১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান এবং ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময় উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু সেই সময় ভারতের বর্তমান সীমানার বাইরে থাকা বেশ কিছু অঞ্চলকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন ওঠে। তার মধ্যে একটি কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন হল—দুবাই কেন ১৯৪৭ সালে ভারতের অংশ হল না? ভৌগোলিকভাবে ভারতের পশ্চিম উপকূলের তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও দুবাই কেন স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তার উত্তর খুঁজতে হলে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কাঠামো এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের ইতিহাস বুঝতে হবে।
আজকের দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও আর্থিক কেন্দ্র। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দুবাই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে থাকা একটি ছোট উপসাগরীয় শাসনাঞ্চল। সেই সময় এর রাজনৈতিক অবস্থান, শাসনব্যবস্থা এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল না।
### ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল না দুবাই
দুবাইকে ভারতের অংশ হিসেবে না দেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল—দুবাই কখনও ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশের বিশাল অংশ শাসন করলেও পারস্য উপসাগরের একাধিক আরব শাসনাঞ্চল ছিল আলাদা রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে। দুবাই ছিল এমনই একটি অঞ্চল। সেখানে স্থানীয় শাসক বা শেখের নেতৃত্বে একটি পৃথক রাজনৈতিক ব্যবস্থা চলত।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে দুবাইয়ের সম্পর্ক ছিল মূলত চুক্তিভিত্তিক। অর্থাৎ ব্রিটিশরা দুবাইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি করেছিল এবং তার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশদের প্রভাব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের অর্থ কখনওই দুবাই ব্রিটিশ ভারতের অংশ হয়ে যাওয়া নয়।
### ট্রুসিয়াল স্টেটসের অংশ ছিল দুবাই
ঐতিহাসিকভাবে বর্তমান সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ভূখণ্ডের বিভিন্ন আমিরাতকে একসময় ‘Trucial States’ বা ‘Trucial Sheikhdoms’ বলা হত।
দুবাই ছিল এই ট্রুসিয়াল স্টেটগুলির অন্যতম। আবুধাবি, শারজা, আজমান, উম্ম আল-কুয়াইন, ফুজাইরাহ এবং রাস আল-খাইমাহ-সহ একাধিক আরব শাসনাঞ্চল এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই অঞ্চলগুলির সঙ্গে ব্রিটিশদের বিভিন্ন চুক্তি ছিল। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় বাণিজ্য রুটের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ স্বার্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে প্রশাসনিক দিক থেকে এই অঞ্চলগুলি ব্রিটিশ ভারতের অধীনে ছিল না। তাই ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দুবাইকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার কোনও সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক ভিত্তি ছিল না।
### ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা কীভাবে ঘটেছিল?
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সময় মূল পরিবর্তনটি ঘটেছিল ব্রিটিশ ভারতের ভূখণ্ডে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের Indian Independence Act-এর মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশীয় রাজ্যগুলিরও একটি বিশেষ সম্পর্ক ছিল। ব্রিটিশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের সামনে ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।
কিন্তু দুবাই সেই দেশীয় রাজ্যগুলির অংশ ছিল না। তাই তার সামনে ভারত বা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নও ওঠেনি।
### ভারতের সঙ্গে দুবাইয়ের ঐতিহাসিক যোগাযোগ ছিল
দুবাই ভারতের অংশ না হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক যোগাযোগ ছিল যথেষ্ট পুরনো। আরব সাগরের বাণিজ্যপথ ধরে ভারতীয় ব্যবসায়ী ও আরব বণিকদের মধ্যে বহু শতাব্দী ধরে যোগাযোগ ছিল।
গুজরাট, সিন্ধ এবং ভারতের পশ্চিম উপকূলের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে উপসাগরীয় বন্দরগুলির বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। মসলা, বস্ত্র, মুক্তো এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসায় ভারতীয় ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
এই ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে দুবাই ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব এক বিষয় নয়। সেই কারণে দুবাইয়ের ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও এটি কখনও ভারতের ভূখণ্ডের অংশ হয়ে ওঠেনি।
### ব্রিটিশদের সঙ্গে দুবাইয়ের আলাদা সম্পর্ক
উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটিশদের প্রধান আগ্রহ ছিল সমুদ্রপথ এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ রক্ষা করা। ভারত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশ এবং ভারতকে ঘিরে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ব্রিটিশদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই কারণে উপসাগরীয় শাসকদের সঙ্গে ব্রিটিশরা একাধিক চুক্তি করে। এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা ওই অঞ্চলের বৈদেশিক সম্পর্ক ও সমুদ্রপথে প্রভাব বিস্তার করেছিল।
কিন্তু এই রাজনৈতিক সম্পর্ককে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। দুবাই নিজস্ব শাসকের অধীনে থাকা একটি পৃথক শাসনাঞ্চল হিসেবেই ছিল।
### ১৯৭১ সালে তৈরি হয় সংযুক্ত আরব আমিরশাহী
দুবাইয়ের বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় আরও পরে। ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর আবুধাবি, দুবাই, শারজা, আজমান, উম্ম আল-কুয়াইন এবং ফুজাইরাহ মিলে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী বা UAE গঠন করে। পরবর্তীতে রাস আল-খাইমাহও ফেডারেশনে যোগ দেয়।
অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে দুবাই ভারতের অংশ না হয়ে একটি পৃথক আরব শাসনাঞ্চল হিসেবেই ছিল এবং ১৯৭১ সালে তা UAE-এর অন্যতম আমিরাত হিসেবে নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়।
### কেন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনি?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হল রাজনৈতিক ইতিহাস। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দুবাই ভারতের প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ ছিল না।
ভারতের স্বাধীনতা মূলত ব্রিটিশ ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা প্রতিটি অঞ্চলকে ভারতের অংশ করে দেওয়া হয়নি। উপসাগরীয় অঞ্চলের শেখডমগুলি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রেখেছিল।
তাই ভারতের স্বাধীনতার সময় দুবাইকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার কোনও বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না।
### আজকের দুবাই ও ভারতের সম্পর্ক
বর্তমানে দুবাই ও ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। ভারতীয় নাগরিকদের একটি বড় অংশ দুবাই ও UAE-তে বসবাস ও কাজ করেন। ব্যবসা, পর্যটন, বিমান যোগাযোগ, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
দুবাই ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র। একইভাবে ভারতীয় বাজার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিও দুবাইয়ের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ১৯৪৭ সালে দুবাই ভারতের অংশ ছিল না, এবং ভারতের স্বাধীনতার সময় তাকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার কোনও প্রশ্নও ওঠেনি।
সব মিলিয়ে, ১৯৪৭ সালে দুবাই ভারতের অংশ না হওয়ার কারণ মূলত তার পৃথক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাস। দুবাই ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না; এটি ছিল ট্রুসিয়াল স্টেটসের অন্যতম আরব শাসনাঞ্চল, যার সঙ্গে ব্রিটিশদের আলাদা চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক ছিল। ফলে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় দুবাইয়ের অবস্থান ভারতের নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে ছিল। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অন্যতম আমিরাত হিসেবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় লাভ করে। আজ ভারত ও দুবাইয়ের মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক থাকলেও সেই সম্পর্কের শিকড় বাণিজ্য ও ঐতিহাসিক যোগাযোগে, ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক সংযুক্তিতে নয়।


