Tuesday, August 18, 2026

Creating liberating content

IIT JAM 2027 registration...

IIT JAM 2025 Exam Date: IIT Delhi to Conduct Exam on February...

‘I got really angry’:...

R Ashwin and Sanjay Manjrekar (Agency Image) Ravichandran Ashwin has opened up...

অগাস্টের মাঝেই কমল সোনার...

সোনার বাজারে ফের বড়সড় পরিবর্তন। অগাস্টের মাঝামাঝি সময়ে হলুদ ধাতুর দামে কিছুটা পতন...

ভোররাতে কলকাতা বিমানবন্দরের ATC...

মঙ্গলবার ভোররাতে আচমকা আগুন লাগার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়াল কলকাতা বিমানবন্দরে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু...
Homeবাংলাউত্তমের অভিনয়শৈলী আজও...

উত্তমের অভিনয়শৈলী আজও প্রাসঙ্গিক, কেন এত অনন্য মহানায়ক?

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের জনপ্রিয়তা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকেনি। সময় বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, দর্শকের রুচি বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে—কিন্তু তাঁদের সৃষ্টিশীলতার গুরুত্ব আজও অটুট। সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে রয়েছেন **উত্তম কুমার**। বাঙালির কাছে তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন, তিনি ‘মহানায়ক’। তাঁর অভিনয়, সংলাপ বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা এবং চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতা আজও নতুন প্রজন্মের অভিনেতা ও দর্শকদের কাছে আলোচনার বিষয়। 

উত্তম কুমারের অভিনয়শৈলীকে শুধুমাত্র তাঁর সময়ের জনপ্রিয়তার নিরিখে বিচার করলে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা সম্ভব নয়। বরং তাঁর অভিনয়ের মধ্যে এমন কিছু উপাদান ছিল, যা বাংলা সিনেমার অভিনয়ের ভাষাকেই বদলে দিয়েছিল। বিশেষ করে থিয়েটারের উচ্চকিত অভিনয় থেকে সিনেমার তুলনামূলক সংযত, স্বাভাবিক এবং ক্যামেরা-নির্ভর অভিনয়ের দিকে যে পরিবর্তন বাংলা চলচ্চিত্রে এসেছিল, সেখানে উত্তম কুমারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

## দেশভাগের সময় বাঙালির আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন উত্তম

উত্তম কুমারের উত্থানের সময়টা ছিল বাংলার জন্য অত্যন্ত অস্থির। দেশভাগের অভিঘাত, উদ্বাস্তু সমস্যা, অর্থনৈতিক সংকট এবং পরিচয়ের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে বাঙালি সমাজ তখন নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল।

এই পরিস্থিতিতে উত্তম কুমার হয়ে উঠেছিলেন এক ধরনের স্বপ্নের প্রতীক। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দর্শককে বাস্তবের সংকট থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্য এক জগতে নিয়ে যেত। তাঁর ব্যক্তিত্ব, হাসি, পোশাক, কথা বলার ধরন এবং রোম্যান্টিক চরিত্র বাঙালি দর্শকের কাছে এক নতুন নায়কোচিত আদর্শ তৈরি করেছিল। 

তবে তাঁকে শুধু রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়ক্ষমতার প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে তিনি একেবারে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে ভেঙেছেন এবং নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন।

## থিয়েটার থেকে সিনেমার পর্দায় নিজস্ব ভাষা

উত্তম কুমারের অভিনয়ের ভিত তৈরি হয়েছিল থিয়েটারে। মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে সংলাপ, শরীরী ভাষা এবং দর্শকের প্রতিক্রিয়া বোঝার সুযোগ দিয়েছিল।

কিন্তু সিনেমায় এসে তিনি থিয়েটারের সেই উচ্চকিত অভিনয়কে হুবহু ব্যবহার করেননি। বরং ক্যামেরার সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনাকে বুঝে নিজের অভিনয়কে অনেক বেশি সূক্ষ্ম করে তুলেছিলেন।

মঞ্চে দর্শকের শেষ সারি পর্যন্ত কণ্ঠ পৌঁছে দেওয়ার জন্য যেভাবে সংলাপ বলতে হয়, সিনেমায় তার প্রয়োজন নেই। ক্যামেরা অভিনেতার মুখের সামান্য পরিবর্তনও ধরে ফেলতে পারে। উত্তম কুমার এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝেছিলেন।

এই কারণেই তাঁর অভিনয়ে অনেক সময় সংলাপের চেয়ে **চোখের ভাষা, মুখের সামান্য পরিবর্তন এবং বিরতি** বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।

## সংলাপের মধ্যে ‘মাইক্রো-পজ’-এর ব্যবহার

উত্তম কুমারের অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সংলাপ বলার ধরন। প্রচলিত নাটকীয় অভিনয়ে সংলাপের প্রতিটি শব্দকে জোর দিয়ে উচ্চারণ করার প্রবণতা ছিল।

কিন্তু উত্তম সেই জায়গায় অনেক বেশি স্বাভাবিকতা এনেছিলেন।

সংলাপের মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাওয়া, কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকা, তারপর ধীরে পরের কথাটি বলা—এই ছোট ছোট বিরতিগুলি তাঁর অভিনয়কে অন্য মাত্রা দিত। এই ‘micro-pause’ বা ক্ষুদ্র বিরতির মাধ্যমে তিনি চরিত্রের ভেতরের দ্বিধা, আবেগ বা চিন্তাকে দর্শকের সামনে তুলে ধরতেন। 

অনেক সময় একটি দীর্ঘশ্বাস কিংবা খুব মৃদু হাসিও তাঁর চরিত্রের মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠত।

এটাই ছিল তাঁর অভিনয়ের শক্তি।

## ‘নায়ক’-এ উত্তমের অন্য রূপ

সত্যজিৎ রায়ের **‘নায়ক’** উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে তিনি শুধুমাত্র জনপ্রিয় তারকা নন, বরং একজন জটিল মানসিকতার মানুষকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে ছিল আত্মবিশ্বাস, সাফল্য, অহংকার, ভয়, অনুশোচনা এবং নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। এই সমস্ত স্তরকে একসঙ্গে ফুটিয়ে তোলা সহজ কাজ ছিল না।

‘নায়ক’-এ উত্তমের অভিনয় দেখলে বোঝা যায়, তিনি শুধু সংলাপনির্ভর অভিনেতা ছিলেন না। তাঁর চোখ, মুখের অভিব্যক্তি এবং নীরবতাও গল্প বলত।

এই কারণেই বহু বছর পরেও ‘নায়ক’ নিয়ে আলোচনা হলে উত্তম কুমারের অভিনয় আলাদা করে উঠে আসে। সাম্প্রতিক সময়েও ছবিটির পুনঃপ্রদর্শন নিয়ে আলোচনায় তাঁর অভিনয়কে ছবিটির অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। 

## রোম্যান্টিক নায়ক থেকে বহুমাত্রিক অভিনেতা

উত্তম-সুচিত্রা জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি আলাদা অধ্যায়। ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘সাগরিকা’ থেকে শুরু করে একাধিক ছবিতে তাঁদের জুটি দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

তবে উত্তম কুমার তাঁর জনপ্রিয় রোম্যান্টিক ইমেজের মধ্যে আটকে থাকেননি।

‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘নায়ক’, ‘জতুগৃহ’, ‘গৃহদাহ’—বিভিন্ন ছবিতে তিনি সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

এই বৈচিত্র্যই প্রমাণ করে, তাঁর সাফল্যের পেছনে শুধু star appeal ছিল না। অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর বোঝাপড়াও ছিল।

## ‘সন্ন্যাসী রাজা’-য় নিজেকে ভেঙেছিলেন

উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনে ‘সন্ন্যাসী রাজা’ একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। এই ছবিতে তিনি নিজের প্রচলিত নায়কোচিত চেহারা এবং স্টাইল থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছিলেন।

একজন অভিনেতার জন্য নিজের তৈরি জনপ্রিয় image ভেঙে অন্য ধরনের চরিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। কারণ দর্শক অনেক সময় জনপ্রিয় অভিনেতাকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচেই দেখতে চান।

কিন্তু উত্তম সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

তাঁর এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে তিনি নিজের star image-এর বাইরে গিয়ে অভিনয়ের নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে আগ্রহী ছিলেন। ‘সন্ন্যাসী রাজা’-য় তাঁর নিজেকে ভেঙে ফেলার বিষয়টি তাঁর অভিনয়ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। 

## ‘অগ্নীশ্বর’-এ পরিণত উত্তম

উত্তম কুমারের অভিনয়ের পরিণত পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘অগ্নীশ্বর’। এখানে তাঁর চরিত্রের মধ্যে ছিল দৃঢ়তা, মানবিকতা, কঠোরতা এবং গভীর আবেগ।

এই ধরনের চরিত্রে তিনি নিজের জনপ্রিয় রোম্যান্টিক নায়ক-ইমেজের পরিবর্তে চরিত্রের ব্যক্তিত্বকে সামনে এনেছিলেন।

তাঁর অভিনয়ে বয়সের সঙ্গে পরিবর্তনও স্পষ্ট হয়েছিল। তরুণ বয়সের নায়কোচিত আকর্ষণের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে তিনি চরিত্রের পরিণত মানসিকতাকে নিজের অভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছিলেন।

## চোখ দিয়েও গল্প বলতেন

উত্তম কুমারের অভিনয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলির একটি ছিল তাঁর চোখ।

কোনও দৃশ্যে তিনি সবসময় সংলাপের উপর নির্ভর করতেন না। কখনও সামান্য তাকানো, চোখ সরিয়ে নেওয়া, কিছুক্ষণ স্থির থাকা কিংবা হালকা হাসিই চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশ করত।

ক্যামেরা যখন close-up-এ তাঁর মুখ ধরত, তখন এই সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিগুলি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত।

এটি সিনেমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিনয়ভাষা। কারণ সিনেমা অভিনেতার শরীরের পুরোটা নয়, অনেক সময় তাঁর মুখের কয়েক ইঞ্চি জায়গাকেই গল্প বলার প্রধান মাধ্যম করে তোলে।

উত্তম কুমার সেই মাধ্যমকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন।

## তাঁর হাসিও ছিল অভিনয়ের অংশ

উত্তম কুমারের হাসি বাংলা সংস্কৃতিতে প্রায় একটি আলাদা প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাঁর হাসির ব্যবহার শুধু জনপ্রিয়তার জন্য ছিল না।

পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁর হাসির অর্থ বদলে যেত।

কখনও তা প্রেমের, কখনও আত্মবিশ্বাসের, কখনও লজ্জার, আবার কখনও পরিস্থিতি সামলানোর কৌশল।

একজন দক্ষ অভিনেতার কাছে একই expression বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আলাদা অর্থ তৈরি করতে পারে। উত্তম কুমারের অভিনয়ে সেই সূক্ষ্মতা বারবার দেখা যায়।

## শরীরী ভাষার বিশেষ ব্যবহার

উত্তম কুমারের acting style-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল body language।

তিনি কীভাবে হাঁটছেন, কীভাবে বসছেন, কীভাবে কারও দিকে তাকাচ্ছেন, সিগারেট ধরছেন বা মাথা ঘোরাচ্ছেন—সবকিছুই চরিত্র অনুযায়ী বদলাত।

তাঁর জনপ্রিয় নায়ক চরিত্রগুলিতে একটি নির্দিষ্ট elegance দেখা গেলেও, চরিত্র বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই body language-ও বদলে যেত।

এটি প্রমাণ করে, তিনি শুধু dialogue delivery নিয়ে কাজ করতেন না; চরিত্রের সম্পূর্ণ physical personality নিয়েও ভাবতেন।

## বাংলা সিনেমার অভিনয়ের grammar বদলেছিলেন

উত্তম কুমারের সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এখানেই।

তিনি বাংলা সিনেমায় এমন এক অভিনয়ভাষা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে অত্যধিক নাটকীয়তার বদলে **natural performance** গুরুত্ব পায়।

থিয়েটার থেকে সিনেমায় আসা অনেক অভিনেতার অভিনয়ে মঞ্চের প্রভাব দেখা যেত। কিন্তু উত্তম ক্যামেরার জন্য অভিনয়কে নতুনভাবে ব্যবহার করেছিলেন।

সংলাপের মাঝখানে বিরতি, স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর, চোখের অভিব্যক্তি এবং minimal gestures—এসবকে তিনি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। 

আজকের অভিনেতাদের কাছে এগুলি হয়তো অভিনয়ের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

## কেন আজও প্রাসঙ্গিক উত্তম?

আজকের দর্শক অনেক বেশি বাস্তবধর্মী অভিনয় পছন্দ করেন। অতিরিক্ত নাটকীয়তা বা artificial dialogue delivery অনেক ক্ষেত্রেই দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।

এই জায়গাতেই উত্তম কুমারের অভিনয় এখনও প্রাসঙ্গিক।

তাঁর অভিনয়ের মূল শক্তি ছিল চরিত্রের আবেগকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। তিনি দর্শককে জোর করে কাঁদানোর বা হাসানোর চেষ্টা করতেন না। বরং পরিস্থিতির মধ্যে চরিত্রকে রেখে দিতেন এবং দর্শককে নিজে অনুভব করার সুযোগ দিতেন।

এই acting philosophy আজকের modern cinema-তেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

## নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের জন্য পাঠ

উত্তম কুমারের অভিনয় থেকে নতুন প্রজন্মের অভিনেতারা একাধিক বিষয় শিখতে পারেন।

প্রথমত, জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরেও নিজের image-এর মধ্যে আটকে থাকা উচিত নয়।

দ্বিতীয়ত, dialogue delivery-র পাশাপাশি silence-ও অভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তৃতীয়ত, body language চরিত্র নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, camera awareness থাকা দরকার।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল—অভিনেতাকে চরিত্রের আবেগ বুঝতে হবে। শুধু সংলাপ মুখস্থ করলেই অভিনয় হয় না।

## উত্তম শুধু অভিনেতা ছিলেন না

উত্তম কুমারের পরিচয় শুধু অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি প্রযোজক, পরিচালক, গায়ক এবং থিয়েটারকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর প্রযোজনায় ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘ভ্রান্তি বিলাস’, ‘জতুগৃহ’ এবং ‘গৃহদাহ’-এর মতো ছবি তৈরি হয়েছিল। 

প্রযোজক হিসেবে তিনি শুধুমাত্র commercial success-এর দিকে তাকাননি। সাহিত্যনির্ভর এবং নান্দনিক ছবির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

এটি তাঁর শিল্পবোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

## থিয়েটারের প্রতিও ছিল গভীর টান

অভিনয়ের শুরুতেই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন উত্তম কুমার। মঞ্চ তাঁকে অভিনয়ের প্রাথমিক পাঠ দিয়েছিল এবং দর্শকের সরাসরি প্রতিক্রিয়া বোঝার সুযোগ করে দিয়েছিল।

পরবর্তী জীবনেও থিয়েটারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। ‘শিল্পী সংসদ’-এর বিভিন্ন নাট্যপ্রযোজনার সঙ্গে তাঁর যুক্ত থাকার তথ্যও পাওয়া যায়। 

অর্থাৎ, সিনেমার বিশাল তারকা হওয়ার পরেও অভিনয়ের মূল মাধ্যম হিসেবে থিয়েটারের গুরুত্ব তিনি ভুলে যাননি।

## উত্তম-সুচিত্রা জুটি কেন এত জনপ্রিয়?

উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সুচিত্রা সেনের কথা আসবেই।

দু’জনের chemistry বাংলা সিনেমার romantic storytelling-কে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছিল। তাঁদের পর্দার সম্পর্ক দর্শকের কাছে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে বাস্তব জীবনের বাইরেও তাঁদের নিয়ে একটি সাংস্কৃতিক mythology তৈরি হয়ে যায়।

তবে উত্তমের জনপ্রিয়তা শুধুমাত্র সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর জুটির উপর নির্ভরশীল ছিল না। একক অভিনেতা হিসেবেও তিনি বহু সফল এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

## ‘নায়ক’ থেকে আজকের সিনেমা

আজকের বাংলা সিনেমায় চরিত্রনির্ভর গল্প, psychological drama এবং realistic acting-এর উপর জোর বাড়ছে।

এই পরিবর্তনের যুগেও ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখোপাধ্যায়কে দেখলে বোঝা যায়, বহু দশক আগেই উত্তম কুমার একজন তারকার ভেতরের মানুষটিকে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন।

তারকা হওয়ার চাপ, নিজের image, ভয়, insecurity এবং সাফল্যের আড়ালে থাকা একাকিত্ব—এসব বিষয় আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

এই কারণেই ‘নায়ক’ এবং উত্তমের অভিনয় সময়ের সঙ্গে পুরনো হয়ে যায়নি।

## কেন তাঁর অভিনয় ‘সময়হীন’?

একজন অভিনেতাকে সময়ের সীমা অতিক্রম করে টিকে থাকতে হলে তাঁর অভিনয়ের মধ্যে এমন কিছু থাকতে হয়, যা নির্দিষ্ট যুগের fashion বা style-এর উপর নির্ভরশীল নয়।

উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে সেই বিষয়টি হল **emotional truth**।

তিনি যে আবেগ প্রকাশ করতেন, তা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য লাগত। প্রেম, দুঃখ, ভয়, অহংকার, অনুশোচনা কিংবা আনন্দ—সবকিছুকেই তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে বহু দশক পরেও দর্শক সেই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

এটাই তাঁর অভিনয়কে timeless করে তুলেছে।

## বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে মহানায়ক

উত্তম কুমার শুধু চলচ্চিত্রের পর্দায় নেই। তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে গিয়েছেন।

তাঁর নাম শুনলেই একটি নির্দিষ্ট সময়ের বাংলা সিনেমা, কলকাতার পুরনো শহর, সাদা-কালো পর্দা, গান, প্রেম এবং এক ধরনের নায়কোচিত elegance মনে পড়ে।

কিন্তু সেই nostalgia-র বাইরেও তাঁর শিল্পীসত্তার মূল্য রয়েছে।

কারণ তাঁর অভিনয় আজও অভিনয়ের ছাত্রছাত্রী, পরিচালক এবং চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে বিশ্লেষণের বিষয়।

## নতুন অভিনেতাদের কাছে উত্তম কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমান সময়ের অভিনেতারা অভিনয়ের জন্য নানা ধরনের technique ব্যবহার করেন। Acting workshop, method acting, camera training এবং improvisation এখন অনেক বেশি প্রচলিত।

কিন্তু উত্তম কুমারের কাজ দেখলে বোঝা যায়, formal terminology জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগেই তিনি অভিনয়ের বহু সূক্ষ্ম দিক ব্যবহার করতেন।

তিনি character observation, voice modulation, body language এবং camera expression—সবকিছুকে নিজের মতো করে ব্যবহার করেছিলেন।

এই কারণেই তাঁর পুরনো ছবিগুলি এখনও acting reference হিসেবে দেখা যায়।

## মহানায়ককে শুধু নস্ট্যালজিয়ায় আটকে রাখা উচিত নয়

উত্তম কুমারকে নিয়ে আলোচনা অনেক সময় nostalgia-তেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাঁর পুরনো ছবি দেখে আবেগপ্রবণ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁকে শুধু ‘পুরনো দিনের নায়ক’ হিসেবে দেখলে তাঁর শিল্পীসত্তার অনেকটাই অদেখা থেকে যায়।

তাঁর কাজকে চলচ্চিত্রের ভাষা, acting technique এবং character construction-এর দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তাহলেই বোঝা যাবে, কেন কয়েক দশক পরেও তাঁর অভিনয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা করা সম্ভব।

## শেষ কথা

উত্তম কুমারের প্রয়াণের বহু দশক পরেও তাঁর অভিনয়শৈলী বাংলা চলচ্চিত্রে প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন না; তিনি বাংলা সিনেমার অভিনয়ের ভাষাকে পরিবর্তন করতে সাহায্য করেছিলেন।

থিয়েটারের উচ্চকিত অভিনয় থেকে ক্যামেরার জন্য সংযত অভিনয়ের দিকে যে পরিবর্তন, সেখানে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। সংলাপের মাঝের বিরতি, শ্বাসের ব্যবহার, চোখের অভিব্যক্তি, মৃদু হাসি, স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর এবং শরীরী ভাষার সূক্ষ্ম প্রয়োগ—সব মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের একটি স্বতন্ত্র acting grammar।

‘নায়ক’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দেখিয়েছে, একজন জনপ্রিয় commercial star একই সঙ্গে কতটা গভীর character actor হতে পারেন। আবার ‘সন্ন্যাসী রাজা’ বা ‘অগ্নীশ্বর’-এর মতো চরিত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন, নিজের তৈরি star image ভেঙে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল। 

তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি দিক ছিল প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে কাজ করা। ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘জতুগৃহ’ এবং ‘গৃহদাহ’-এর মতো ছবির সঙ্গে তাঁর প্রযোজক-সত্তা যুক্ত ছিল। 

তাই উত্তম কুমারকে শুধুমাত্র বাঙালির ‘মহানায়ক’ বলে স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়। তিনি বাংলা সিনেমার অভিনয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নির্মাতা। সময় বদলালেও মানুষের আবেগ, প্রেম, দ্বন্দ্ব, ভয়, স্বপ্ন এবং একাকিত্ব বদলায় না। আর সেই মানবিক অনুভূতিগুলিকেই এত স্বাভাবিকভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন উত্তম কুমার। সম্ভবত সেই কারণেই আজও তাঁর অভিনয় দেখে মনে হয়—মহানায়ক সত্যিই সময়ের অনেক ঊর্ধ্বে।

Get notified whenever we post something new!

spot_img

Create a website from scratch

Just drag and drop elements in a page to get started with Newspaper Theme.

Continue reading

অগাস্টের মাঝেই কমল সোনার দাম, আজকের রেট জানুন

সোনার বাজারে ফের বড়সড় পরিবর্তন। অগাস্টের মাঝামাঝি সময়ে হলুদ ধাতুর দামে কিছুটা পতন দেখা যাচ্ছে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সোনা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য এই খবর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কলকাতার বাজারে ২২ ক্যারেট এবং ২৪ ক্যারেট সোনার দামে...

ভোররাতে কলকাতা বিমানবন্দরের ATC ভবনে ভয়াবহ আগুন

মঙ্গলবার ভোররাতে আচমকা আগুন লাগার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়াল কলকাতা বিমানবন্দরে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ **Air Traffic Control বা ATC Building**-এর একটি অংশে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ভোরের দিকে আগুন ও ধোঁয়া দেখতে পান বিমানবন্দরের কর্মীরা। সঙ্গে...

আর্থিক সাহায্য নয়, বাবার নামে স্কুল চান হাফিজ

বাবাকে হারানোর গভীর শোকের মধ্যেও নিজের অবস্থান থেকে একচুলও সরতে নারাজ বাঁকুড়ার তরুণ শেখ আবদুল হাফিজ। পরিবারের আর্থিক সংকট মেটাতে সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সাহায্য চান না তিনি। বরং তাঁর দাবি, সরকার যদি সত্যিই তাঁদের পরিবারের ক্ষতির কথা...

Enjoy exclusive access to all of our content

Get an online subscription and you can unlock any article you come across.