সম্পর্ক মানেই যে সবসময় হাসি, আনন্দ আর ভালোবাসা—তা নয়। যে কোনও দাম্পত্য সম্পর্কেই যেমন ভালো সময় আসে, তেমনই মতবিরোধ, অভিমান কিংবা তর্কের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। কিন্তু সেই অশান্তিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং ঝামেলার পর দু’জন কীভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন, তার উপরেই অনেকটা নির্ভর করে একটি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। এবার নিজের দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সেই সম্পর্কেরই এক সহজ ‘ফর্মুলা’ জানালেন অভিনেতা বিক্রান্ত ম্যাসি। তাঁর বক্তব্য, বছরের সব দিন একরকম ভালো কাটবে না। কিছু দিন হয়তো মানিয়ে নিতে হবে, কিন্তু সেই কয়েকটি খারাপ দিনকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলা উচিত নয়।
সম্প্রতি নিজের দাম্পত্য জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিক্রান্ত জানান, একটি বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ৩৫০ দিনই ভালো কাটে। বাকি ১৫ দিন নিয়ে খুব বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই। সেই সময়টা দু’জনকেই একে অপরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ, ছোটখাটো মতবিরোধ বা ঝগড়াকে সম্পর্কের বড় সমস্যা হিসেবে না দেখে পরিস্থিতি অনুযায়ী তা সামলে নেওয়াই তাঁর কাছে সুখী দাম্পত্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
বিক্রান্তের মতে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বা তর্ক হওয়া অস্বাভাবিক কোনও বিষয় নয়। বরং দীর্ঘদিনের সম্পর্কে এমন পরিস্থিতি আসতেই পারে। কিন্তু সেই ঝগড়ার প্রভাব যেন পরের দিন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া না হয়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কোনও বিষয়ে অশান্তি হলে কখনও কখনও সেই অবস্থাতেই ঘুমোতে যেতে হয়। কিন্তু পরদিন সকালে উঠে আগের রাতের ঝামেলাকে একই মাত্রায় ধরে রাখা হয় না। প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, তবে আগের মতো করে সেটিকে বড় করে দেখা হয় না।
এই সহজ পদ্ধতিকেই তিনি নিজের দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হিসেবে দেখছেন। তাঁর কথায়, কোনও সম্পর্কে প্রতিটি দিন নিখুঁত হবে—এমন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং দু’জন মানুষের আলাদা মত, পছন্দ, অভ্যাস এবং দৃষ্টিভঙ্গি থাকবেই। তাই ছোটখাটো মতপার্থক্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
বিক্রান্ত ম্যাসি এবং অভিনেত্রী শীতল ঠাকুরের সম্পর্ক বহুদিনের। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁদের দাম্পত্য জীবনের বয়স চার বছর হলেও তাঁদের সম্পর্কের বয়স প্রায় এক দশকের কাছাকাছি। বর্তমানে তাঁদের পরিবারে রয়েছে তাঁদের ছেলে বরদানও। অর্থাৎ প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিবাহ এবং পরবর্তীতে সন্তানকে নিয়ে পারিবারিক জীবনের একাধিক ধাপ পেরিয়েছেন তাঁরা।
বিক্রান্ত ও শীতলের প্রেমের সম্পর্কও বিনোদন দুনিয়ায় বেশ পরিচিত। দু’জনেই অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের সম্পর্কের সূত্রপাত হয়েছিল কয়েক বছর আগে। বিভিন্ন প্রকাশ্য প্রতিবেদনে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করার সময় ঘনিষ্ঠ হওয়ার কথা উঠে এসেছে। পরে তাঁরা বিয়ে করেন এবং এখন সন্তানকে নিয়ে সংসার করছেন।
বিক্রান্তের দাম্পত্য পরামর্শের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—‘পারফেক্ট’ সম্পর্কের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় তারকাদের জীবন দেখে মনে হয় তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে কোনও সমস্যা নেই। ছবি, ছুটি কাটানোর মুহূর্ত কিংবা বিশেষ দিনের পোস্টে শুধু আনন্দের দৃশ্যই দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি সম্পর্কেই মতবিরোধ থাকে। তারকারাও তার ব্যতিক্রম নন। বিক্রান্তের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
একটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় ঝগড়া নয়, বরং ঝগড়ার পর সেই বিষয়টিকে বারবার সামনে আনা। একই ঘটনা নিয়ে দিনের পর দিন অভিযোগ, পুরনো ভুল মনে করিয়ে দেওয়া কিংবা একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকলে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। বিক্রান্ত যে বিষয়টির উপর জোর দিয়েছেন, তা হল অশান্তির পর পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের সমস্যা উপেক্ষা করতে হবে। বরং তিনি বলেছেন, পরের দিন প্রয়োজন হলে সেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ ঝগড়া ভুলে যাওয়া মানে সমস্যাকে চাপা দেওয়া নয়। বরং উত্তেজনার মুহূর্ত পার হওয়ার পর শান্তভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা এবং প্রয়োজনীয় সমাধান খোঁজাই বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের দেওয়া কিছু সাধারণ পরামর্শও উঠে এসেছে। দাম্পত্য জীবনে কোনও সমস্যা তৈরি হলে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করা জরুরি। অযথা কোনও বিষয়কে দীর্ঘায়িত করলে তা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। দু’জনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থাকলে সেটি স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন। নিজের বক্তব্য জানানোর পাশাপাশি অন্য ব্যক্তির কথাও শোনা দরকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দোষারোপের প্রবণতা কমানো। কোনও ঝগড়ার সময় ‘তুমি সবসময় এমন করো’ বা ‘তোমার জন্যই সব সমস্যা’ ধরনের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। তার বদলে নির্দিষ্ট সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করা এবং ভবিষ্যতে সেটি কীভাবে এড়ানো যায়, সেই পথ খোঁজা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
দাম্পত্য সম্পর্কের ব্যক্তিগত সমস্যায় তৃতীয় ব্যক্তির হস্তক্ষেপ নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মধ্যে অযথা তৃতীয় কোনও ব্যক্তিকে জড়ানো উচিত নয়। অবশ্য গুরুতর সমস্যা, নির্যাতন বা নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে বিশ্বস্ত পরিবার, পেশাদার কাউন্সেলর বা প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া আলাদা বিষয়। তবে সাধারণ ভুল বোঝাবুঝিকে বড় সামাজিক বা পারিবারিক সংঘাতে পরিণত না করাই সম্পর্কের পক্ষে ভালো।
বিক্রান্তের এই বক্তব্যের আরও একটি দিক হল ‘মানিয়ে নেওয়া’। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে দু’জন মানুষের সব পছন্দ কখনও এক হবে না। একজন হয়তো কোনও বিষয়ে বেশি আবেগপ্রবণ, অন্যজন হয়তো অপেক্ষাকৃত শান্ত। একজনের অভ্যাস অন্যজনের কাছে বিরক্তিকর লাগতে পারে। একইভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও মতের পার্থক্য তৈরি হতে পারে। সেই জায়গায় একে অপরের সীমাবদ্ধতা এবং স্বভাবকে বোঝার চেষ্টা করাই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করে।
বিক্রান্তের নিজের জীবনেও পেশাগত ব্যস্ততা এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অভিনয় জগতের পরিচিত মুখ। ‘12th Fail’-এর মতো ছবির সাফল্যের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। পাশাপাশি তিনি পরিবারকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তিনি অভিনয় থেকে বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন এবং পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়েও অভিনেতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন। ‘The Sabarmati Report’ ঘিরে সাফল্যের পাশাপাশি অনলাইন হেনস্তা ও হুমকির অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি সম্প্রতি মুখ খুলেছেন। সেই সময় তাঁর ছেলে ছোট ছিল এবং পরিস্থিতি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
এই কারণেই তাঁর দাম্পত্য জীবন নিয়ে দেওয়া পরামর্শের মধ্যে বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাপ দেখতে পাচ্ছেন অনেকেই। তিনি কোনও জটিল তত্ত্বের কথা বলেননি। বরং একটি সাধারণ বিষয় সামনে এনেছেন—একটি সম্পর্কের প্রতিটি দিন সমান সুন্দর না হলেও, কয়েকটি খারাপ দিনের কারণে পুরো সম্পর্ককে বিচার করা উচিত নয়।
তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘মানিয়ে নেওয়া’ শব্দটির অর্থ দু’জনের ক্ষেত্রেই সমান হওয়া উচিত। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি সবসময় মানিয়ে নিলে তা সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ নয়। দু’জনেরই একে অপরের অনুভূতি, মতামত এবং প্রয়োজনকে সম্মান করা জরুরি। মতবিরোধ হলে সমাধানের চেষ্টা দু’জনের থেকেই আসা প্রয়োজন।
বিক্রান্তের বক্তব্য মূলত ছোটখাটো দাম্পত্য মতবিরোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি সহজ জীবনদর্শন। গুরুতর সমস্যা বা নির্যাতনের পরিস্থিতিতে চুপ করে থাকা কিংবা শুধু ‘মানিয়ে নেওয়া’ কোনও সমাধান নয়। বরং সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁর পরামর্শকে দৈনন্দিন সম্পর্কের ছোটখাটো অশান্তি সামলানোর একটি দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখাই যুক্তিযুক্ত।
সবশেষে, বিক্রান্ত ম্যাসির কথার সারমর্ম খুব সহজ। একটি সুখী দাম্পত্য মানে এমন সম্পর্ক নয় যেখানে কখনও ঝগড়া হবে না। বরং এমন সম্পর্ক, যেখানে ঝগড়ার পর দু’জন আবার কথা বলতে পারেন, একে অপরকে বুঝতে পারেন এবং পুরনো সমস্যাকে অযথা দীর্ঘায়িত না করে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন। বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে সব দিন যদি একরকম না-ও হয়, তবু অধিকাংশ দিনকে সুন্দর করে তোলার চেষ্টা থাকলেই সম্পর্ক অনেক বেশি দৃঢ় হতে পারে। বিক্রান্ত ও শীতলের দীর্ঘ সম্পর্কের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া এই সহজ বার্তাই এখন নেটদুনিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে।


