২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও ফিফাকে ঘিরে বিতর্ক থামার নাম নেই। এবার আরও বড় বিস্ফোরক তথ্য সামনে এসেছে। **আর্জেন্টিনার স্পোর্টস মার্কেটিং ব্যবসায়ী হুগো জিনকিস এবং তাঁর ছেলে মারিয়ানো জিনকিস** স্বীকার করেছেন যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আধিকারিকদের ঘুষ দিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টের সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মার্কিন তদন্তকারীদের সঙ্গে সমঝোতার পর এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তাঁরা।
## কারা এই বাবা-ছেলে?
হুগো জিনকিস এবং মারিয়ানো জিনকিস আর্জেন্টিনার স্পোর্টস মার্কেটিং সংস্থা **Full Play Group**-এর সঙ্গে যুক্ত। ফুটবল সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বত্বের ব্যবসায় তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে।
২০১৫ সালে ফিফার দুর্নীতি কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই তাঁদের নাম তদন্তের কেন্দ্রে আসে। সেই সময় মার্কিন তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল প্রতিযোগিতার সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়ার জন্য একাধিক ফুটবল কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়া হয়েছিল।
## এবার কী স্বীকার করলেন তাঁরা?
মার্কিন আদালতে হওয়া শুনানিতে হুগো ও মারিয়ানো জিনকিস স্বীকার করেছেন যে তাঁরা **আন্তর্জাতিক ফুটবল কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছিলেন**।
উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতার **মিডিয়া ও সম্প্রচার স্বত্ব** নিশ্চিত করা। অর্থাৎ শুধু মাঠের ফুটবল নয়, বিপুল অর্থের সম্প্রচার ব্যবসা নিয়েও যে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, এবার অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের স্বীকারোক্তিতে তা আরও স্পষ্ট হল।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘুষের পরিমাণ ছিল **দশকের কোটি ডলারের সমান**। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে ছিল FIFA, CONCACAF এবং CONMEBOL-এর সঙ্গে যুক্ত বাণিজ্যিক স্বত্বের জন্য অবৈধ অর্থ প্রদান।
## ২০১৫ সালের সেই কেলেঙ্কারি কী?
২০১৫ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক ফুটবল দুনিয়ায় কার্যত বিস্ফোরণ ঘটে। মার্কিন বিচার বিভাগের তদন্তের ভিত্তিতে জুরিখের একটি হোটেল থেকে ফিফার একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়।
অভিযোগ ছিল, বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতার **মিডিয়া রাইটস, মার্কেটিং রাইটস এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা** পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেওয়া হয়েছে।
এই তদন্তই পরবর্তীতে ‘FIFA Gate’ নামে পরিচিত বিশাল দুর্নীতি কেলেঙ্কারির অন্যতম প্রধান অধ্যায়ে পরিণত হয়।
## সম্প্রচার স্বত্বই ছিল মূল লক্ষ্য
ফুটবলের বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সম্প্রচার স্বত্ব অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং অন্যান্য মহাদেশীয় প্রতিযোগিতার ম্যাচ সম্প্রচারের অধিকার থেকে বিপুল অর্থ আয় করা যায়।
তদন্তকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই লাভজনক বাজারে প্রবেশের জন্যই ঘুষের ব্যবহার করা হয়েছিল।
জিনকিস বাবা-ছেলের সংস্থা Full Play Group-ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতার সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
## আদালতে সমঝোতা কেন?
এই স্বীকারোক্তির পাশাপাশি হুগো ও মারিয়ানো জিনকিস মার্কিন প্রসিকিউটরদের সঙ্গে **একটি plea deal বা আইনি সমঝোতা** করেছেন। এর ফলে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ ট্রায়ালের পরিবর্তে তাঁরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করার পথ বেছে নিয়েছেন।
রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সমঝোতার সঙ্গে বিপুল অর্থ বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ও যুক্ত রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে **প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার** forfeiture-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
## ফিফার ভাবমূর্তিতে ফের ধাক্কা
ফিফা গত এক দশকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নতুন এই স্বীকারোক্তি সংস্থাটির অতীতকে ফের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপের পর ফিফা সভাপতি **জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরেও একাধিক বিতর্ক** তৈরি হয়েছে। ফলে জিনকিস বাবা-ছেলের স্বীকারোক্তি এমন সময়ে সামনে এল, যখন আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বচ্ছতা ও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, **জিনকিসদের বর্তমান স্বীকারোক্তিকে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না**। দু’টি বিষয় আলাদা তদন্ত ও অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
## ইনফান্তিনোকে ঘিরে আলাদা বিতর্ক
বর্তমানে ইনফান্তিনোকে ঘিরে যে বিতর্ক চলছে, তার কেন্দ্র FIFA Forward Enterprise নামে একটি প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ। UEFA এই পরিকল্পনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে এবং মার্কিন আদালতের মাধ্যমে নথি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এমনকি সুইজারল্যান্ডে সম্ভাব্য ফৌজদারি অভিযোগ আনার প্রস্তুতির কথাও জানা গিয়েছে।
এই আলাদা বিতর্কের সঙ্গে জিনকিসদের ২০১৫ সালের দুর্নীতি মামলা সরাসরি এক নয়। তবে দু’টি ঘটনাই **ফিফার আর্থিক স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন** আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
## এত বছর পর আবার কেন সামনে এল মামলা?
২০১৫ সালের কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর বহু বছর ধরে বিভিন্ন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। ফলে এক দশক পরেও সেই মামলার রেশ পুরোপুরি কাটেনি।
জিনকিসদের নতুন স্বীকারোক্তি সেই দীর্ঘ তদন্তেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। বিশেষ করে তাঁরা নিজেরাই ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করায় পুরনো অভিযোগগুলির কিছু অংশ নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
## বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্য কতটা বড়?
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচের সম্প্রচার স্বত্ব শুধু খেলাধুলার বিষয় নয়—এটি বহু বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা।
একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সম্প্রচার স্বত্ব পেলে টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং স্পোর্টস মার্কেটিং সংস্থাগুলি বিপুল অর্থ আয় করতে পারে।
এই কারণেই সম্প্রচার স্বত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিনকিসদের ঘটনা দেখিয়ে দিল, **এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থই একসময় ফুটবল প্রশাসনে দুর্নীতির বড় সুযোগ তৈরি করেছিল।**
## ২০১৫ থেকে ২০২৬—ফিফার দুর্নীতির ছায়া কি কাটেনি?
২০১৫ সালের কেলেঙ্কারির পর ফিফা প্রশাসনে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটার পদ ছাড়েন এবং সংস্থার পরিচালনব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিন্তু এক দশক পরেও পুরনো মামলায় নতুন স্বীকারোক্তি সামনে আসা দেখিয়ে দিচ্ছে যে সেই সময়কার দুর্নীতির প্রভাব এখনও শেষ হয়নি।
অন্যদিকে, বর্তমান সময়ে ইনফান্তিনোকে ঘিরে UEFA-র সঙ্গে সংঘাত নতুন করে ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
## শেষ কথা
ফিফার দুর্নীতি কাণ্ডে ফের বিস্ফোরক মোড়। **আর্জেন্টিনার বাবা-ছেলে হুগো ও মারিয়ানো জিনকিস** স্বীকার করেছেন যে লাভজনক ফুটবল সম্প্রচার স্বত্ব পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ফুটবল কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছিলেন। মার্কিন প্রসিকিউটরদের সঙ্গে আইনি সমঝোতার মাধ্যমে তাঁরা দীর্ঘদিনের এই মামলায় নিজেদের দায় স্বীকার করেছেন।
২০১৫ সালে যে কেলেঙ্কারি গোটা ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, এক দশক পরেও তার রেশ কাটেনি। আর বর্তমান সময়ে ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে ঘিরে আলাদা প্রশাসনিক বিতর্ক চলায়, এই নতুন স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক ফুটবলের **স্বচ্ছতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো** করল।


