ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ফের চরমে পৌঁছেছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিলেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই। লেবাননের আল-মায়াদিন/আল-মানার সম্প্রচারে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, **“আমরা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নরকে পাঠাব।”** একইসঙ্গে তাঁর দাবি, নেতানিয়াহুর পদক্ষেপই ইজরায়েলি সরকারের অস্তিত্বের অবসানকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে।
রেজাইয়ের এই মন্তব্য এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন আমেরিকার সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাতও নতুন করে তীব্র হচ্ছে। ইরানের এই শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন, অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাত আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
## নেতানিয়াহুকে সরাসরি হুঁশিয়ারি
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্যে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সরাসরি আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
রেজাই বলেন, ইরান নেতানিয়াহুকে ‘নরকে পাঠাবে’ এবং তাঁর কথায়, নেতানিয়াহুর ‘বড় ভুল’ ইজরায়েলি সরকারের অস্তিত্বের অবসানকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে।
তাঁর এই মন্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলেও এর গুরুত্ব রয়েছে, কারণ রেজাই ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। ফলে তাঁর বক্তব্য তেহরানের বর্তমান অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
## নতুন করে যুদ্ধ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে?
রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, ইজরায়েলের সঙ্গে ফের সংঘর্ষ শুরু হলে সেটি আগের সংঘর্ষগুলির মতো হবে না। তাঁর দাবি, ইরান ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য নতুন পর্যায়ের সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বিশেষ করে লেবাননের পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছেন। বৈরুত এবং দাহিয়েহ এলাকাকে ইরানের ‘রেড লাইন’ বলে উল্লেখ করে রেজাই জানিয়েছেন, ওই এলাকাগুলির দিকে কোনও পক্ষ এগোলে তেহরান বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে।
## আমেরিকাকেও কড়া হুঁশিয়ারি
শুধু ইজরায়েল নয়, আমেরিকার বিরুদ্ধেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন রেজাই।
ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ বা অবরোধ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকা যদি অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকে, তাহলে ইরান পালটা ব্যবস্থা নিতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থকে লক্ষ্য করা হতে পারে।
রেজাইয়ের দাবি, সামরিক চাপ থেকে অর্থনৈতিক চাপের দিকে আমেরিকার সরে আসা দেখিয়ে দিচ্ছে যে আগের সামরিক পদক্ষেপগুলি কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তবে এগুলি ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য—এর সত্যতা বা ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
## ‘অবরোধ চললে ভয়াবহ সংঘাত’
রেজাই আরও বলেন, ইরানের ওপর অবরোধ বা ‘siege’ অব্যাহত থাকলে আমেরিকার সঙ্গে একটি **‘severe confrontation’ বা ভয়াবহ সংঘাত** তৈরি হতে পারে।
তিনি দাবি করেছেন, অবরোধের মধ্যেও যুদ্ধবিরতির সময় ইরান বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর দাবি, সেই সময় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানটি ইরানি কর্মকর্তার দাবি হিসেবে সামনে এসেছে।
## নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আর কী অভিযোগ?
সাক্ষাৎকারে রেজাই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, ইরান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ব্যারন ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে—এমন খবর নেতানিয়াহু ছড়িয়েছেন।
রেজাই এই অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের তথ্য ছড়িয়ে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ভয় দেখাতে এবং তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে চেয়েছেন।
তবে এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনও স্বাধীন প্রমাণ সামনে এসেছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই রেজাইয়ের বক্তব্যকে ইরানের সরকারি অবস্থান বা অভিযোগ হিসেবে দেখা উচিত, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে নয়।
## ব্যারন ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্ক কী?
ব্যারন ট্রাম্পকে ঘিরে একটি ভিডিও ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হওয়ার পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে। ওই ভিডিওতে তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং তাঁকে হত্যার জন্য অর্থ পুরস্কারের মতো দাবি করা হয়েছিল।
মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস ওই ভিডিও সম্পর্কে অবগত ছিল এবং সুরক্ষাধীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলি তারা তদন্ত করে থাকে বলে জানানো হয়েছে। তবে কোনও বাস্তব হত্যার ষড়যন্ত্রের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
## ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের আবহে নতুন উত্তেজনা
ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বৈরিতা রয়েছে। সামরিক সংঘর্ষ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, পালটা হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রগোষ্ঠীগুলির ভূমিকা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।
এই পরিস্থিতিতে রেজাইয়ের বক্তব্য নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে যে দুই দেশের মধ্যে ফের বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হতে পারে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হলে তা আগের সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি হবে না।
## লেবানন নিয়েও কড়া অবস্থান তেহরানের
রেজাইয়ের বক্তব্যে লেবাননের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর দাবি, বৈরুত এবং দক্ষিণ বৈরুতের দাহিয়েহ অঞ্চল ইরানের ‘রেড লাইন’।
তিনি সতর্ক করেছেন, এই এলাকাগুলিতে পরিস্থিতির কোনও বড় পরিবর্তন হলে ইরান তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইজরায়েলকে শেষ পর্যন্ত লেবাননের দখলকৃত এলাকা থেকে সরে যেতে হবে।
এই মন্তব্যের ফলে ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের পাশাপাশি লেবাননকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনাও ফের আলোচনায় এসেছে।
## কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা কতটা?
একদিকে যখন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার দিকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক চাপ, অবরোধ, সামরিক হুমকি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি—সবকিছু মিলিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
## তেলের বাজারেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হলে তেল সরবরাহ, সমুদ্রপথ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ইরানের ওপর অবরোধ আরও কঠোর হলে এবং তার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বার্থ বা আঞ্চলিক স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। রেজাই নিজেই মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
## সামনে কী হতে পারে?
রেজাইয়ের বক্তব্যের পর এখন মূল প্রশ্ন—ইরান কি শুধুই কড়া রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে, নাকি সত্যিই নতুন সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
এই মুহূর্তে কোনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তবে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার মুখে সরাসরি নেতানিয়াহুকে হুমকি এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আঞ্চলিক উত্তেজনার মাত্রা যে যথেষ্ট বেশি, তা স্পষ্ট করে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ইজরায়েল, ইরান, আমেরিকা এবং লেবানন—একাধিক পক্ষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
## শেষ কথা
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইয়ের **“নেতানিয়াহুকে নরকে পাঠাব”** মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তিনি আমেরিকাকে সতর্ক করে বলেছেন, অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে ভয়াবহ সংঘাত তৈরি হতে পারে।
ইরান-ইজরায়েল সংঘাত ফের তীব্র হলে তার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। লেবানন, আমেরিকা এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তার সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে।
তাই রেজাইয়ের এই বক্তব্যকে আপাতত **একটি অত্যন্ত কড়া রাজনৈতিক ও সামরিক সতর্কবার্তা** হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে তেহরান, তেল আভিভ এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপই বলে দেবে পরিস্থিতি বাস্তবে কোন দিকে এগোয়।


