মণিপুরে ফের ভয়াবহ হিংসার ঘটনা। বৃহস্পতিবার কাংপোকপি জেলায় একটি সশস্ত্র হামলায় **নাগা সম্প্রদায়ের অন্তত পাঁচজন নিহত** হয়েছেন। আরও একজন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে। নিহতদের মধ্যে স্থানীয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকও রয়েছেন। ঘটনার পর এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ইম্ফল-তামেই (IT) রোডের মাকুই আশাং এবং থানাম্বা নাগা এলাকার মধ্যবর্তী অংশে সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ হামলাটি ঘটে। ওই রাস্তা নাগা অধ্যুষিত প্রত্যন্ত এলাকাগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। হামলার সময় গাড়িতে থাকা কয়েকজনকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র ব্যক্তিরা গুলি চালায় বলে অভিযোগ।
### কীভাবে ঘটল হামলা?
স্থানীয় সূত্রের খবর, নিহতরা একটি গাড়িতে করে সেনাপতির দিকে যাচ্ছিলেন। সেই সময় পথের মধ্যে তাঁদের গাড়িকে লক্ষ্য করে আচমকা গুলি চালানো হয়। হামলায় ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয় বলে জানা গিয়েছে।
প্রাথমিকভাবে চারজনের পরিচয় সামনে এসেছে—**ট্যাডসংবৌ রিংকাংমাই**, **মারিয়াকদিবৌ উইজুনামাই**, **জাপৌ এমকে** এবং **অনিল উইজুনামাই**। তাঁদের মধ্যে রাইট পাথ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক ট্যাডসংবৌ রিংকাংমাই ছিলেন। অন্যদের স্থানীয় যুব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গিয়েছে।
পঞ্চম নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিয়েও স্থানীয় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম দিকে তাঁকে নিখোঁজ বলে জানানো হলেও পরে তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসে। একই ঘটনায় গাইকামাং রিংকাংমাই নামে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
### হামলাকারীরা কারা?
ঘটনার পর থেকেই হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে নানা দাবি উঠেছে। **নাগা সংগঠনগুলির অভিযোগ, সন্দেহভাজন কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা এই হামলার সঙ্গে যুক্ত।** তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হামলাকারীদের পরিচয় বা তাঁদের সংগঠন সম্পর্কে পুলিশ এখনও চূড়ান্তভাবে কিছু জানায়নি।
তাই এই মুহূর্তে হামলাকারীদের পরিচয়কে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না দেখে অভিযোগ ও তদন্তের বিষয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
### নাগা সংগঠনের প্রতিবাদ
পাঁচ নাগা নাগরিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে নাগা সমাজে। **নাগা পিপলস অর্গানাইজেশন (NPO)** সেনাপতি জেলা সদর এলাকায় দোকানপাট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ডাক দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে।
নাগা সংগঠনগুলির বক্তব্য, সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।
### ফের সামনে এল নাগা-কুকি উত্তেজনা
মণিপুরে ২০২৩ সালের মে মাস থেকে চলা জাতিগত সংঘর্ষের প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। মূলত মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে রাজ্যে ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নাগা-কুকি সম্পর্ক নিয়েও একাধিক হিংসাত্মক ঘটনা সামনে এসেছে।
কাংপোকপি ও সেনাপতি-সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে পরিস্থিতি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। প্রত্যন্ত গ্রামগুলির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত রাস্তা ও বিকল্প পথগুলিও নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় নাগা নেতাদের বক্তব্য, চলমান সংঘাতের কারণে অনেক নাগা বাসিন্দা প্রধান জাতীয় সড়ক ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে বিকল্প হিসেবে অপেক্ষাকৃত দুর্গম রাস্তা ব্যবহার করতে হচ্ছে। সেই পথেও যদি হামলা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
### কয়েকদিন আগেও হামলার অভিযোগ
এই হামলার আগে গত কয়েক সপ্তাহেও মণিপুরে নাগা সম্প্রদায়ের মানুষকে লক্ষ্য করে হিংসার অভিযোগ উঠেছে।
জুলাই মাসে নোনে জেলায় নিরাপত্তাবাহিনী এবং নাগা ভিলেজ গার্ড সদস্যদের মধ্যে গুলির লড়াইয়ে একজন নাগা ভিলেজ গার্ড সদস্য নিহত হন এবং কয়েকজন আহত হন। সেই ঘটনার পরও নাগা সংগঠনগুলি প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
এছাড়া আগস্টের মাঝামাঝি সময়েও নাগা অধ্যুষিত একটি এলাকায় সশস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠেছিল। ফলে বৃহস্পতিবারের হামলা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
### প্রশাসনের কড়া বার্তা
এই হত্যাকাণ্ডের পর মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী **ইউমনাম খেমচাঁদ সিং** সাধারণ নাগরিকদের হত্যার তীব্র নিন্দা করেছেন। রাজ্য সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, নির্ধারিত শিবিরের বাইরে শান্তি আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কোনও সংগঠনের সদস্যকে অস্ত্র হাতে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তাবাহিনীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
### এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা
হামলার পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য হামলাকারীদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে।
তবে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় নিরাপত্তা অভিযান এবং তদন্ত—দুই ক্ষেত্রেই নানা সমস্যা রয়েছে। একইসঙ্গে নতুন করে যাতে কোনও সংঘর্ষ না ছড়ায়, সেদিকেও নজর রাখছে প্রশাসন।
### মণিপুরের শান্তি প্রক্রিয়ায় ফের ধাক্কা?
মণিপুরে দীর্ঘদিন ধরে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা চলছে। সরকার, নিরাপত্তা সংস্থা এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন একাধিক স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একের পর এক নতুন হিংসার ঘটনা সেই প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলছে।
বিশেষ করে সাধারণ নাগরিকদের উপর হামলা হলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। বৃহস্পতিবারের ঘটনাও সেই কারণেই অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
### ২০২৩-এর হিংসার ক্ষত এখনও শুকোয়নি
২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে বড় আকারের জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে রাজ্যে **শত শত মানুষ নিহত এবং কয়েক দশ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত** হয়েছেন। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সংঘাতের শুরু থেকে ২৬০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ৫৯ হাজারের বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘর্ষ কমলেও পুরোপুরি শান্তি ফেরেনি। বিচ্ছিন্ন হামলা, গুলি, অগ্নিসংযোগ এবং নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা এখনও সামনে আসে।
### সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই বড় প্রশ্ন
কাংপোকপিতে পাঁচ নাগা নাগরিকের মৃত্যু ফের একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—**হিংসায় জর্জরিত মণিপুরে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?**
রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা সাধারণ নাগরিক যদি হামলার শিকার হন, তাহলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফেরানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস বাড়তে থাকলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও ধাক্কা খেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত হামলাকারীদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
## শেষ কথা
মণিপুরের কাংপোকপি জেলায় বৃহস্পতিবারের সশস্ত্র হামলায় **পাঁচ নাগা নাগরিক নিহত এবং অন্তত একজন আহত** হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন স্কুলের প্রধান শিক্ষকও রয়েছেন। হামলার দায় কার, তা এখনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়নি। যদিও নাগা সংগঠনগুলির অভিযোগের তির কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর দিকে।
ঘটনার পর সেনাপতি এলাকায় প্রতিবাদ ও বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনও অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দিয়েছে।
**মণিপুরে দীর্ঘদিনের হিংসার আবহে এই নতুন হত্যাকাণ্ড ফের শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল।**


