অস্ত্র হতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞ ৫০০ পাউন্ড ওজনের একটি বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া কিছু ধাতব অংশ নিয়েও বিশ্লেষণ চলছে। সেগুলির মধ্যে মার্কিন ব্যবহৃত JSOW ধরনের অস্ত্রের অংশ থাকতে পারে বলে এক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন। তবে Reuters স্পষ্ট করেছে, উদ্ধার হওয়া সব অংশ যে বিয়েবাড়িতেই ব্যবহৃত অস্ত্রের, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। AP-ও জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া অস্ত্রের অবশেষের উৎস এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়। ফলে হামলাটি ঠিক কোন অস্ত্রের আঘাতে ঘটেছে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও তদন্ত প্রয়োজন।
### শোকের শহর কুহেস্তাক
হামলার কয়েকদিন পরও কুহেস্তাকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। যে বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন ধ্বংসের চিহ্ন। ছাদের বড় অংশ ভেঙে পড়েছে, দেওয়ালে ফাটল, জানলার কাচ চূর্ণ এবং উঠোনে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাঠামো। স্থানীয়রা নিহতদের স্মরণে শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছেন। চার বছরের শিশুর ছোট কফিন ঘিরে শোকের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের বৃহত্তর মানবিক সংকটও সামনে এসেছে। কুহেস্তাক থেকে খুব বেশি দূরে নয় মিনাব শহর, যেখানে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি স্কুলে ভয়াবহ হামলায় বিপুল সংখ্যক শিশু ও শিক্ষক নিহত হয়েছিল বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। ফলে দক্ষিণ ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বিয়ের মতো সম্পূর্ণ বেসামরিক একটি অনুষ্ঠানের কাছে এমন বিস্ফোরণ ফের আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে—সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে? কুহেস্তাকের ঘটনার প্রকৃত কারণ, লক্ষ্য এবং হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র সম্পর্কে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হবে না। তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকা বিয়ের সাজসজ্জা ও শিশুদের জিনিসপত্র ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক মূল্যকে সামনে এনে দিয়েছে।


