লিওনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মামলায় আরও কিছুটা স্বস্তি পেলেন তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আপাতত কোনও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার যে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা ছিল, তা আরও বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই সুরক্ষা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। ফলে এই সময়ের মধ্যে অরূপ বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার বা তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কোনও coercive action নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হবে।
মামলাটি মূলত ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর কলকাতার সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আয়োজিত লিওনেল মেসির ‘GOAT India Tour’ অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত। মেসিকে দেখতে বিপুল সংখ্যক দর্শক স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মেসিকে ঘিরে ভিআইপি এবং অন্যান্য অতিথিদের ভিড়, নিরাপত্তা ও দর্শক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত মেসির মাঠে থাকার সময়ও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কমে যায়। এরপর দর্শকদের একাংশ ক্ষোভে স্টেডিয়ামে ভাঙচুর শুরু করেন। ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল।
### কী নিয়ে অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মামলা?
এই ঘটনায় অনুষ্ঠানটির আয়োজক শতদ্রু দত্তের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশে মামলা দায়ের হয়। অভিযোগে অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে টিকিটের কালোবাজারি, তোলাবাজি, ভয় দেখানো এবং প্রতারণার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলি অভিযোগ মাত্র এবং আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি। অরূপ বিশ্বাসও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আইনি লড়াই করছেন।
মামলা দায়ের হওয়ার পর তদন্তে তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। পুলিশের নোটিসের প্রেক্ষিতে তাঁকে তদন্তে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি তদন্তকারী আধিকারিকদের সামনে হাজিরও হন।
### কেন হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অরূপ?
পুলিশি তদন্তে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর অরূপ বিশ্বাস কলকাতা হাই কোর্টে আবেদন করেন। তাঁর পক্ষ থেকে আদালতের কাছে দাবি করা হয়, তদন্তে সহযোগিতা করতে তিনি প্রস্তুত, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে যেন কোনও জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়।
প্রাথমিকভাবে জরুরি ভিত্তিতে এই আবেদন শুনতে আদালত রাজি হয়নি। পরে নিয়মমাফিক শুনানির পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চ তাঁকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয়। আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেয় যে, তদন্ত বন্ধ হবে না এবং পুলিশ প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যেতে পারবে।
অর্থাৎ, আদালতের দেওয়া সুরক্ষা তদন্ত থেকে অরূপ বিশ্বাসকে অব্যাহতি দেয়নি। বরং তদন্ত চলাকালীন তাঁকে গ্রেপ্তার বা অন্য কোনও coercive action থেকে সাময়িক সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
### পাসপোর্ট নিয়েও আদালতের নির্দেশ
অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার সময় আদালত কিছু শর্তও আরোপ করেছিল। অরূপ বিশ্বাসকে তাঁর পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি আদালতের অনুমতি ছাড়া কলকাতা বা সংশ্লিষ্ট এলাকা ছেড়ে না যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও তদন্তকারী সংস্থা যখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিস দেবে, তখন তাঁকে সেই তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে। অর্থাৎ আদালতের সুরক্ষা পেলেও তদন্তে হাজিরা এড়ানোর সুযোগ নেই।
### পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে হাজিরা
মেসি ইভেন্ট মামলায় অরূপ বিশ্বাসকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিল বিধাননগর পুলিশ। প্রথমে জুন মাসে এবং পরে জুলাই মাসেও তিনি তদন্তকারীদের সামনে হাজির হন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফার জিজ্ঞাসাবাদেও তাঁকে মামলার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
পুলিশ মূলত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, টিকিট সংক্রান্ত অভিযোগ এবং ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানা যায়। অরূপ বিশ্বাসের ভূমিকা কী ছিল এবং আয়োজকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের ধরন কী ছিল, তাও তদন্তের অংশ।
### মেসি ইভেন্টে আসলে কী হয়েছিল?
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে লিওনেল মেসির ভারত সফর নিয়ে বিপুল উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। কলকাতায় তাঁর সফর ছিল সেই ট্যুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাজার হাজার মানুষ তাঁকে দেখতে স্টেডিয়ামে হাজির হন।
কিন্তু মেসি মাঠে আসার পর প্রত্যাশিত অনুষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে এগোয়নি। তাঁকে ঘিরে ভিআইপি, রাজনৈতিক নেতা, সেলিব্রিটি এবং তাঁদের নিরাপত্তারক্ষীদের ভিড় তৈরি হয়। দর্শকদের একাংশ অভিযোগ করেন, তাঁরা টিকিট কেটে স্টেডিয়ামে এসেও মেসিকে ঠিকমতো দেখতে পাননি।
পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্টেডিয়ামের ভিতরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। দর্শকদের একাংশ চেয়ার ভাঙেন, মাঠে ঢোকার চেষ্টা করেন এবং বিভিন্ন জিনিস ছুড়ে ফেলেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে মেসির উপস্থিতি সংক্ষিপ্ত করতে হয়।
### আদালতের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ
মামলার শুনানির সময় কলকাতা হাই কোর্টের পক্ষ থেকে ঘটনাটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, এত বড় একটি আন্তর্জাতিক তারকার অনুষ্ঠানে দর্শক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
মেসির অনুষ্ঠান থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে বেরিয়ে যেতে হওয়ায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক স্তরেও নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে সেই বিষয়টির প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল।
### অরূপ বিশ্বাসের মন্ত্রিত্ব ছাড়া
ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাতও কম ছিল না। অনুষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার পর অরূপ বিশ্বাস রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি জানিয়েছিলেন, নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত।
এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাময়িকভাবে ক্রীড়া দফতরের দায়িত্ব নেন। ঘটনাটি নিয়ে তদন্তের নির্দেশও দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, মেসি ইভেন্টের বিশৃঙ্খলা শুধু একটি অনুষ্ঠানগত ব্যর্থতা হিসেবে থেমে থাকেনি; এর প্রভাব রাজ্যের প্রশাসন ও রাজনীতিতেও পড়েছিল।
### আয়োজক শতদ্রু দত্তের অভিযোগ
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন অনুষ্ঠানটির আয়োজক শতদ্রু দত্ত। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই অরূপ বিশ্বাস-সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অভিযোগে অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুরুতর ধারার কথা বলা হয়েছে। তবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়া এবং সেই অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তদন্তের পরই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব।
এই কারণে মামলার প্রতিটি বিষয় এখন আদালত এবং তদন্তকারী সংস্থার সামনে গুরুত্বপূর্ণ।
### অরূপ বিশ্বাসের জন্য বর্তমান স্বস্তি কতটা?
হাই কোর্টের সর্বশেষ নির্দেশ অরূপ বিশ্বাসকে আপাতত বড় ধরনের আইনি স্বস্তি দিয়েছে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোনও coercive action নেওয়া যাবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে মামলাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা তাঁকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত চলবে এবং পুলিশ প্রয়োজনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। আদালতের শর্ত মেনে তাঁকে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।
অর্থাৎ, আপাতত তাঁর স্বাধীনতা এবং গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত আশঙ্কা কিছুটা কমলেও মামলার আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
### মামলার ভবিষ্যৎ কী?
এখন নজর থাকবে তদন্তের পরবর্তী ধাপ এবং আদালতের ভবিষ্যৎ শুনানির দিকে। পুলিশ কী কী তথ্য সংগ্রহ করে, আয়োজকদের বক্তব্যের সঙ্গে সেই তথ্যের কতটা মিল পাওয়া যায় এবং অরূপ বিশ্বাসের ভূমিকা সম্পর্কে তদন্তে কী উঠে আসে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পাশাপাশি এই মামলায় অন্য কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা কীভাবে যুক্ত ছিল, অনুষ্ঠান পরিচালনায় কোথায় গাফিলতি হয়েছিল এবং দর্শক ব্যবস্থাপনায় কী কী ত্রুটি ছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, লিওনেল মেসির কলকাতা সফরের বহুল বিতর্কিত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় অরূপ বিশ্বাস আপাতত আরও কিছুটা আইনি স্বস্তি পেলেন। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে তাঁর বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের উপর অন্তর্বর্তী সুরক্ষা বাড়ানো হয়েছে এবং সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী তা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে এই সুরক্ষা কোনওভাবেই মামলায় তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করছে না। পুলিশি তদন্ত চলবে এবং তাঁকে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে। মেসির অনুষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, টিকিট সংক্রান্ত অভিযোগ, আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ—সবই এখন তদন্তের আওতায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের সেই ঘটনা ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে বড় বিতর্ক তৈরি করেছিল এবং অরূপ বিশ্বাসকে ক্রীড়ামন্ত্রীর পদও ছাড়তে হয়েছিল। এখন আদালতের পরবর্তী নির্দেশ এবং তদন্তের ফলাফলের উপরই নির্ভর করবে এই মামলার পরবর্তী গতিপথ।


