উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের সরকারি ও সরকার-পোষিত কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে **কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG)**-এর মাধ্যমে আর্থিক নিরীক্ষা বা অডিট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই উচ্চশিক্ষা দফতর এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
উচ্চশিক্ষা দফতরের সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক মাসে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আর্থিক অনিয়ম, তহবিল ব্যবহারে অসঙ্গতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ জমা পড়েছে। সেই অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব যাচাই করতেই সিএজি অডিটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই অডিটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, সরকারি অনুদানের ব্যবহার, প্রকল্পভিত্তিক ব্যয় এবং অন্যান্য আর্থিক নথি খতিয়ে দেখা হবে।
রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না, তবে অডিটে যদি কোনও অনিয়ম ধরা পড়ে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি বর্তমান বা প্রাক্তন উপাচার্য, অধ্যক্ষ কিংবা প্রশাসনিক প্রধান—কেউই তদন্তের বাইরে থাকবেন না।
সরকারি সূত্রের দাবি, এই অডিট কেবল হিসাব পরীক্ষার জন্য নয়, ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সরকারি অনুদান, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ এবং অন্যান্য তহবিল যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনসাধারণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সিএজি-র মতো সাংবিধানিক সংস্থার মাধ্যমে নিরীক্ষা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও এই অডিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সম্প্রতি রাজ্য সরকার নতুন বেসরকারি কলেজের জন্য **দুই বছরের জন্য নতুন NOC (No Objection Certificate)** প্রদান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান বেসরকারি কলেজগুলির পরিকাঠামো, ফি কাঠামো এবং পরিচালন ব্যবস্থার ওপরও বিশেষ নজরদারির কথা জানানো হয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সার্বিক সংস্কার এবং নজরদারি বাড়ানোর দিকেই সরকার এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও এখনও অডিটের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা কোন কোন প্রতিষ্ঠানে প্রথম পর্যায়ে নিরীক্ষা হবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রশাসনিক সূত্রের খবর, প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললেই ধাপে ধাপে বিভিন্ন সরকারি ও সরকার-পোষিত কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। সিএজি অডিটের রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আর্থিক জবাবদিহিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।


