# জনগণনার কাজে শিক্ষকদের দায়িত্ব, বড় প্রশ্ন কলকাতা হাইকোর্টের
পশ্চিমবঙ্গে চলা জনগণনার কাজে সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের ব্যাপকভাবে যুক্ত করা নিয়ে এবার সরব কলকাতা হাইকোর্ট। স্কুলের নিয়মিত পঠনপাঠনের দায়িত্ব সামলে শিক্ষকদের কীভাবে অতিরিক্ত জনগণনার কাজ করতে হবে, তা নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির কথা তুলে প্রশ্ন করেছে আদালত। বিশেষ করে স্কুল ছুটির পর এবং ছুটির দিনে শিক্ষকদের এই দায়িত্ব পালন করতে হলে তাঁদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত।
শুক্রবারের শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও শিক্ষকদের কাজের সময় এবং জনগণনার দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, একজন শিক্ষককে একদিকে স্কুলের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে স্কুলের সময়ের পরে অন্য জায়গায় গিয়ে জনগণনার কাজ করতে হচ্ছে। ফলে তাঁরা কখন বাড়ি ফিরবেন, সেই প্রশ্নও উঠে আসে।
এই মামলাকে ঘিরে মূল বিতর্ক হল, দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ জনগণনায় শিক্ষকরা অংশ নেবেন কি না, তা নয়। বরং তাঁদের কীভাবে এবং কোন সময় এই কাজে ব্যবহার করা হবে, সেটিই এখন আদালতের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
## শিক্ষকদের কাজ নিয়ে আদালতের প্রশ্ন
শুনানির সময় হাইকোর্টের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের দৈনন্দিন কাজের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। সাধারণত স্কুলের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্লাস নিতে হয়। এরপর তাঁদের যদি অন্য কোনও জায়গায় গিয়ে জনগণনার কাজ করতে হয়, তাহলে তাঁদের কর্মঘণ্টা কার্যত আরও বেড়ে যায়।
আদালতের প্রশ্ন ছিল, বিকেল চারটেয় স্কুল ছুটি হওয়ার পর যদি কোনও শিক্ষককে অন্য জায়গায় গিয়ে জনগণনার কাজ করতে হয়, তাহলে তিনি কখন বাড়ি ফিরবেন? বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট কাজের জায়গাটি যদি স্কুল বা বাড়ির কাছাকাছি না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
আদালত শুধু শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অসুবিধার বিষয়টি দেখেনি। এর সঙ্গে স্কুলের স্বাভাবিক পঠনপাঠনও যুক্ত। কারণ একজন শিক্ষক যদি নিয়মিত স্কুলের সময়ের বাইরে প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তার প্রভাব পরের দিনের ক্লাসেও পড়তে পারে।
## জনগণনার কাজে শিক্ষকদের আপত্তি নেই
শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জানানো হয়েছে। তাঁদের জনগণনার কাজে অংশ নেওয়ার বিষয়ে মূল আপত্তি নেই। অর্থাৎ শিক্ষকরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পালন করতে চান না—এমন দাবি তাঁদের পক্ষ থেকে করা হয়নি।
তাঁদের মূল বক্তব্য হল, এই কাজকে প্রশাসনিকভাবে **‘On Duty’** হিসেবে গণ্য করতে হবে। পাশাপাশি একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে এই কাজে নিয়োগ করা হলে স্কুলের স্বাভাবিক পঠনপাঠন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তাঁরা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এই অবস্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণনার মতো জাতীয় দায়িত্ব পালনে তাঁরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করার জন্য এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং শিক্ষকদের উপর অযৌক্তিক অতিরিক্ত চাপও না পড়ে।
## একসঙ্গে সবাইকে নয়, বিকল্প প্রস্তাব হাইকোর্টের
এই সমস্যার সমাধানে আদালত একটি বিকল্প ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রত্যেক স্কুলের সমস্ত শিক্ষককে একসঙ্গে জনগণনার কাজে না পাঠিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকজন শিক্ষককে বেছে নেওয়া যেতে পারে।
আদালত পাঁচ-ছয়জন শিক্ষককে বেছে নেওয়া অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী রোটেশন পদ্ধতিতে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছে। একদিন অন্তর শিক্ষক পরিবর্তন করেও এই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে বলে আদালতের তরফে প্রস্তাব উঠে এসেছে।
এতে একদিকে যেমন জনগণনার কাজ চলতে পারে, অন্যদিকে স্কুলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক উপস্থিত থাকবেন। ফলে দুই ধরনের দায়িত্বের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
## স্কুলের পড়াশোনা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়
আদালতের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হল শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ। স্কুলের শিক্ষকরা যদি অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ছাত্রছাত্রীদের উপর।
একটি স্কুলে প্রতিটি শিক্ষকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে। কেউ কোনও নির্দিষ্ট বিষয় পড়ান, কেউ নির্দিষ্ট শ্রেণির দায়িত্বে থাকেন। ফলে একসঙ্গে অনেক শিক্ষককে স্কুলের বাইরে প্রশাসনিক কাজে পাঠালে বিকল্প শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালানোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে যেসব স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা ইতিমধ্যেই প্রয়োজনের তুলনায় কম, সেখানে এই সমস্যা আরও বেশি প্রকট হতে পারে।
এই কারণেই আদালত একসঙ্গে সব শিক্ষককে কাজে না পাঠিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক বেছে নেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছে।
## ছুটির দিনেও কি কাজ করতে হবে?
মামলার শুনানিতে শিক্ষকদের ছুটির দিন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেছে, সপ্তাহে নিয়মিত ছুটির দিন খুব সীমিত। সাধারণত রবিবারই প্রধান ছুটির দিন। আবার শনিবারেও অনেক শিক্ষককে স্কুলের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে সপ্তাহের ছুটির দিনেও যদি তাঁদের জনগণনার কাজে যুক্ত করা হয়, তাহলে তাঁদের বিশ্রামের সময়ও কার্যত কমে যাবে। আদালত সেই বাস্তব পরিস্থিতির দিকটিও বিবেচনা করেছে।
একজন শিক্ষককে সপ্তাহের পাঁচ বা ছয় দিন স্কুলে কাজ করার পর ছুটির দিনেও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হলে তাঁর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সেই কারণে কাজের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
## রাজ্যের যুক্তি কী?
শুনানিতে রাজ্যের তরফে বলা হয়, জনগণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় কাজ। দেশের অন্যান্য রাজ্যেও এই কাজ হচ্ছে এবং সেখানে এতটা সমস্যা হচ্ছে না বলে রাজ্যের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়।
রাজ্যের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আদালত বাস্তব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করে। একটি উদাহরণ দিয়ে আদালত বোঝাতে চায় যে প্রশাসনিক নির্দেশ কাগজে যতটা সহজ, বাস্তবে তা পালন করা সবসময় ততটা সহজ নয়।
যদি কোনও শিক্ষক সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত স্কুলে থাকেন এবং স্কুল ছুটির পর তাঁকে অন্য জায়গায় জনগণনার কাজে যেতে হয়, তাহলে সেই কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় কীভাবে পাওয়া যাবে—সেটিই আদালতের মূল প্রশ্ন।
## বাড়ি ফেরার সময় নিয়েও উদ্বেগ
শিক্ষকদের কর্মঘণ্টার সঙ্গে যাতায়াতের সময়ও জড়িত। আদালতের পর্যবেক্ষণে এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ধরা যাক, কোনও শিক্ষক স্কুল ছুটির পর অন্য এলাকায় জনগণনার কাজে গেলেন। কাজ শেষ করার পর তাঁকে আবার বাড়ি ফিরতে হবে। ফলে তাঁর প্রকৃত কর্মদিবস কাগজে নির্ধারিত স্কুলের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ হয়ে যেতে পারে।
শুধু কাজের সময় নয়, যাতায়াতের সময়কেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয়েছে।
এই কারণেই শিক্ষকরা জনগণনার কাজে যুক্ত হলে তাঁদের দায়িত্বের স্থান এবং সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও পরিকল্পিত পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।
## ‘On Duty’ মর্যাদা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শিক্ষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হল জনগণনার কাজকে ‘On Duty’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এর অর্থ, তাঁরা যদি প্রশাসনের নির্দেশে এই কাজে যুক্ত হন, তাহলে সেটিকে তাঁদের দায়িত্বের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।
শিক্ষকদের দিক থেকে এই দাবি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাঁরা নিজেদের মূল পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি একটি জাতীয় প্রশাসনিক কাজে অংশ নিচ্ছেন।
অন্যদিকে জনগণনার কাজের গুরুত্বও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। তাই এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির জন্য প্রশাসনিকভাবে স্পষ্ট নির্দেশ প্রয়োজন।
## রোটেশন পদ্ধতি হলে কী সুবিধা?
আদালতের প্রস্তাবিত রোটেশন পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে একসঙ্গে সব শিক্ষককে কাজে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না।
উদাহরণস্বরূপ, একটি স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক নির্দিষ্ট দিনে জনগণনার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। পরের দিন তাঁদের পরিবর্তে অন্য শিক্ষকরা সেই দায়িত্ব নিতে পারেন।
এর ফলে স্কুলে সবসময় পর্যাপ্ত শিক্ষক রাখার সুযোগ তৈরি হবে। একইসঙ্গে জনগণনার কাজও ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে প্রতিটি স্কুলের শিক্ষক সংখ্যা, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা এবং স্থানীয় জনগণনার কাজের পরিমাণ বিবেচনা করতে হবে।
## হাফ ডে-র প্রস্তাবও উঠে এসেছে
শুনানিতে শিক্ষকদের দায়িত্বের সঙ্গে স্কুলের সময়ের সমন্বয় করতে হাফ ডে বা অর্ধদিবসের মতো ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, প্রয়োজনে প্রশাসনকে এমন বাস্তবসম্মত উপায় খুঁজতে হবে যাতে দুই ধরনের কাজই চালানো সম্ভব হয়।
অর্থাৎ শুধু নির্দেশ জারি করলেই হবে না। সেই নির্দেশ বাস্তবে কীভাবে পালন করা সম্ভব, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
এই বিষয়টি শিক্ষকদের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষকরা প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকলে ক্লাসের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
## Right to Education-এর প্রসঙ্গ
শুনানিতে Right to Education বা শিক্ষার অধিকার সংক্রান্ত বিধানের প্রসঙ্গও উঠে আসে। আদালত মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
জনগণনা নিঃসন্দেহে জাতীয় স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ। কিন্তু সেই কাজ পরিচালনার সময় স্কুলশিক্ষার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতাও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
## কেন জনগণনার কাজে শিক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতে বিভিন্ন সরকারি সমীক্ষা ও জনগণনার কাজে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ব্যবহার করার দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রীতি রয়েছে। তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, স্থানীয় এলাকার সঙ্গে পরিচিতি এবং তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতার কারণে প্রশাসনের কাছে তাঁরা কার্যকর কর্মী হিসেবে বিবেচিত হন।
কিন্তু বর্তমানে স্কুলশিক্ষার পরিধি এবং শিক্ষকদের দায়িত্বও অনেক বেড়েছে। ফলে তাঁদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজে যুক্ত করার আগে স্কুলের উপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এই মামলায় মূলত সেই ভারসাম্যের প্রশ্নটিই সামনে এসেছে।
## শিক্ষক সংগঠনগুলির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মামলা
এই মামলার দিকে শিক্ষক সংগঠনগুলিও নজর রাখছে। কারণ আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
শিক্ষকরা প্রশাসনিক কাজে যুক্ত হবেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে এই মামলায় মূল গুরুত্ব পেয়েছে কাজের সময়, দায়িত্বের ধরন এবং স্কুলের স্বাভাবিক পঠনপাঠন।
যদি ভবিষ্যতে আদালত বা প্রশাসন কোনও স্পষ্ট কাঠামো তৈরি করে, তাহলে শিক্ষকরা কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে জনগণনার মতো কাজে যুক্ত হবেন, তা আরও পরিষ্কার হতে পারে।
## জাতীয় কাজ বনাম স্কুলের দায়িত্ব
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দুই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় করা।
একদিকে জনগণনা একটি বৃহৎ জাতীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের জন্য বিপুল সংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে স্কুলে নিয়মিত পঠনপাঠনও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব। শিক্ষকরা স্কুলে না থাকলে বা অতিরিক্ত কাজে ক্লান্ত হয়ে পড়লে শিক্ষাব্যবস্থার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
তাই আদালত সম্ভবত এমন একটি ব্যবস্থা চায় যেখানে জনগণনার কাজও হবে এবং স্কুলের পড়াশোনাও স্বাভাবিক থাকবে।
## প্রশাসনের সামনে এখন কী করণীয়?
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের পর প্রশাসনের সামনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রথমত, একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে কাজে না পাঠিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করা।
দ্বিতীয়ত, কাজের সময় এমনভাবে নির্ধারণ করা যাতে শিক্ষকদের নিয়মিত স্কুলের দায়িত্ব ব্যাহত না হয়।
তৃতীয়ত, রোটেশন বা নির্বাচিত শিক্ষক ব্যবস্থার মতো বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করা।
চতুর্থত, জনগণনার দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের ‘On Duty’ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্টতা তৈরি করা।
পঞ্চমত, ছুটির দিন এবং স্কুল-পরবর্তী সময়ের দায়িত্ব কীভাবে দেওয়া হবে, তারও সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রয়োজন।
## পরবর্তী শুনানির দিকে নজর
শুনানি শেষে রাজ্যের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে যে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হবে। এরপর মামলার পরবর্তী শুনানি মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতুবি করা হয়েছে।
ফলে পরবর্তী শুনানিতে রাজ্যের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষকদের জনগণনার দায়িত্ব কীভাবে বণ্টন করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এর পাশাপাশি কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্নটিও পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে পারে। সাম্প্রতিক এক শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রের কাছে জানতে চেয়েছে, সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের জনগণনার কাজে নিয়োগের আগে কেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। আদালত শিক্ষাব্যবস্থার উপর প্রভাব এবং কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
## কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ
শিক্ষকদের জনগণনার কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি শুধু রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণনা একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় কার্যক্রম হওয়ায় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
সম্প্রতি হাইকোর্ট এই বিষয়েই প্রশ্ন তুলেছে—শিক্ষকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদকে এই কাজে ব্যবহার করার আগে রাজ্যের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছিল কি না।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ একটি রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকে।
## শিক্ষকদের উপর চাপ কমানোই মূল লক্ষ্য
বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের পর্যবেক্ষণের সারকথা হল, শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপানোর আগে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।
একজন শিক্ষক শুধু ক্লাস নেন না। তাঁকে পাঠ পরিকল্পনা, খাতা দেখা, মূল্যায়ন, স্কুলের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং ছাত্রছাত্রীদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজও সামলাতে হয়।
এর সঙ্গে নিয়মিত স্কুলের সময়ের বাইরে জনগণনার দায়িত্ব যুক্ত হলে কাজের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
তাই প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক বাছাই, রোটেশন বা অন্যান্য নমনীয় পদ্ধতি ব্যবহার করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
## শেষ কথা
জনগণনার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি না থাকলেও তাঁদের দায়িত্ব বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে এবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের মূল উদ্বেগ হল, স্কুলের নিয়মিত পঠনপাঠন যাতে কোনওভাবেই ব্যাহত না হয় এবং শিক্ষকরা যাতে অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত কাজের চাপে না পড়েন।
আদালত একসঙ্গে সব শিক্ষককে জনগণনার কাজে পাঠানোর বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী পাঁচ-ছয়জন শিক্ষক বেছে নেওয়া, রোটেশন পদ্ধতি চালু করা কিংবা একদিন অন্তর দায়িত্ব দেওয়ার মতো বিকল্পের কথা বলেছে। প্রয়োজনে হাফ ডে ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে।
অন্যদিকে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে জনগণনার কাজে তাঁদের আপত্তি নেই, তবে সেটিকে ‘On Duty’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। রাজ্যের পক্ষ থেকেও বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এখন পরবর্তী শুনানিতে রাজ্য কী নির্দেশিকা দেয় এবং শিক্ষকদের জনগণনার দায়িত্ব কীভাবে পুনর্বিন্যাস করা হয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একইসঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে এই বিষয়ে আরও সমন্বয় তৈরি হয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, এই মামলা শুধু শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্বের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ, স্কুলশিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ, শিক্ষকদের কর্মপরিস্থিতি এবং কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই কলকাতা হাইকোর্টের পরবর্তী নির্দেশের দিকে শিক্ষক মহল থেকে শুরু করে প্রশাসনিক মহল—সবারই নজর রয়েছে।


