এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচেই ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের তারকা অলরাউন্ডার দীপ্তি শর্মা। থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত বোলিং করে মহিলাদের টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির রেকর্ড নিজের নামে করে নিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই নজির গড়লেন নিজের কেরিয়ারের ১৫০তম টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে। ম্যাচে মাত্র ১.১ ওভার বল করে তিনটি উইকেট তুলে নেন দীপ্তি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, সেই তিনটি উইকেট নেওয়ার পথে একটিও রান খরচ করেননি তিনি। তাঁর বোলিং পরিসংখ্যান দাঁড়ায় ১.১-১-০-৩। এই অসাধারণ স্পেলেই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য ভারতের দিকে ঘুরে যায়।
দুবাইয়ে মহিলা এশিয়া কাপ ২০২৬-এর প্রথম ম্যাচে থাইল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল ভারত। টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে হরমনপ্রীত কৌরের দল। ব্যাটিংয়ে শুরুটা ভালো হলেও শেষদিকে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে বড় স্কোর গড়তে পারেনি ভারত। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ১৫৯ রান সংগ্রহ করে ভারতীয় দল। জবাবে থাইল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনআপকে শুরু থেকেই চাপে ফেলে দেন ভারতের বোলাররা। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৬৫ রানেই অলআউট হয়ে যায় থাইল্যান্ড। ফলে ৯৪ রানের বড় ব্যবধানে জয় দিয়ে এশিয়া কাপ অভিযান শুরু করে ভারত।
ভারতের এই বড় জয়ের অন্যতম নায়ক অবশ্যই দীপ্তি শর্মা। থাইল্যান্ডের ইনিংসের নবম ওভারে বল করতে এসে প্রথম বল থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন তিনি। তাঁর স্পিনে বিপাকে পড়েন থাইল্যান্ডের ব্যাটাররা। প্রথম ওভারেই দুটি উইকেট তুলে নিয়ে মেডেন ওভার সম্পূর্ণ করেন দীপ্তি। এরপর নিজের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই আরও একটি উইকেট তুলে নেন ভারতীয় অলরাউন্ডার। মাত্র ১.১ ওভারেই তিন উইকেট নিয়ে থাইল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন তিনি।
দীপ্তির প্রথম শিকার হন নাওমি হ্যামিল্টন। তাঁর বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউয়ের সিদ্ধান্ত আসে। এরপর নান্নাফাত চাইহান ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান। দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই দীপ্তির তৃতীয় শিকার হন থাইল্যান্ডের অধিনায়ক নান্নাপাত কনচারোএনকাই। কনচারোএনকাই ৪৮ বলে ৪১ রান করে থাইল্যান্ডকে কিছুটা লড়াইয়ে রেখেছিলেন। তাঁর উইকেটটি নেওয়ার ক্ষেত্রে উইকেটকিপার ঋচা ঘোষের দুর্দান্ত ক্যাচও বিশেষ ভূমিকা নেয়। এই উইকেটের সঙ্গেই আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেটে নতুন রেকর্ডের মালিক হয়ে যান দীপ্তি।
এই ম্যাচের আগে মহিলাদের টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির তালিকায় দীপ্তি শর্মা এবং থাইল্যান্ডের থিপাচা পুথাওয়ং একই জায়গায় ছিলেন। দু’জনেরই উইকেট সংখ্যা ছিল ১৬৮। ফলে শীর্ষে এককভাবে জায়গা করে নিতে দীপ্তির প্রয়োজন ছিল মাত্র একটি উইকেট। কিন্তু তিনি সেখানেই থামেননি। এক ম্যাচে তিনটি উইকেট নিয়ে নিজের মোট উইকেট সংখ্যা ১৭১-এ নিয়ে যান। ফলে থিপাচাকে পিছনে ফেলে মহিলাদের টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বকালের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হয়ে যান ভারতীয় এই অলরাউন্ডার।
দীপ্তির এই রেকর্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি বড় মাইলস্টোন। থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচটি ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক টি-২০ কেরিয়ারের ১৫০তম ম্যাচ। এর ফলে ভারতের হয়ে ১৫০টি মহিলাদের টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা তৃতীয় ক্রিকেটার হয়ে ওঠেন তিনি। এর আগে এই তালিকায় ছিলেন হরমনপ্রীত কৌর এবং স্মৃতি মন্ধানা। আন্তর্জাতিক স্তরে ১৫০ বা তার বেশি টি-২০ ম্যাচ খেলা মহিলাদের ক্রিকেটারদের তালিকাতেও দীপ্তি জায়গা করে নেন।
তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের মুহূর্তেও দীপ্তির বক্তব্যে ছিল দলের প্রতি দায়বদ্ধতার ছাপ। ম্যাচের পর নিজের রেকর্ড নিয়ে উচ্ছ্বাসের বদলে তিনি জানান, ব্যক্তিগত মাইলস্টোন নিয়ে খুব বেশি ভাবেন না। তাঁর লক্ষ্য প্রতিদিন নিজের পারফরম্যান্স আরও উন্নত করা এবং দলকে যতটা সম্ভব সাহায্য করা। বিশেষ করে বোলিং বিভাগকে সাহায্য করার বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ বিশ্ব রেকর্ডের মালিক হওয়ার পরেও তাঁর নজর মূলত দলের সাফল্যের দিকেই।
দীপ্তির এই মনোভাব ভারতীয় দলের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অলরাউন্ডার হিসেবে তিনি শুধু বল হাতে নয়, ব্যাট হাতেও দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং অর্ডারে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তাঁর অফস্পিন ভারতীয় দলের বোলিং আক্রমণে বৈচিত্র্য এনে দেয়। বড় ম্যাচে চাপের পরিস্থিতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা দলকে বাড়তি সুবিধা দেয়। তাই এশিয়া কাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে দীপ্তির ফর্ম ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে ভারতীয় বোলিং ইউনিটের সামগ্রিক পারফরম্যান্সও ছিল নজরকাড়া। দীপ্তি শর্মা তিন উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি নন্দিনী শর্মাও তিনটি উইকেট তুলে নেন। শ্রী চরণী পান দুটি উইকেট। ফলে থাইল্যান্ডের ব্যাটিং অর্ডার কোনও সময়ই ভারতের সামনে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
ব্যাটিংয়ে অবশ্য ভারতের শুরুটা যেমন প্রত্যাশিত ছিল, শেষটা তেমন হয়নি। ওপেনার শেফালি বর্মা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে ৩৬ বলে অপরাজিত ৬৪ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল একাধিক বাউন্ডারি ও ছক্কা। অভিষেক টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রতীকা রাওয়ালও ২২ রান করেন। শেষদিকে ক্রান্তি গৌড়ের দ্রুত ১৫ রানের ইনিংস ভারতকে ১৫৯ রানের স্কোরে পৌঁছতে সাহায্য করে।
শেফালির ব্যাটিং ভারতের ইনিংসকে শক্ত ভিত দেয়। কিন্তু মাঝের ওভারে একের পর এক উইকেট হারানোর কারণে ভারত বড় স্কোরের দিকে এগোতে পারেনি। তবুও বোলারদের দাপটে ১৫৯ রানই শেষ পর্যন্ত যথেষ্টের চেয়েও বেশি প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে দীপ্তির স্পেল ম্যাচের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে ভারতের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
এই ম্যাচে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে যান স্মৃতি মন্ধানা। ভারতের সহ-অধিনায়ক মাত্র ১০ বলে ১৯ রান করে রান আউট হয়ে যান। যদিও তাঁর ইনিংসটি বড় হয়নি, তবুও প্রথম বাউন্ডারি মারার পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট রানের হিসাবে বড় মাইলস্টোন স্পর্শ করেন তিনি। থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৯ রান যোগ করে স্মৃতির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মোট রান দাঁড়ায় ১০,৭৫৬। এর ফলে নিউজিল্যান্ডের প্রাক্তন তারকা সুজি বেটসকে পিছনে ফেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মহিলা ক্রিকেটারদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন তিনি।
এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক মিতালি রাজ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মিতালির মোট রান ১০,৮৬৮। ফলে মিতালিকে টপকে সর্বকালের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হতে স্মৃতি মন্ধানার প্রয়োজন আর মাত্র ১১২ রান। সামনে এশিয়া কাপের একাধিক ম্যাচ থাকায় সেই রেকর্ডও খুব বেশি দূরে নয়। ফলে দীপ্তির পাশাপাশি স্মৃতিকেও ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ডের প্রত্যাশা।
ভারতের জন্য এশিয়া কাপের শুরুটা তাই একাধিক কারণে স্মরণীয় হয়ে রইল। একদিকে ৯৪ রানের বড় জয়, অন্যদিকে দীপ্তি শর্মার বিশ্বরেকর্ড এবং স্মৃতি মন্ধানার নতুন মাইলস্টোন—সব মিলিয়ে প্রথম ম্যাচেই একাধিক সাফল্য পেয়েছে ভারতীয় দল। বিশেষ করে বোলিংয়ে এমন দাপুটে পারফরম্যান্স দলকে টুর্নামেন্টের পরবর্তী ম্যাচগুলির আগে আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
দীপ্তির জন্য অবশ্য এই রেকর্ড তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বহু বছর ধরে ভারতীয় দলের বোলিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। ধারাবাহিকতা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী বোলিং করার ক্ষমতাই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সফল টি-২০ বোলারে পরিণত করেছে। এবার ১৭১ উইকেট নিয়ে মহিলাদের টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির জায়গা তাঁর দখলে।
তবে রেকর্ডের পাশাপাশি সামনে আরও বড় লক্ষ্য রয়েছে ভারতীয় দলের। এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বে ভারতকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে হবে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হাইভোল্টেজ ম্যাচও রয়েছে সূচিতে। টুর্নামেন্টে ভারতের লক্ষ্য শুধু গ্রুপ পর্ব পার করা নয়, বরং শিরোপা জয়। ভারত এশিয়া কাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দলগুলির একটি এবং ২০২৬ সংস্করণেও প্রত্যাশা অনেক বেশি।
দীপ্তির নিজের বক্তব্যেও তাই রেকর্ডের চেয়ে ধারাবাহিকতার উপর জোর দেখা গিয়েছে। একটি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর আত্মতুষ্টিতে ভোগার বদলে পরের ম্যাচের প্রস্তুতি নেওয়াই এখন তাঁর লক্ষ্য। দলের জন্যও একই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ম্যাচের বড় জয় আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও পুরো টুর্নামেন্টে একই মানের ক্রিকেট খেলতে হবে ভারতকে।
সব মিলিয়ে, থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে এশিয়া কাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি দীপ্তি শর্মার কেরিয়ারে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৫০তম টি-২০ আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাত্র ১.১ ওভারে তিন উইকেট, একটিও রান না দিয়ে—এমন পারফরম্যান্সের সঙ্গে বিশ্বরেকর্ড যোগ হওয়া নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা। ১৭১ উইকেট নিয়ে এখন মহিলাদের টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি দীপ্তি। আর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি ৯৪ রানের বড় জয় দিয়ে ভারতও জানিয়ে দিল, এশিয়া কাপের মঞ্চে তারা এবারও বড় দাবিদার।


