মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পরপর সদ্যোজাতের মৃত্যুর ঘটনায় এবার নড়েচড়ে বসল রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। মাত্র তিন সপ্তাহে ৬০ জন নবজাতকের মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্যভবন। শনিবারই চার সদস্যের এই কমিটি মালদহ মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে তদন্ত শুরু করার কথা।
একই দিনে ১০টি শিশুর মৃত্যু ঘিরে ইতিমধ্যেই ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চাওয়ার পর এবার সরাসরি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তদন্ত করানোর সিদ্ধান্ত নিল স্বাস্থ্য দপ্তর।
## চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন
স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে শুক্রবার জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে চিকিৎসক প্রলয় আচার্যকে।
কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক-অধ্যাপক রাজশেখর সরকার ও ভোলানাথ আইচ এবং এসএসকেএম হাসপাতালের চিকিৎসক-অধ্যাপক বিজন সাহা।
শনিবার সকালেই চার সদস্যের কমিটি মালদহ মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে তদন্ত শুরু করতে পারে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
## তিন সপ্তাহে ৬০ নবজাতকের মৃত্যু
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত মালদহ মেডিক্যাল কলেজে মোট ৬০ জন সদ্যোজাতের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য দপ্তরের নজরে এসেছে।
এর মধ্যে আগস্ট মাসের একটি দিনেই ১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়। একসঙ্গে এতগুলি নবজাতকের মৃত্যু সামনে আসতেই হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
তবে শুধুমাত্র মৃত্যুর সংখ্যা দেখেই চিকিৎসায় গাফিলতি হয়েছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞ কমিটির তদন্তেই মৃত্যুগুলির প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনও ঘাটতি ছিল কি না, তা স্পষ্ট হওয়ার কথা।
## একদিনে ১০ শিশুর মৃত্যুতে চাঞ্চল্য
আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে একই দিনে ১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় হাসপাতাল চত্বরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, মৃত শিশুদের একটি বড় অংশকে অন্য হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মালদহ মেডিক্যাল কলেজে রেফার করা হয়েছিল। ফলে ওই শিশুদের শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসার সময়কালও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
## হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কী দাবি?
মালদহ মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, একদিনে মৃত ১০ শিশুর মধ্যে আটজনের জন্ম মালদহ মেডিক্যাল কলেজে হয়নি। তাঁদের জেলার অন্য হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় এখানে রেফার করা হয়েছিল।
মাত্র দু’জন শিশুর জন্ম মালদহ মেডিক্যাল কলেজেই হয়েছিল বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এই তথ্যের ফলে প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর আগে কোথায় চিকিৎসা হয়েছিল, কী অবস্থায় তাদের মালদহ মেডিক্যালে আনা হয়েছিল এবং হাসপাতালে আসার পর কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
## ৬০ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের জন্ম মালদহ মেডিক্যালে
স্বাস্থ্য দপ্তরের নজরে আসা তথ্য অনুযায়ী, তিন সপ্তাহে মৃত ৬০ জন নবজাতকের মধ্যে ১৬ জনের জন্ম হয়েছিল মালদহ মেডিক্যাল কলেজেই।
বাকি শিশুদের একটি অংশ অন্য হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সংকটজনক অবস্থায় রেফার হয়ে এসেছিল। ফলে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি শিশুর চিকিৎসার ইতিহাস আলাদাভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন হতে পারে।
## স্বাস্থ্য দপ্তর কেন তদন্তে নামল?
একটি সরকারি হাসপাতালে অল্প সময়ের মধ্যে এত সংখ্যক নবজাতকের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য প্রশাসনের নজর কেড়েছে। বিশেষ করে একই দিনে ১০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু হয়।
প্রথমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চাওয়া হয়। এরপর আরও বিস্তারিত তথ্য ও পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে মৃত্যুর পেছনে রোগের প্রকৃতি, শিশুদের শারীরিক অবস্থা, রেফারেল ব্যবস্থা, চিকিৎসা পরিকাঠামো এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখা হতে পারে।
## চিকিৎসায় গাফিলতি হয়েছিল কি?
এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতগুলি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেই চিকিৎসকদের গাফিলতি ছিল—এমন সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া যাচ্ছে না।
প্রাথমিক রিপোর্টে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে তীব্র শ্বাসকষ্ট, জন্ডিস এবং হৃদযন্ত্র সংক্রান্ত জটিলতার মতো সমস্যার কথা উঠে এসেছে। তবে প্রতিটি মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানতে বিশেষজ্ঞদের বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।
তদন্ত কমিটির রিপোর্টেই পরিষ্কার হতে পারে, মৃত্যুগুলি মূলত শিশুদের গুরুতর অসুস্থতার কারণে হয়েছে, নাকি চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনও ঘাটতি বা অন্য কোনও কারণ এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
## রেফার হওয়া শিশুদের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ
মালদহ মেডিক্যাল কলেজ উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। গুরুতর অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে বহু রোগী এখানে রেফার করা হয়।
নবজাতকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের রেফারেল হয়ে থাকলে তাঁদের হাসপাতালে পৌঁছনোর সময় শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, কত দেরিতে তাঁদের আনা হয়েছিল এবং আগে কী চিকিৎসা হয়েছিল—এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞ কমিটি এই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখতে পারে।
## পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চেয়েছিল স্বাস্থ্যভবন
একদিনে ১০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বৃহস্পতিবার মালদহ মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল।
হাসপাতালের তরফে প্রাথমিক রিপোর্ট পাঠানো হয়েছিল এবং বিস্তারিত তথ্য-সহ পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এরপরই স্বাস্থ্য দপ্তর আরও এক ধাপ এগিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে।
## তদন্তে কী কী বিষয় উঠে আসতে পারে?
বিশেষজ্ঞ কমিটির তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে—
* মৃত শিশুদের শারীরিক অবস্থা ও রোগের ইতিহাস
* হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় তাঁদের অবস্থা
* অন্য হাসপাতাল থেকে রেফারের কারণ
* জন্মের সময় কোনও জটিলতা হয়েছিল কি না
* NICU ও নবজাতক চিকিৎসা পরিষেবার পরিস্থিতি
* চিকিৎসক ও নার্সিং কর্মীর পর্যাপ্ততা
* প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের availability
* প্রতিটি মৃত্যুর মেডিক্যাল রেকর্ড
এই তথ্যগুলি বিশ্লেষণ করেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা হবে।
## মালদহ মেডিক্যাল কলেজের গুরুত্ব
মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিচালিত একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয় এবং উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে এটি কাজ করছে।
মালদহের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকার গুরুতর রোগীদেরও এখানে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। ফলে হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু চিকিৎসা পরিষেবার উপর বহু পরিবারের নির্ভরতা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
## পরিবারের উদ্বেগও স্বাভাবিক
নবজাতকের মৃত্যু যে কোনও পরিবারের কাছে ভয়াবহ আঘাত। একসঙ্গে একাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসায় স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সামনে এলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
## রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু
ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। বিরোধীদের একাংশ স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে মৃত্যুর জন্য নির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করা ঠিক হবে না। স্বাস্থ্য দপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টই এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
## এখন নজর তদন্ত রিপোর্টে
চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি মালদহ মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে নথি, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বক্তব্য খতিয়ে দেখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তদন্তে যদি কোনও গাফিলতি বা পরিকাঠামোগত সমস্যা ধরা পড়ে, তাহলে স্বাস্থ্য দপ্তর পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে। আবার যদি দেখা যায় অধিকাংশ শিশুই হাসপাতালে আসার আগেই অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় ছিল, তাহলেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
## শেষ কথা
তিন সপ্তাহে ৬০ জন সদ্যোজাতের মৃত্যু এবং একদিনে ১০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা মালদহ মেডিক্যাল কলেজকে ঘিরে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য দপ্তর ইতিমধ্যেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট চেয়েছে এবং এবার চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে সরেজমিন তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হলেও এর ভিত্তিতে চিকিৎসায় গাফিলতির চূড়ান্ত অভিযোগ করা যাচ্ছে না। বহু শিশুকে অন্য হাসপাতাল বা নার্সিংহোম থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রেফার করা হয়েছিল বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এখন বিশেষজ্ঞ কমিটির তদন্ত রিপোর্টই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই রিপোর্টে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনও ঘাটতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন—তার উত্তর মিলতে পারে।


