নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের ভয়ংকর ছবি একের পর এক সামনে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, দোকানপাট ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে প্রবল জলস্রোত। এই বিপর্যয়ের মধ্যেই এক নেপালি ব্যবসায়ীর বর্ণনা শিউরে ওঠার মতো—চোখের সামনে **স্ত্রী ও ১৮ বছরের ছেলেকে জলের স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেল**, কিছু করার সুযোগই পাননি তিনি।
## চোখের সামনে সব শেষ
নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বানের পর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে একাধিক জনপদ। ভাটে কোশি নদীতে আচমকা জলস্রোত নেমে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়।
নুয়াকোটের ত্রিশূলি বাজারের এক ব্যবসায়ী সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাঁদের কাছে কোনও প্রস্তুতির সময় ছিল না। আচমকাই প্রবল জলের স্রোত ধেয়ে আসে। নিরাপদ জায়গায় পালানোর চেষ্টা করলেও তাঁর **স্ত্রী এবং ১৮ বছরের ছেলে** সেই স্রোতে ভেসে যান।
পরিবারের দুই সদস্যকে চোখের সামনে হারানোর সেই ভয়াবহ দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে বেঁচে রয়েছেন তিনি।
—
# ‘কয়েক সেকেন্ডেই সব ভেসে গেল’
স্থানীয়দের বয়ান অনুযায়ী, বিপর্যয়ের আগে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ নদীর দিক থেকে প্রবল শব্দ করে জল ও কাদার স্রোত এগিয়ে আসে।
এক স্থানীয় আধিকারিকের বর্ণনা অনুযায়ী, জলের ঢেউ প্রায় **১০০ মিটার উঁচু** বলে মনে হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে ত্রিশূলি বাজারের বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে উঁচু জায়গার দিকে ছুটেছিলেন। কিন্তু জলের গতি এতটাই বেশি ছিল যে বহু মানুষ পালানোর সুযোগই পাননি।
—
# কীভাবে ঘটল এই ভয়াবহ বিপর্যয়?
প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটতে পারে। পরে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে আসে অন্য সম্ভাবনা।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, **হিমবাহের বরফ ও পাথরের ধস** লেহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। এরপর জমে থাকা জল হঠাৎ প্রবল বেগে বেরিয়ে এসে ভাটে কোশি নদীতে নেমে আসে। সেই জলস্রোতই নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বান তৈরি করে।
ফলে রসুয়া থেকে নুয়াকোট ও ধাদিং পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপর্যয় নেমে আসে।
—
# ভেসে গিয়েছে গোটা বাজার
বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বোঝা যায় ত্রিশূলি বাজারের পরিস্থিতি থেকেই। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, জল ও কাদার স্রোত এত দ্রুত এগিয়ে এসেছিল যে মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানোর সময়টুকুও দেয়নি।
বহু বাড়ির নিচের তলা কয়েক মিটার পুরু কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গিয়েছে। রাস্তা, সেতু এবং যানবাহনেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয়দের কথায়, পুরো এলাকা যেন যুদ্ধের পরের ধ্বংসস্তূপ।
—
# শত শত মানুষ এখনও নিখোঁজ
এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২৭ আগস্টের বিভিন্ন প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে **এক হাজারেরও বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার** খবর পাওয়া যায়।
নিখোঁজদের মধ্যে বহু বিদেশিও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়া বহু ভারতীয় তীর্থযাত্রী এই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন।
ফলে নেপাল প্রশাসনের পাশাপাশি ভারতীয় কর্তৃপক্ষও নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে তৎপর হয়েছে।
—
# ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের নিয়েও উদ্বেগ
এই বিপর্যয়ের অন্যতম বড় প্রভাব পড়েছে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রীদের উপর। রসুয়া জেলার এই এলাকা তিব্বতের দিকে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে প্রায় **২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ** থাকার খবর পাওয়া গিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বহুজন কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার নিখোঁজদের পরিবারকে তথ্য দেওয়ার জন্য হেল্পলাইন ও সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করেছে।
—
# উদ্ধারকাজে বড় চ্যালেঞ্জ
বিপর্যস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বহু রাস্তা ও সেতু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় পৌঁছনো কঠিন।
তার উপর কাদা, ধ্বংসস্তূপ এবং নদীর প্রবল স্রোতের কারণে নিখোঁজদের সন্ধান করাও কঠিন হচ্ছে। নেপালের সেনা ও উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
অনেককে উদ্ধার করে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।
—
# আরও একটি বন্যার আশঙ্কা
বিপর্যয় এখানেই শেষ নয়। নদীর উজানে একটি **অবরুদ্ধ জলাধার/ব্যারিয়ার লেক** তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেটি ভেঙে গেলে আরও একটি প্রবল জলোচ্ছ্বাস নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
তাই নদীর আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধারকারী দলগুলিকেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
—
# আন্তর্জাতিক সাহায্যের হাত
বিপর্যয়ের ভয়াবহতা সামনে আসার পর বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে।
ভারত প্রাথমিকভাবে **১০ টন মানবিক সাহায্য** পাঠিয়েছে। আমেরিকাও জরুরি সহায়তার ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও অন্যান্য সংস্থাও ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সাহায্য করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও স্যাটেলাইট নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কাজে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
—
# প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ সতর্কবার্তা
নেপাল বরাবরই ভূমিকম্প, ভূমিধস, বন্যা ও হড়পা বানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়া এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
এই বিপর্যয় তাই শুধু নেপালের জন্য নয়, গোটা হিমালয় অঞ্চলের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
—
# স্ত্রী-পুত্রের অপেক্ষায় এক শোকস্তব্ধ বাবা
তবে পরিসংখ্যানের বাইরে এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হল সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষতি।
যে ব্যবসায়ী নিজের চোখের সামনে স্ত্রী ও ১৮ বছরের ছেলেকে জলের স্রোতে হারিয়েছেন, তাঁর কাছে এই বিপর্যয় কোনও সংখ্যা নয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবার কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে।
আর তাঁর মতোই নেপালের বিভিন্ন প্রান্তে বহু পরিবার এখনও অপেক্ষা করছে—হয়তো কোনও এক ফোন আসবে, হয়তো উদ্ধারকারী দল প্রিয়জনকে খুঁজে পাবে।
—
# শেষ কথা
নেপালের রসুয়া ও সংলগ্ন এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বান মুহূর্তের মধ্যে বহু জনপদকে ধ্বংস করে দিয়েছে। **স্ত্রী ও ১৮ বছরের ছেলেকে চোখের সামনে জলের স্রোতে হারানোর এক ব্যবসায়ীর মর্মান্তিক বয়ান এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।**
হিমবাহ বা বরফ-পাথরের ধস থেকে তৈরি প্রবল জলস্রোত রাস্তাঘাট, সেতু, বাড়িঘর ও বাজার ভাসিয়ে দিয়েছে। শত শত মানুষ এখনও নিখোঁজ এবং বহু বিদেশি পর্যটক ও ভারতীয় তীর্থযাত্রীও এই বিপর্যয়ের মধ্যে আটকে পড়েছেন।
উদ্ধারকাজ জোরদার হলেও দুর্গম ভূখণ্ড, ধ্বংসপ্রাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আরও বন্যার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এখন একটাই প্রার্থনা—**যাঁরা এখনও নিখোঁজ, তাঁদের যত বেশি সম্ভব জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হোক।**


