রাখিবন্ধনের দিনে ভাইয়ের হাতে রাখি পরানোর কথা ছিল। কিন্তু সেই আনন্দের দিনই সোনারপুরে নেমে এল শোকের ছায়া। মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো দাদা সাগ্নিক সেনের নিথর হাতে ময়নাতদন্তের আগে শেষবারের মতো রাখি পরালেন তাঁর বোন। সোনারপুর থানায় উপস্থিত মানুষজনের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য সকলকেই আবেগপ্রবণ করে তোলে।
## দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল দুই যুবকের
বুধবার রাতে সোনারপুরের চৌহাটি সংলগ্ন এলাকায় ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনাটি ঘটে। বারুইপুর থেকে যাদবপুরের দিকে ফিরছিলেন পাঁচ যুবক। একটি গাড়িতে করে ফেরার সময় চৌহাটির কাছে একটি স্কুলের সামনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি প্রথমে রাস্তার পাশের গাছে ধাক্কা মারে। এরপর পাঁচিলেও ধাক্কা লাগে। দুর্ঘটনার অভিঘাতে গাড়িটি কার্যত দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় **সাগ্নিক সেন (২১)** এবং **শৌনক ভট্টাচার্য (২২)**-এর। দু’জনেই যাদবপুরের বাসিন্দা। গাড়িতে থাকা বাকি তিন যুবকও গুরুতর আহত হন। তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত ও মৃতদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বলে জানা গিয়েছে।
## জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে বিপদ
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে পাঁচ যুবক বারুইপুরে একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ভোরের দিকে গাড়িতে করে কামালগাজির দিকে ফিরছিলেন তাঁরা।
চৌহাটির কাছে আচমকাই নিয়ন্ত্রণ হারায় গাড়িটি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গাড়িটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলছিল। পুলিশও প্রাথমিক তদন্তে গাড়িটির গতি ঘণ্টায় **কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার** ছিল বলে জানতে পেরেছে।
## অতিরিক্ত গতিই কি দুর্ঘটনার কারণ?
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে সোনারপুর থানার পুলিশ। প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত গতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
পুলিশ খতিয়ে দেখছে, দুর্ঘটনার সময় গাড়ির চালক বা অন্য সওয়ারিরা মদ্যপ ছিলেন কি না। পাশাপাশি গাড়ি চালানোর সময় চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
## রাখির দিনেই এল মর্মান্তিক খবর
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সোনারপুর থানায় পৌঁছন। এদিকে বৃহস্পতিবার ছিল রাখিবন্ধনের দিন। যে দিনে দাদার হাতে রাখি পরিয়ে ভাই-বোনের সম্পর্ক উদযাপন করার কথা, সেই দিনেই সাগ্নিকের পরিবারকে দেখতে হল তাঁর নিথর দেহ।
শুক্রবার দুপুরে দেহ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়ার আগে ঘটে যায় হৃদয়বিদারক মুহূর্তটি। দাদার হাতে শেষবারের মতো রাখি পরিয়ে দেন তাঁর বোন।
## ‘শেষ রাখি পরিয়ে দিলাম…’
দাদার নিথর হাতে রাখি পরাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাগ্নিকের বোন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর মুখে শোনা যায়, **“শেষ রাখি পরিয়ে দিলাম। আর কোনওদিন রাখি পরাতে পারব না তোকে!”**
এই দৃশ্য দেখে থানায় উপস্থিত বহু মানুষও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। উৎসবের দিনে ভাইকে হারানোর যন্ত্রণা এবং শেষবারের মতো রাখি পরানোর সেই মুহূর্ত পরিবারের কাছে এক গভীর শোকের স্মৃতি হয়ে রইল।
## মাত্র কয়েক সেকেন্ডে তছনছ গাড়ি
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বোঝা যায় গাড়িটির অবস্থা দেখেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গাছ ও পাঁচিলে পরপর ধাক্কা লাগার পর গাড়ির সামনের এবং পিছনের অংশ দুমড়ে যায়। এমনকি গাড়ির টায়ারও খুলে যায়।
একটি মুহূর্তের নিয়ন্ত্রণ হারানোই পাঁচটি পরিবারের জীবনে নিয়ে এল ভয়াবহ পরিবর্তন।
## বাকি তিন যুবক হাসপাতালে
দুর্ঘটনায় সাগ্নিক ও শৌনকের মৃত্যু হলেও গাড়িতে থাকা আরও তিনজন প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। তবে তাঁদের আঘাত গুরুতর। দুর্ঘটনার পর তাঁদের উদ্ধার করে **এম আর বাঙুর হাসপাতালে** নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের চিকিৎসা চলছে।
তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতি এবং দুর্ঘটনার সময় গাড়ির ভিতরে ঠিক কী ঘটেছিল, তদন্তে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## তদন্তে সোনারপুর থানার পুলিশ
দুর্ঘটনার পর সোনারপুর থানার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। গাড়িটির গতি, চালকের ভূমিকা এবং দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের পরিস্থিতি—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের তদন্তে যদি চালকের বেপরোয়া গতি বা অন্য কোনও কারণ নিশ্চিত হয়, তাহলে সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
## তরুণদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো নিয়ে ফের প্রশ্ন
এই দুর্ঘটনা ফের সামনে এনে দিল তরুণদের দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর ঝুঁকির বিষয়টি। রাতের রাস্তায় উচ্চগতিতে গাড়ি চালানো, চালকের শারীরিক অবস্থার দিকে নজর না দেওয়া বা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো—যে কোনও একটি ভুলই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
সোনারপুরের এই ঘটনা বিশেষভাবে মর্মান্তিক, কারণ একই গাড়িতে থাকা পাঁচ তরুণের মধ্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দুর্ঘটনায় দু’জনের মৃত্যু এবং তিনজনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
## রাখির আনন্দ বদলে গেল কান্নায়
রাখিবন্ধন সাধারণত ভাই-বোনের ভালোবাসা, স্নেহ এবং নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সাগ্নিকের পরিবারের কাছে এবারের রাখি হয়ে রইল এক চিরস্থায়ী বেদনার স্মৃতি।
যে হাতে জীবিত অবস্থায় রাখি পরানোর কথা ছিল, সেই হাতেই শেষবারের মতো রাখি পরিয়ে দাদাকে বিদায় জানালেন বোন। ময়নাতদন্তে যাওয়ার আগে সেই কয়েক মুহূর্তের দৃশ্যই সোনারপুর থানায় উপস্থিত সকলের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
## শেষ কথা
সোনারপুরের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল, **রাস্তায় সামান্য অসতর্কতাও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।** বারুইপুর থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন দুই তরুণ সাগ্নিক সেন ও শৌনক ভট্টাচার্য। গুরুতর আহত আরও তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তবে দুর্ঘটনার সমস্ত কারণ এখনও তদন্তাধীন। অতিরিক্ত গতি, চালকের শারীরিক অবস্থা এবং দুর্ঘটনার অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এই শোকের মধ্যেই সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হয়ে রইল সাগ্নিকের বোনের শেষ রাখি—**ভাইয়ের জীবনের শেষ রাখি, আর কখনও যার পুনরাবৃত্তি হবে না।**


