যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে শুরু হল রাজনৈতিক তরজা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঋষি অরবিন্দের নামে করার প্রস্তাব দিয়েছেন যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। সেই প্রস্তাবের পালটা দিতে গিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ করলেন সিপিএম নেতা তথা এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। তাঁর কটাক্ষ, ঋষি অরবিন্দের নামে নয়, বরং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম **নাথুরাম গডসের নামে** করা হোক। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক নিয়েও বিতর্কিত প্রস্তাব দেন তিনি। গোটা ঘটনা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন মঞ্চে একটি বেদপাঠ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। সেখানেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার পিছনে ঋষি অরবিন্দের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই ইতিহাস এবং তাঁর আদর্শকে সম্মান জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঋষি অরবিন্দের নামে করার বিষয়ে ভাবা উচিত।
শর্বরীর এই বক্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় আলোচনা। কারণ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শুধু রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, দীর্ঘদিন ধরেই এটি ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সাংস্কৃতিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে।
### শর্বরীর প্রস্তাবের পালটা সৃজনের
বিজেপি বিধায়কের প্রস্তাবের পরেই পালটা আক্রমণের পথে হাঁটেন সৃজন ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল ব্যঙ্গের সুর। তিনি বলেন, বিজেপি বিভিন্ন জায়গায় নাম পরিবর্তনের যে রাজনীতি করছে, তার পিছনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। সেই যুক্তি থেকেই শর্বরীর প্রস্তাবকে ব্যঙ্গ করে গডসের নাম সামনে আনেন তিনি।
সৃজনের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি নাম পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে, তাহলে ঋষি অরবিন্দের বদলে নাথুরাম গডসের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হোক। শুধু নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবেই থামেননি তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক পরিবর্তনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন সিপিএমের এই তরুণ নেতা।
বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকে রয়েছে নন্দলাল বসুর তৈরি ‘জ্ঞানশিখা’-র প্রতীক। সৃজন ব্যঙ্গ করে বলেন, সেই প্রতীকও বদলে অন্য একটি প্রতীক ব্যবহার করা যেতে পারে। তাঁর বক্তব্যে বিনায়ক দামোদর সাভারকারের প্রসঙ্গও উঠে আসে। একইসঙ্গে শর্বরী মুখোপাধ্যায়কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করার কথাও ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন তিনি।
### কেন অরবিন্দের নাম নিয়ে বিতর্ক?
শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিলেন ঋষি অরবিন্দ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অরবিন্দ ঘোষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেকে আধ্যাত্মিক চিন্তার দিকে বড় পরিবর্তন ঘটে।
শর্বরীর যুক্তি ছিল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বিকাশের সঙ্গে অরবিন্দের ভাবধারা এবং ভূমিকার সম্পর্ক রয়েছে। তাই তাঁর নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হলে তা ইতিহাসকে সম্মান জানানোর একটি পদক্ষেপ হবে। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে তিনি তথাকথিত ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’র বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান।
তবে সৃজনের বক্তব্য, অরবিন্দের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম ব্যবহার করে বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সংশয় রয়েছে। সেই বক্তব্যের সূত্র ধরেই গডসের নাম এনে পালটা ব্যঙ্গ করেন তিনি।
### যাদবপুরকে ঘিরে পুরনো রাজনৈতিক সংঘাত
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বিজেপি ও বামপন্থী সংগঠনগুলির মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়েও ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছে। এসএফআই, এবিভিপি-সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের অবস্থান ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহেও বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ‘আজাদি’ স্লোগান, ক্যাম্পাসের দেওয়ালে রাজনৈতিক গ্রাফিতি এবং তা মুছে ফেলার উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যাদবপুরে এই ধরনের স্লোগান নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়াল থেকে কিছু গ্রাফিতি মুছে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পালটা ছাত্রদের একাংশ ‘Reclaim the Wall’ কর্মসূচির ডাক দেয়।
এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে নামবদলের প্রশ্নটি শুধু প্রশাসনিক বা ঐতিহাসিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা সরাসরি রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতের অংশ হয়ে উঠছে।
### বিজেপি বনাম বাম—নতুন ইস্যুতে পুরনো লড়াই
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে বিজেপি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই ক্যাম্পাসে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, প্রতীক, ছাত্র রাজনীতি এবং ‘জাতীয়তাবাদ’-এর ব্যাখ্যা—সবকিছু নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
শর্বরীর নামবদলের প্রস্তাব এবং সৃজনের গডসের পালটা প্রস্তাব সেই মতাদর্শগত সংঘাতকেই আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে গডসের নাম উল্লেখ করায় বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সৃজনের বক্তব্যকে বাস্তব নাম পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্যের ধরন এবং প্রেক্ষাপট থেকেই স্পষ্ট যে এটি মূলত শর্বরীর প্রস্তাবকে ব্যঙ্গ করে দেওয়া রাজনৈতিক পালটা বক্তব্য। অন্যদিকে শর্বরীও তাঁর বক্তব্যে নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক যুক্তির ভিত্তিতে।
### এখন নজর নামবদলের বিতর্কে
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আদৌ পরিবর্তন করা হবে কি না, তা এখনই বলার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের প্রস্তাব এবং সৃজন ভট্টাচার্যের পালটা কটাক্ষের পর বিষয়টি যে রাজ্য রাজনীতির আলোচনায় আরও কিছুদিন থাকবে, তা বলাই যায়।
একদিকে ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে ঋষি অরবিন্দের নাম করার দাবি, অন্যদিকে সেই দাবিকে ব্যঙ্গ করে নাথুরাম গডসের নাম সামনে আনা—যাদবপুরকে ঘিরে বিজেপি ও বামেদের আদর্শগত সংঘাত যে নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এই বিতর্ক তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার, নাম পরিবর্তনের দাবি নিয়ে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক স্তরে পরবর্তী সময়ে কোনও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ হয় কি না।


