তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে এনসিপিআইয়ে যোগ দেওয়ার পর প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করলেন বারাসতের সাংসদ ডা. কাকলি ঘোষ দস্তিদার। শুক্রবার রাখিবন্ধন উপলক্ষে বারাসত জেলা পরিষদের প্রেক্ষাগৃহে নিজের কোচিং সেন্টারের কৃতী পড়ুয়াদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। সেখান থেকেই তৃণমূল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একের পর এক মন্তব্য করেন কাকলি।
তৃণমূলের বহুল ব্যবহৃত ‘খেলা হবে’ স্লোগানকে কটাক্ষ করে কাকলি বলেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার মানুষ ‘বল মাঠের বাইরে পাঠিয়ে খেলা শেষ করে দিয়েছেন’। দলত্যাগের পর তাঁর প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচিতেই এমন আক্রমণকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে।
## চার দশকের সম্পর্ক, তবু কেন দল ছাড়লেন কাকলি?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথাও এদিন তুলে ধরেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নেত্রী ছিলেন। কিন্তু গত পাঁচ-সাত বছরে মমতার আচরণে তিনি মর্মাহত হয়েছেন। সেই কারণেই দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান বারাসতের সাংসদ।
মমতার সম্পর্কে কাকলির মন্তব্য, তাঁর ‘অধঃপতন হয়েছে’। দল ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই বক্তব্যই এখন রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
## ‘খেলা হবে’ স্লোগান নিয়েও কটাক্ষ
তৃণমূলের ‘খেলা হবে’ স্লোগান নিয়েও কটাক্ষ করেন কাকলি।
তিনি দাবি করেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার মানুষই বল মাঠের বাইরে পাঠিয়ে খেলা শেষ করে দিয়েছেন। তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরাসরি তৃণমূলের নির্বাচনী স্লোগানকে পালটা আক্রমণ করেন।
দলত্যাগের পর প্রথম প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ায় কাকলি যে তাঁর নতুন রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে চাইছেন, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
## ফের তৃণমূলে ফিরবেন? কী বললেন কাকলি
দলত্যাগীদের উদ্দেশে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া বার্তার প্রসঙ্গও এদিন ওঠে।
তবে কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে জানান, তিনি বাংলার মানুষের রায়কে মেনে স্বেচ্ছায় দল ছেড়েছেন। তাই ফের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করার কোনও প্রশ্নই নেই বলে জানান তিনি।
অর্থাৎ, আপাতত তৃণমূলে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছেন বারাসতের সাংসদ।
## দলত্যাগ-বিরোধী আইন নিয়ে কী বললেন?
দলত্যাগের পর তাঁর বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে নোটিসের বিষয়টিও সামনে আসে।
এই প্রসঙ্গে কাকলি জানান, বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। লোকসভার স্পিকারের নির্দেশ অনুযায়ী তিনি যথাসময়ে যুক্তি-সহ জবাব দেবেন।
অর্থাৎ, এই আইনি প্রক্রিয়াতেও তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
## বালি, সোনা ও কয়লা পাচার নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর রাজনৈতিক অভিযোগ তোলেন কাকলি।
তাঁর বক্তব্য, এর আগে পশ্চিমবঙ্গে বালি, সোনা ও কয়লা পাচারের মতো বিষয় তিনি দেখেননি। তাঁর দাবি, এই কারণেই তৃণমূলে ‘ধস’ নেমেছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ধসের চূড়ায় বসে রয়েছেন।
তবে এগুলি কাকলি ঘোষ দস্তিদারের রাজনৈতিক অভিযোগ ও মন্তব্য—এই দাবিগুলির সত্যতা সম্পর্কে প্রতিবেদনে কোনও স্বাধীন প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
## এনসিপিআইয়ে যোগ দেওয়ার পর নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়
তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইয়ে যোগ দেওয়ার পর কাকলির রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে।
দীর্ঘদিন তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর দল ছেড়ে প্রকাশ্য মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হওয়া তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বারাসতের সাংসদ হিসেবে তাঁর এই অবস্থান আগামী দিনে উত্তর ২৪ পরগনা এবং রাজ্যের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
## বারাসতের রাজনীতিতে বাড়বে নজর
কাকলি ঘোষ দস্তিদার বারাসত লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ। ফলে তাঁর দলবদলের রাজনৈতিক প্রভাব শুধুমাত্র রাজ্যস্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বারাসত এবং আশপাশের এলাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে দলত্যাগের পর তাঁর সঙ্গে স্থানীয় স্তরে কতজন নেতা-কর্মী থাকছেন এবং নতুন রাজনৈতিক সংগঠনে তাঁর ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও নজর রয়েছে।
বিশেষ করে তৃণমূল ছাড়ার পর তাঁর প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যে মমতার বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
## মমতার সঙ্গে চার দশকের সম্পর্কের পর তীব্র আক্রমণ
কাকলির বক্তব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, দীর্ঘ প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক সম্পর্কের পরও তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এতটা তীব্র অবস্থান নিয়েছেন।
একসময় যাঁকে নিজের নেত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন মেনে চলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধেই এখন ‘অধঃপতন’-এর অভিযোগ তুলছেন কাকলি।
তাই তাঁর দলত্যাগকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলবদল হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। এর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে।
## তৃণমূলের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণের ইঙ্গিত?
শুক্রবারের অনুষ্ঠানে কাকলির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দলত্যাগের পর তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারেন।
বিশেষ করে ‘খেলা হবে’ স্লোগান, মমতার নেতৃত্ব এবং বালি-সোনা-কয়লা পাচার নিয়ে তাঁর মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
আগামী দিনে এনসিপিআইয়ের মঞ্চ থেকে তিনি আরও কী বলেন এবং তৃণমূল তাঁর মন্তব্যের কী জবাব দেয়, সেদিকেও নজর থাকবে।
## তৃণমূলের পালটা প্রতিক্রিয়া কী হবে?
কাকলির মন্তব্যের পর তৃণমূলের তরফে পালটা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে চার দশকের সম্পর্কের পর দলত্যাগ এবং এখন প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে মন্তব্য—এই বিষয়টি তৃণমূল নেতৃত্ব কীভাবে ব্যাখ্যা করে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দলত্যাগীদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া বার্তা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে কাকলির মন্তব্য রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়াতে পারে।
## সামনে কী?
কাকলি ঘোষ দস্তিদার এখন এনসিপিআইয়ের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক পর্ব শুরু করেছেন। দলত্যাগ-বিরোধী আইনের নোটিসের বিষয়টি যেমন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, তেমনই রাজনৈতিকভাবেও তাঁর সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখা, নতুন দলের সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং বারাসত এলাকায় নিজের প্রভাব বজায় রাখা—সবই এখন তাঁর সামনে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে তৃণমূলও তাঁর দলত্যাগের রাজনৈতিক প্রভাব সামাল দিতে চাইবে।
## শেষ কথা
তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইয়ে যোগ দেওয়ার পর প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। চার দশকের রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে তিনি দাবি করেছেন, গত কয়েক বছরে মমতার আচরণে তিনি মর্মাহত হয়েছেন এবং সেই কারণেই দল ছেড়েছেন।
একইসঙ্গে ‘খেলা হবে’ স্লোগানকে কটাক্ষ করার পাশাপাশি বালি, সোনা ও কয়লা পাচার নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তৃণমূলে ফেরার সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন কাকলি।
দলত্যাগের পর তাঁর এই প্রথম বড় রাজনৈতিক বক্তব্য আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান কোন দিকে যায়, সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছে।


