রাজনীতির ময়দানে মতাদর্শগত বিভাজন থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক যে অনেক সময় সেই সীমানা অতিক্রম করে যায়, তারই এক বিরল উদাহরণ তুলে ধরলেন তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। একসময় একই রাজনৈতিক শিবিরে কাজ করা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে থাকলেও তাঁদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এখনও অটুট রয়েছে বলে জানিয়েছেন তৃণমূলের এই অভিজ্ঞ নেতা।
রবিবার এক সাক্ষাৎকারে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদ অভিযান এবং সাধারণ মানুষের জীবিকা সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আবারও কথা বলতে চান বলে জানান।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় গরিব এবং নিম্নবিত্ত মানুষের স্বার্থকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, হকার উচ্ছেদের মতো পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিকল্প পুনর্বাসনের বিষয়টি সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ বহু মানুষের জীবিকা এই ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসার উপর নির্ভরশীল। তাই প্রশাসনের যে কোনও পদক্ষেপের সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় থাকা জরুরি।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষভাবে তাঁর সহযোগিতামূলক মনোভাবের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও শুভেন্দু অধিকারী ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজে থেকে ফোন করে মতামত নেওয়া কিংবা আলোচনা করার অভ্যাস এখনও বজায় রেখেছেন তিনি। এই বিষয়টি তাঁর অত্যন্ত ভালো লাগে বলেও মন্তব্য করেন তৃণমূল সাংসদ।
সুদীপের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ক্ষমতার উচ্চতম স্তরে পৌঁছানোর পর অনেক নেতার আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষেত্রে তিনি সেই পরিবর্তন লক্ষ্য করেননি। বরং আগের মতোই সহজ ও যোগাযোগযোগ্য রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই কারণেই তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক এখনও সুদৃঢ় রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
একইসঙ্গে শুভেন্দুর ভাই তথা প্রাক্তন সাংসদ দিব্যেন্দু অধিকারীর প্রসঙ্গও তুলে আনেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্মরণ করেন, সংসদে থাকাকালীন দিব্যেন্দু অধিকারীও নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। সংসদীয় বিভিন্ন বিষয় এবং এলাকার উন্নয়ন সংক্রান্ত নানা আলোচনা তাঁদের মধ্যে হতো। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতাই আজও বজায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, শুভেন্দু অধিকারীকে কোনও ইতিবাচক বা গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়া হলে তিনি তা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। শুধু শোনাই নয়, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনাও করেন। তাই ভবিষ্যতেও জনস্বার্থমূলক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চান তিনি।
এদিকে, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক নিয়েও রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। যদিও এই বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। এটিকে অন্য কোনও দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজন নেই।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, সেই সময় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আলাদা রাখার যে সংস্কৃতি একসময় ভারতীয় রাজনীতিতে দেখা যেত, সুদীপের বক্তব্যে যেন তারই প্রতিফলন ফুটে উঠেছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও পারস্পরিক সম্মান ও যোগাযোগ বজায় রাখার এই বার্তা বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


